জ্ঞান
নন্দনতত্ত্বের প্রথম পাঠ (কামরুল হায়দার)
-থেকে গৃহীত।
স্মৃতিতে রক্ষিত উপলব্ধিই জাত অভিজ্ঞার মিলিত রূপ হলো জ্ঞান। এই স্মৃতি মস্তিষ্কের কোনো একক অংশে থাকতে পারে বা একাধিক অংশে ছড়িয়ে থাকতে পারে। মানুষের স্মৃতিতে এরূপ অসংখ্য তথ্য, জ্ঞান হিসেবে সংরক্ষিত থাকে। এর প্রতিটি ক্ষুদ্র অংশ থাকে স্মৃতিভাণ্ডারের কোনো একক অংশে। একই বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত নানা ধরনের অভিজ্ঞার সংমিশ্রণে একটি সমন্বিত জ্ঞ (জানা)-এর জন্ম হয়। তাই সমন্বিত জ্ঞ-ই হয়ে উঠে জ্ঞান। জানার প্রকৃতি অনুসারে জ্ঞানকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়।
১. অনুভবজাত জ্ঞান: এই জ্ঞান মানুষ অনুভবের মাধ্যমে প্রথম অর্জন করে। প্রতিটি মৌলিক অনুভূতি জন্ম দেয়, এই অনুভূতি থেকে জন্ম নেয় উপলব্ধি এবং সবশেষে তা অভিজ্ঞা হিসেবে স্মৃতিতে সংরক্ষিত হয়। আর অনুভবের নানা রূপ অবলম্বনে জন্ম নেয় অনুভবজাত জ্ঞান।
২. মিশ্র জ্ঞান: একাধিক অনুভবের দ্বারা অভিজ্ঞাসমূহ জন্ম দেয় জ্ঞান। সে জ্ঞান আবার অন্যান্য জ্ঞানের সংমিশ্রণে সৃষ্টি করে একটি মিশ্র জ্ঞান। যেমন 'আগুনে হাত দিলে পুড়ে যায়' এটা যদি জ্ঞান হয়। তাহলে এর ভিতরে রয়েছে আগুন এবং এর হাত পুড়িয়ে দেওয়ার বিষয়ের দুটি জ্ঞান। মানুষ যত ধরনের জ্ঞান অর্জন করে, তাকে প্রাথমিক পর্যায়ে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। এই ভাগ দুটি হলো−
প্রত্যক্ষ-জ্ঞান: প্রত্যক্ষ ইন্দ্রিয় দ্বারা সৃষ্ট অনুভূতি থেকে যে জ্ঞান জন্মে তাঁকে প্রত্যক্ষ জ্ঞান বলা যায়। কখনো কখনো ইন্দ্রিয়ের অক্ষমতা বা মনোযোগের অভাবে প্রত্যক্ষজ্ঞান সুচারুরূপে জন্মায় না। একজন বর্ণান্ধ মানুষ যদি লাল রঙ না দেখে, তাহলে তার কাছে লাল রঙ সম্পর্কে কোনো জ্ঞান জন্মাবে না। অন্যমনস্ক থাকার জন্য, পৃথকভাবে কোনো বিষয় কোনো ব্যক্তিকে স্পর্শ নাও করতে পারে। প্রত্যক্ষ জ্ঞানের জন্য এই দুটি অপারগতা থেকে মুক্ত হতেই হয়।
বিশ্বাসজাত-জ্ঞান: যা কোনো বিশ্বস্ত সূত্রে মানুষ গ্রহণ করে এবং সত্য বলে ধারণ করে। এমন কিছু বিষয় আছে যার সম্পর্কে অনুভূতি জন্মে বিশ্বাসের সূত্রে। পড়া বা শোনার মধ্য দিয়ে এই জ্ঞানের সঞ্চার হয়। যেমন- চাঁদ পৃথিবীর একটি উপগ্রহ। এই বাক্যটির ভিতর দিয়ে যে সত্য প্রকাশিত হয়, তা বিশ্বস্ত সূত্রে পাওয়ার কারণে। অধিকাংশ লোকই মহাকাশ গবেষক নন এবং তাঁদের এই বিষয়ে গবেষণার সুযোগও নেই। কিন্তু যে সকল মাধ্যম থেকে এই তথ্য পাওয়া যায়, সে সকল মাধ্যম সত্যাশ্রয়ী তথ্যকে প্রকাশ করেন, এমন বিশ্বাস আমাদের মধ্যে কাজ করে। এমনটা আমাদের প্রাত্যহিক আটপৌরে জীবনেও ঘটে থাকে। কিছু মানুষের প্রতি এমন বিশ্বাস থাকে, যিনি মিথ্যা বলেন না। তাঁর কথা আমরা বিনা তর্কে মেনে নেই। উল্লেখিত আলোচনা সাপেক্ষে জ্ঞানকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়।
প্রামাণ্য বিশ্বাসজাত জ্ঞান: এই জাতীয় জ্ঞান প্রাথমিকভাবে কোনো বিশ্বস্তসূত্র থেকে জন্মাতে পারে। কিন্তু এই জ্ঞান প্রমাণ দিয়ে দেখানো যায়। চাঁদ পৃথিবীর একটি উপগ্রহ, এই সত্যটি অধিকাংশ মানুষের কাছে বিশ্বাসের সূত্রে গড়ে উঠেছে। এর ভিতরে কেউ যদি এই বিশ্বাস যে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত, তার প্রমাণ চায়। তাহলে দেওয়া সম্ভব। প্রামাণ্য বিশ্বাসজাত জ্ঞানের প্রমাণ, মানুষ ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভব করে প্রত্যক্ষভাবে গ্রহণ করতে চায়।
অপ্রামাণ্য বিশ্বাসজাত জ্ঞান: এই জাতীয় জ্ঞানের ভিত্তি বিশ্বাস। কিন্তু এই বিশ্বাসকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ দ্বারা উপস্থাপন করা যায় না। ধর্মগ্রন্থে আত্মা'র ধারণা যে জ্ঞান জন্ম দেয়, তা অপ্রামাণ্য বিশ্বাসজাত জ্ঞান। এই জাতীয় অনেক বিশ্বাস দিয়ে ধর্মীয় আদর্শ প্রতিষ্ঠিত। এই ধারণা থেকে জ্ঞানের প্রাধিকারবাদ (Authoritarianism)-এর বিকাশ ঘটেছিল। এই মতবাদে ধরে নেওয়া হওয়া, সাধারণ মানুষ কোনো বিশেষ বিষয়ের জ্ঞান অর্জন করতে পারে না। একমাত্র যাঁরা ঈশ্বরের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে জ্ঞান দান করার ক্ষমতা লাভ করেন, তাঁরাই জ্ঞানীদের ভিতরে জ্ঞানী হয়ে উঠেন। এঁরা ঈশ্বরের নির্বাচিত প্রতিনিধি। তাঁদের কথা প্রামাণসাপেক্ষ্য নয়, অপ্রামান্য বিশ্বাসসাপেক্ষ্য।
যেভাবেই হোক না কেন, যখন কোনো বিষয় কোনো মানুষের কাছে সত্য বলে প্রতীয়মান হবে, তখনই তার কাছে তা জ্ঞান হিসেবে বিবেচিত হবে। সত্যাশ্রয়ী জানার তারতম্যের কারণে মানুষে মানুষে জ্ঞানের তারতম্য লক্ষ্য করা যায়। জগতের যে কোনো বিষয়ের তথ্য নানাবিধ বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত। সার্বিকভাবে একজন মানুষের পক্ষে কোনো সত্তার পূর্ণপরিচয় পাওয়া সম্ভব হয়ে উঠে না। সেই অর্থে কোনো মানুষই জ্ঞানী নয়। কোনো কোনো বিষয়ে কোনো একজন অনেকখানি জানতে পারে। এই অনেকখানি জানা হলো পরম জ্ঞানের অংশ মাত্র। এই অংশমাত্র জ্ঞান দিয়ে যে বিশ্বাসের জন্ম হয়, তা দিয়ে অনেককে মুগ্ধ করা যায়, কিন্তু পরমজ্ঞানের বিচারে তা ফাঁকি হয়েই থেকে যায়। এই কারণে 'আমি জানি' বলতে বুঝায় 'আমি যা জানি'। এক্ষেত্রে 'আমি জানি'-এর বদলে 'আমার মনে হয়', 'আমার মতে', 'আমার বিশ্বাস' ইত্যাদি অনেকটা নিরাপদ শব্দ।
প্রজ্ঞা
(cognitive content)
প্রকৃষ্টরূপে কোনো বিষয় সম্পর্কে জানাটা হলো প্রজ্ঞা। প্রকৃষ্টরূপে জানার জন্যই প্রজ্ঞার ক্ষেত্রটি অনেক বড়। একটি বিষয়ের জানার ক্ষুদ্র
অংশ হলো অভিজ্ঞা, একটি বিষয়ের একটি অংশের অভিজ্ঞার সমন্বয়ে সৃষ্টি হয় জ্ঞান। কোনো
বিষয়ের সকল জ্ঞানের সমন্বিত রূপটি প্রকাশ পায় প্রজ্ঞার ভিতর দিয়ে। একটি বিষয়
সম্পর্কে কতটুকু জানা গেছে, এই জানার ভিতর দিয়ে অনাবিষ্কৃত কোনো বিষয় গোচরে এসেছে
কিনা, এসবের ভিতর দিয়ে সে নতুন কি শিখতে পেরেছে, এসবের যোগফল হলো প্রজ্ঞা। এই
প্রজ্ঞা থেকে জন্ম নেয় অভিজ্ঞতা।
অভিজ্ঞতা
(experience): প্রত্যক্ষ জ্ঞান মানুষ
স্মৃতিতে ধারণ করে। নতুন কোনো বিষয় যখন উপস্থাপিত হয় তখন আগের জ্ঞানকে
ব্যবহার করা হয়। জ্ঞানের বিশেষ ব্যবহারের অভিজ্ঞতা বিশেষ ভূমিকা রাখে। ধরা যাক একবার গরম লোহায় হাত দিয়ে হাত পুড়ে
গিয়েছিল। এর ফলে যে জ্ঞানের জন্ম হয়েছিল। তা স্মৃতিতে জ্ঞান হিসেবেই থাকবে। পরের
বার গরম লোহায় হাত দেওয়ার আগে মন, এর সাথে সম্পর্কিত জ্ঞানকে ক্রিয়াত্মক অস্থায়ী
স্মৃতি অংশে উত্তোলিত করবে। এখানে 'আমি' আগের ফলাফল অনুসারে বিবেচনা করবে 'কি করা
উচিৎ'। এই বিবেচনার পিছনে যে জ্ঞান সক্রিয় হয়ে উঠবে তা প্রজ্ঞা। এই প্রজ্ঞা
ব্যবহৃত হবে নতুন পথের সন্ধান দিতে। আর এই কার্যক্রমের সমন্বিত রূপ হবে অভিজ্ঞতা। এই বিচারে অভিজ্ঞতা তুলনামূলক।
আর একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। মনে করা যাক, একটি জ্বলন্ত
মোমবাতি আপনার সামনে রয়েছে। আপনি যখন প্রথম মোমবাতির আলো দেখেছিলেন, তখন প্রাথমিক
কিছু অভিজ্ঞার মাধ্যমে জ্বলন্ত মোমবাতি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। এ ক্ষেত্রে
প্রাথমিক অভিজ্ঞাগুলো ছিল―
মোমবাতির শিখার আলোর রঙ, আকার, মৃদু বাতাসের তাড়নায় কম্পিত আলো, মোমবাতির দণ্ডের
মাথায় এর অবস্থান ইত্যাদি। এসকল অভিজ্ঞার সম্মিলনে আপনার মনে জ্বলন্ত মোমাবাতি
সম্পর্কে জ্ঞান জন্মেছিল। এরূপ আপনি জলন্ত পাঠকাঠি, জ্বলন্ত কাগজ, জ্বলন্ত দিয়াশলাই
ইত্যদি সম্পর্কে জ্ঞান যদি আপনার আগে থেকেই থাকে, তবে এতগুলো জ্বলন্ত দৃশ্যমান
বিষয়ের মধ্য থেকে জ্বলন্ত মোমবাতি ও অন্যান্য জ্বলন্ত বস্তুকে আলাদা করে শনাক্ত
করতে পারবেন তুলনামূলক জ্ঞানের বিচারে। এর ভিতর দিয়ে প্রজ্ঞার প্রকাশ ঘটবে। আর
ফলাফল অনুসারে আপনি যা করবেন, তা হবে অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞানের দ্বারা।
জ্ঞান-প্রজ্ঞা-অভিজ্ঞতা চক্র
জ্ঞান, প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা চক্রাকারে আবর্তিত হতে হতে উচ্চতর স্তরে উন্নীত হতে থাকে।
ধরা কেউ একজন ১, ২, ৩ অঙ্ক আলাদা আলাদা চিনলো। এটা তার জানা হলো বলে জ্ঞান। এবার
সমুদয় সংখ্যা-জ্ঞান তৈরি হবে সংখ্যা-প্রজ্ঞা। ধরা যাক, অঙ্কগুলোর বড় ছোটো
অনুক্রমটাও তার জানা আছে। এবার ৫, ২, ১, ৮ অঙ্কগুলোকে যদি তাকে অনুক্রমে সাজাতে বলা
হয়, এবং তা যদি সে পারে, তাহলে বলতেই হবে বড় ছোটো অনুক্রমের অভিজ্ঞতা থেকে সে
সাজিয়েছে। এর ফলে তার ভিতরে নতুন জ্ঞানের সঞ্চার হবে। মূলত আদিকাল থেকে মানুষের যে
জ্ঞানের বিকাশ ঘটেছে তার প্রাথমিক স্তরে ছিল এই জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং অভিজ্ঞতার
চক্রের ভিতর দিয়ে।
সাধারণভাবে অধিকাংশ নিত্যদিনের যে কাজ করে, তা অভিজ্ঞতাজাত জ্ঞান দিয়ে। যেকোনো
জ্ঞান এর ভিতর দিয়ে সাধারণ জ্ঞানে পরিণত হয়। জ্ঞান চর্চার কারণে মানুষের মনোজগতে যে
প্রক্রিয়া সচল হয়ে উঠে, তাকে সাধারণভাবে বলা হয় জ্ঞান-প্রক্রিয়া (cognitive
process)। কিছু মানুষ সাধারণ
জ্ঞানের বাইরে গিয়ে নতুন কিছু ভাবে। সেই ভাবনা থেকে জন্ম নেয়, উচ্চতর জ্ঞান চর্চা।
সত্তাতত্ত্বে একে বলা হয় উচ্চতর জ্ঞান প্রক্রিয়া (higher
cognitive process)। জ্ঞানী এই
প্রক্রিয়ায় সাধারণজ্ঞানকে অবলম্বন করে উচ্চতর জ্ঞানমার্গে পৌঁছাতে চায়।
মূলত পূর্বলব্ধ জ্ঞানের ব্যবহার করে নতুন সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টার দ্বারা সৃষ্ট
উচ্চতর জ্ঞান-প্রক্রিয়া।
এই প্রক্রিয়ায় প্রজ্ঞার সঞ্চার হয় এবং এর
ভিতর দিয়ে সৃষ্টি হয় মৌলিক জ্ঞানগত প্রক্রিয়া (basic
cognitive process)। এই প্রক্রিয়ার
সূত্রে মানুষের ইন্দ্রিগ্রাহ্য বিষয়ে উপলব্ধি করার অভিজ্ঞতা হয়। এই পর্যায়ে শুরু হয়
মনোজগতের প্রত্যক্ষ অনুভব উপলব্ধি প্রক্রিয়া।
উচ্চতর
জ্ঞান প্রক্রিয়া ভিতর
দিয়ে নানাধরনের সিদ্ধান্তের জন্ম হয়। সিদ্ধান্ত ভুল বা শুদ্ধ হতে পারে। উভয়ক্ষেত্রে
জন্ম নেয় নতুন জ্ঞান, নতুন প্রজ্ঞা, নতুন অভিজ্ঞতা। উচ্চতর জ্ঞান প্রক্রিয়া মনোজগতে
তিনটি দশার সৃষ্টি করে। এই দশা তিনটি হলো‒
চিন্তন, সিদ্ধান্ত এবং সুপ্রজ্ঞা
চিন্তন ও সিদ্ধান্ত (thinking
and deciding)
সাধারণভাবে মানুষ যা কিছু করে, তার সবকিছুতেই মস্তিষ্কে
ক্রিয়াশীল হয়ে উঠে। চিন্তাও মস্তিষ্কে ক্রিয়াশীল কার্যক্রমের অংশ। কিন্তু চিন্তাকে
আলাদাভাবে মর্যাদা দেওয়া হয়, সমস্যা সমাধানের অংশ হিসেবে। সে সমস্যা প্রত্যাহিক
কাজের জন্য হতে পারে, অজানা বিষয়ের রহস্যভেদের জন্যও হতে পারে। তাই চিন্তাকে ধরা হয়
উচ্চতর জ্ঞান প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে।
জ্ঞানের সূত্রে
অভিজ্ঞতার
জন্ম হয়। আবার অভিজ্ঞতা থেকে নতুন জ্ঞানের উদ্ভব হয়। কোন উচ্চতর সমস্যা সমাধানের
প্রক্রিয়া সূত্রে মনের ভিতরে চলে উচ্চতর
জ্ঞান-প্রক্রিয়া। এর ভিতর দিয়ে উদ্ভব ঘটে চিন্তন প্রক্রিয়া।
চিন্তনের ভিতর দিয়ে মানুষ একটি স্থিতিশীল দশায় পৌঁছাতে চায়। এই দশাটি হলো
সিদ্ধান্ত। সমস্যা সমাধান বিষয়ক এই সিদ্ধান্ত অনুসারে মানুষ পরবর্তী কার্যক্রম
গ্রহণ করে। এক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত শুধু একটি দশায় থাকে না। সিদ্ধান্ত
মনকে চালিত করে। কারণ, মানুষ সিদ্ধান্ত নেয় বলেই ভাবে। অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়,
যা ভাবতে চায় না তাও ভাবায়। মূলত অবচেতন মনের তাড়নায় এবং এই স্তরের সিদ্ধান্তে
চিন্তার উদয় হয়। প্রতিটি মানুষই এই স্তরে অনুভব করে, তার মন বিভাজিত হয়ে গেছে। মনের
একটি স্তর সিদ্ধান্ত দেয় 'আমি ভাবব না'। মনের অন্যস্তরের সিদ্ধান্ত দেয় ভাবো। এই
দুয়ের সংঘাতে যে জয়ী, তার দ্বারাই মন চালিত হয়। এ সকল ক্ষেত্রে ভাবনার এই সংঘাতকে
দমন করতে হলে, প্রথমেই প্রয়োজন 'আমি ভাবব না' সিদ্ধান্তকে প্রবলতর করা। যদিও
চিন্তনের সূত্রেই সিদ্ধান্ত আসে কিন্তু উভয়ই
উচ্চতর জ্ঞান প্রক্রিয়ার অংশজাত
প্রক্রিয়া।
জ্ঞান নিরপেক্ষ। যে বিষ পান করলে নিশ্চিত মৃত্যু, সেটা জেনেই ওই বিষ গ্রহণ করে
কেউ আত্মহননের পথ বেছে নেয়। জ্ঞান এক্ষেত্রে ভালো-মন্দের বিচার করে না।
পরিস্থিতি সাপেক্ষে জ্ঞান সিদ্ধান্তের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে সাধু থেকে যায়। একই ভাবে
কোনো ভালো কাজের ক্ষেত্রেও জ্ঞান কোনো কৃতিত্বের দাবি করে না।
উচ্চতর জ্ঞান প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে নানা ধরনের সিদ্ধান্ত আসতে পারে। ধরা যাক, একটি ছোটো নদীর ওপারে যাওয়ার জন্য একটি লোক দাঁড়িয়ে আছে। এখানে সমস্যা হলো ওপারে যাওয়া। কিভাবে তাড়াতাড়ি ওপারে যাওয়া যায়, এই সূত্রে চিন্তন কার্য শুরু হলো তার মনোজগতে। প্রথমে সিদ্ধান্ত নিলো কোনো নৌকার জন্য অপেক্ষা করা, সিদ্ধান্ত নিলো সাঁতরে পার হয়ে যাওয়া। অর্থাৎ আপাতত তার কাছে দুটি সিদ্ধান্তই গ্রহণযোগ্য মনে হলো। এবার সে অপেক্ষাকৃত ভালো সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করবে। এইভাবে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি হবে বিচার-প্রক্রিয়া (judging)।
মানুষ প্রতিনিয়ত সিদ্ধান্ত নেয় এবং সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলেই কোনো কাজ করতে পারে। অজস্র সিদ্ধান্তের সাগরে মানুষ কখনো ঠিক কাজটি করে, কখনো চরম ভুল করে। কর্মক্ষেত্রে এটা ঘটে থাকে, বিষয়ানুসারে অভিজ্ঞতার আলোকে যথাযথ বিচার-বিবেচনা না করার কারণে। অনেক সময়ই একজনের কার্যক্রম অন্যের কাছে যথার্থ মনে হয় না। সিদ্ধান্তের এই ভিন্নতার পিছনের কারণে, একে কয়েকটি স্তরে ভাগ করা যায়। যেমন—
তথ্যগত যথার্থতা: প্রতিটি সিদ্ধান্তের পিছনে থাকে কিছু তথ্য। এই সকল তথ্যে ত্রুটি থাকলে, সিদ্ধান্ত যথার্থ হয় না। ধরা যাক একটি নৌকায় করে, আপনি নদী পার হবেন। আপনি জানতেন না যে, নৌকার তলাটা দিনে দিনে এতটাই দুর্বল হয়ে গেছে যে, যে কোনো সময় তা ফেসে যেতে পারে। এই অবস্থায় ওই নৌকা নিয়ে নদী পার হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। মাঝ নদীতে গিয়ে নৌকার তলা ফেটে গেলে, তখন মনে হবে নৌকার তলাটা পরীক্ষা না করে, এই যাত্রাটা করা ঠিক হয় নি। সাবধানী হলে, এই জাতীয় সমস্যা থেকে মুক্ত থাকা যায়।
প্রদেয় ত্রুটিপূর্ণ তথ্য: অনেক সময় অন্যের দেওয়া ত্রুটিপূর্ণ তথ্য থেকে সিদ্ধান্তের সৃষ্টি হয়। যার ফলাফল ভাল মন্দ দুই হতে পারে। ধরা যাক আপনি একটি রাস্তা ধরে গাড়ি চালিয়ে যাবেন। রাস্তাট বেশ ভালো, এই তথ্যটি কেউ আপনাকে আগেই জানিয়েছে। আপনি গাড়ি চালিয়ে কিছুদূর যাওয়ার পর দেখলেন, একটি ব্রিজ ভেঙে পরে আছে। আপনাকে দেওয়া ভুল তথ্যের জন্য, আপনি বিপদে পড়ে যাবেন। এক্ষেত্রে তথ্যগত ত্রুটির কারণে, সিদ্ধান্তটা ভুল মনে হবে। তখন মনে হবে, তথ্য প্রদানকারীকে বিশ্বাস করাটাই ছিল ভুল সিদ্ধান্ত। আবার দেখা যায়, ত্রুটিপূর্ণ তথ্যের সূত্রে আপনি ভুল পথে চালিত হয়েছেন। পরে খোঁজ নিয়ে থেকেছেন পথের যথার্থতা অনুসারে অন্য পথে গেলে ডাকাতের কবলে পরতে হতো। অনেক সময় ভুল তথ্যই কল্যাণ বয়ে আনতে পারে।
তথ্যের সমন্বয়গত ত্রুটি: অনেক সময় মানুষ স্থান-কাল-পাত্র বিচারে অসমর্থ হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এটা হতে পারে যথার্থ বিবেচনা করার অক্ষমতা থেকে গৃহীত সিদ্ধান্ত, কিম্বা স্মৃতিবিভ্রাটজনীত সিদ্ধান্ত।
যথার্থ সিদ্ধান্তগ্রহণে অক্ষমতাজাত সিদ্ধান্ত: মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা যথার্থ সিদ্ধান্তগ্রহণের অক্ষমতা। অধিকাংশ সময় সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত হয় না। কারণ মানুষের চলার পথের সকল বিষয় মানুষ পুরোপুরি আগে থেকে জানতে পারে না। ফলে সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্তদাতার ভাবনা পূর্ণ ফলাফলের কাছাকাছি থাকে বটে, কিন্তু সার্বিক বিচারে সবেচেয়ে ভালো হয় না। পরমসিদ্ধান্তের মাপকাঠি যদি ঈশ্বর বিবেচনা করা যায়, তাহলে মানুষ ওই মানে কখনোই পৌঁছাতে পারে না। কার্যকারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পূর্ব সিদ্ধান্তের অল্পবিস্তার সংশোধন করা হয়। এই সংশোধনগুলো মূল সিদ্ধান্তকে পরবর্তিত করে এবং চূড়ান্ত ফলাফলের লক্ষ্যকে যথার্থতার দিকে চালিত করে।
যখন প্রশ্ন করা হয়, '২+২=?' । এই প্রশ্নের উত্তরে কেউ যখন ৪ লিখবে তখনও কি যথার্থ সিদ্ধান্ত হয় না। নিশ্চয়ই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা ফলাফল ৪। এটা উত্তরটা অনিবার্য। এই সিদ্ধান্ত বহু আগে গণিতশাস্ত্রের আদি-পুরুষরা করে গেছেন, যা গাণিতিক বিধিতে পরিণত হয়েছে। প্রতিষ্ঠিত বিধি কোনো নতুন সিদ্ধান্ত দেয় না, আগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকেই প্রকাশ করে। বিধিবদ্ধ যে সিদ্ধান্ত চরম সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, তার কোনো বিকল্পমান থাকে না। তাই উপরের প্রশ্নের ৪ ছাড়া অন্যকোনো বিকল্প মান নেই। এখানে ভিন্নভাবে ভাবার কোনো অবকাশও নেই। মূলত যথার্থ সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক বিষয়টি যখন এসে যায়, তখন তা আগের কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয় মাত্র। যখন কোনো প্রকৌশলী একটি বাড়ির নকশা তৈরি করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেন, তখন রাজমিস্ত্রির কাজ হয়, সেই সিদ্ধান্ত হয় নকশা অনুসারে ঠিকমতো বাড়িটি তৈরি করা। '২+২=৪' হলো অনেকটা সেই রকম সিদ্ধান্ত। প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় অনিবার্যরূপে। এর বাইরের সকল সিদ্ধান্তই অনিশ্চিত একটি ভাবকেই ধারণ করে।
স্মৃতিবিভ্রাটজনীত সিদ্ধান্ত: ধরা যাক, শীতকালের দুপুর বেলায় আপনি কোথাও রওনা দিয়েছেন। ফিরতে ফিরতে রাত হবে এটা আপনি জানেন, কিন্তু গরম পোশাক নিতে ভুলে গেছেন। স্মৃতিবিভ্রাটজনীত সিদ্ধান্ত অধিকাংশ আমাদেরকে বিব্রত করে। অনেক সময় তা অনুশোচনায় পরিণত হয়।
আবেগজাত সিদ্ধান্ত: অনেক সময় মানুষ রাগে, দুঃখে, অভিমানে এমন কিছু করে বসে যে, অন্যের বিচারে তা যথার্থ মনে হয় না। এমনকি নিজের কাছেও পরে ওই সিদ্ধান্ত ভুল মনে হয়। এই জাতীয় সিদ্ধান্ত থেকে মানুষ অনেক সময় আত্মহননের পথও বেছে নিতে পারে। অনেক সময় তুচ্ছ আবেগের বসে, মানুষ পাগল না হয়েও পাগলামি করে।
অনৈতিক সিদ্ধান্ত: মানুষ অনেক সময় জেনে বুঝে নীতিবিবর্জিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আর্থিক দুর্নীতি, সামাজিক অনাচার, পক্ষপাতদুষ্ট মনোভাব ইত্যাদি মানুষ জেনে বুঝে করে— লোভ, স্নেহ, মানবিক প্রেম ইত্যাদির কারণে।
অনৈতিক সিদ্ধান্ত অবশ্য, কর্তার অবস্থান অনুসারে নির্ধারিত হয়। একজনের কাছে বা একটি গোষ্ঠীর কাছে যা নৈতিক অন্য জনের কাছে অনৈতিক হয়ে উঠে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সৈন্য এবং তাদের সহযোগী দেশীয় দালালদের কাছে যা নৈতিক ছিল, স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তির কাছে তা ছিল অনৈতিক। কিন্তু যদি সাধারণ মানবিক বোধ বলে, বিনা বিচারে মানুষ হত্যা অপরাধ। তাহলে, ওই অপরাধ থেকে অপরাধী মুক্ত হতে পারে না। সেই কারণে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীরা হত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজ ইত্যাদির কথা স্বীকার করতে চায় না।শিক্ষাব্যবস্থার প্রক্রিয়া, পারিবারিক ইচ্ছা, আর্থিক স্বচ্ছলতা ইত্যাদির দ্বারা তাড়িত হয়ে, পরিবারের অভিভাবকরা অনেক সময় ভুল সিদ্ধান্ত সন্তানদের উপর চাপিয়ে দেয়। এর ফলে এই সব সন্তানদের স্বাভাবিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। কোনো সুনির্দিষ্ট ইচ্ছায় আবদ্ধ থেকে সন্তানের কল্যাণ কামনায় যা সন্তানদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তা সন্তান এবং জাতির জন্য পরম কল্যাণ বয়ে আনে না।
সুপ্রজ্ঞা :
জ্ঞান-প্রজ্ঞা-অভিজ্ঞতা চক্র-এর,
জ্ঞানের নতুন চক্র তৈরি হয়। সিদ্ধান্তসমূহের গ্রহণ এবং যথার্থ সিদ্ধান্ত
নির্বাচন এসবের ভিতর দিয়ে মানুষের উচ্চতর জ্ঞান, প্রজ্ঞা অভিজ্ঞাতার সৃষ্টি হয়।
এর প্রয়োগ হয় আরো উচ্চতর জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে। এই পর্যায়ের প্রজ্ঞা বা জ্ঞানকে
বলা হয় সুপ্রজ্ঞা। আর সুপ্রজ্ঞা কোনো বিষয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণার জন্ম দেয়।
এর ফলে সুনির্দিষ্ট বিষয়ে জন্ম নেয় সচেতনতা
(cognisance)। এর
মধ্য দিয়ে পর্যায়ক্রমে সৃষ্টি হয় কোনো বিষয়
সম্পর্কে সুষ্পষ্ট ধারণা।
সুপ্রজ্ঞার অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করে সমবেক্ষণ
(Apperception)।
পূরর্বের অভিজ্ঞতা বর্তমানের বিষয় বুঝতে সাহায্য করে। এক্ষেত্রে অতীতের
অভিজ্ঞতা এবং বর্তমানের অভিজ্ঞতা এক কাতারে এনে হাজির করা হয়। এরই সূত্রে মনের
ভিতর সৃষ্টি হয় সমবেক্ষণ প্রক্রিয়া। ধরা যাক দূর অতীতে কোন ঘটে যাওয়া ঘটনার
সাথে বর্তমানের ঘটনার কোনো কোনো অংশের মিল রয়েছে। মন উভয় বিষয়কে সমানভাবে
পর্যবেক্ষণ করে, বর্তমানের উপযোগী একটি সিদ্ধান্ত নেবে। এ্ইভাবে যধার্থ
সিদ্ধান্তের ভিতর দিয়ে সুপ্রজ্ঞার পরিচয় পাওয়া যাবে। মূলত মানুষের জানার
সীমাবদ্ধতা আছে। তাই তার সিদ্ধান্তে কিছু না কিছু ভুল হবে এটা মেনে নেওয়াটাও
সুপ্রজ্ঞার পরিচয় হবে। দেখা যায় কোনো ভালো সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পর দেখা
যায়, অন্য কোনো বিকল্প সিদ্ধান্ত হয়তো আরো ভালো ছিল।
যে কোনো সত্তার গুণমান অনুসারে একটি সত্তার পরিচয়ের ক্ষেত্র তৈরি হয়। সত্তার গুণগতবৈশিষ্ট্যসমূহ দিয়ে তৈরি হয় সত্তাগুণ। আর সত্তাগুণের সংস্পর্শে মানুষের নানা ধরনের অনভূতি সৃষ্টি হয়। এই অনুভব মানুষের মনোগত দশার সৃষ্টি করে। মনোগত দশায় তৈরি হয় সুপ্রজ্ঞা দশা (cognitive state)। এই সুপ্রজ্ঞাদশার মধ্য দিয়ে আরও উন্নততর যে দশায় পৌঁছানোর প্রক্রিয়া সৃষ্টি হয় 'চেতনা (consciousness)'। বলে রাখা ভালো- consciousness-এর বাংলা সচেতনতা এবং চেতনা। দুটো বিষয় এক নয়। মূলত ধারণার বিকাশ ঘটে চেতনার ভিতর দিয়ে। আর চেতনা মানুষকে সচেতন করে তোলে। এই সূত্রে পরবর্তী অধ্যায়ে আলোচনা করবো 'চেতনা ও ধারণা' নিয়ে।