ঢাকা প্রকাশ
ঢাকা থেকে প্রকাশিত প্রথম বাংলা সাপ্তাহিক সংবাদপত্র।

১৮৬১ সালের ৭ মার্চ বাবুবাজারের ‘বাঙ্গালা যন্ত্র’ থেকে। উল্লেখ্য, বাঙ্গলাযন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ঢাকার সাভারের তেঁতুলঝোড়া গ্রামের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ব্রজসুন্দর মিত্র। ঢাকা প্রকাশের প্রথম সম্পাদক ছিলেন কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার। পরিচালকগণের মধ্যে প্রধান ছিলেন ব্রজসুন্দর মিত্র, দীনবন্ধু মৌলিক, ঈশ্বরচন্দ্র বসু, চন্দ্রকান্ত বসু প্রমুখ।

প্রকাশিত এই পত্রিকার শিরোনামের নিচে একটি সংস্কৃত শ্লোকাংশ ‘সিদ্ধিঃ সাধ্যে সমামস্ত্ত’ (সাধ্য অনুযায়ী সিদ্ধিলাভ হোক) মুদ্রিত হতো। প্রতি সপ্তাহে গুরুবার অর্থাৎ বৃহস্পতিবার তা বের হতো। ডাকমাশুলসহ পত্রিকার বার্ষিক মূল্য ছিল ৫ টাকা।

প্রথম দিকে পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার বাঁদিকে থাকত বিজ্ঞাপন, ডানদিকে সম্পাদকীয় বা গুরুত্বপূর্ণ কোনো খবর বা বিশেষ কোনো বিষয়ের ওপর পত্রিকার নিজস্ব মতামত। পরে থাকত ‘সম্বাদাবলী’। এ বিভাগে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা থেকে সংগৃহীত বা নিজেদের সংগৃহীত সংবাদ ছাপা হতো। পত্রিকার তৃতীয় পৃষ্ঠায় কখনও বা শেষ পৃষ্ঠায় ছাপা হতো পাঠকদের চিঠিপত্র।  

কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের পর ১৮৬৫ খ্রিষ্টাব্দে দীননাথ সেনের পরিচালনায় পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এ সময় বৃহস্পতিবারের পরিবর্তে শুক্রবারে পত্রিকা প্রকাশিত হতে থাকে। চতুর্থ বর্ষের ২৩ থেকে ৩৬ সংখ্যা পর্যন্ত দীননাথ পরিচালনা করেন। পরে সে ভার অর্পিত হয় জগন্নাথ অগ্নিহোত্রী ও গোবিন্দপ্রসাদ রায়ের ওপর। পঞ্চম বর্ষ থেকে শুক্রবারের বদলে ঢাকা প্রকাশ রোববারে প্রকাশিত হতে শুরু করে।

ঢাকা প্রকাশ প্রথম প্রকাশিত হয় ব্রাহ্মদের মুখপত্র হিসেবে। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে মালিকানা বদলের সঙ্গে সঙ্গে পত্রিকার দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে যায়। তাই দেখা যায় পত্রিকাটি কখনও ব্রাহ্মদের, কখনওবা রক্ষণশীল হিন্দুদের সমর্থন করেছে। রাজনৈতিক বিষয়ে পত্রিকাটি সব সময় মধ্যপন্থা অবলম্বন করত এবং শাসক ও শাসিতের মধ্যে শান্তি স্থাপনের চেষ্টা করত। এর ফলে বঙ্গভঙ্গ এবং স্বদেশী আন্দোলনের সময় পত্রিকাটিকে অনেক বিপদের সম্মুখীন হতে হয়।

উনিশ শতকে পূর্ববঙ্গ থেকে যেসব সংবাদপত্র ও সাময়িকী প্রকাশিত হতো সেসবের মধ্যে প্রায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঢাকা প্রকাশের সংবাদ এবং মতামতকেই রিপোর্ট অন দ্য নেটিভ পেপারস গুরুত্বসহকারে উদ্ধৃত করত।

পপ্রথম প্রকাশের সময় পত্রিকার প্রচারসংখ্যা ছিল ২৫০; উনিশ শতকের নববইয়ের দশকে হিন্দু পুনরুত্থানবাদীদের আন্দোলনের সময় এ সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৫০০০। এ থেকে তৎকালে পত্রিকাটির জনপ্রিয়তা প্রমাণিত হয়। ঢাকা প্রকাশ প্রায় ১০০ বছর টিকে ছিল; পূর্ববঙ্গের আর কোনো পত্রিকার আয়ুষ্কাল এত দীর্ঘ ছিল না। ঢাকাসহ পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস ঢাকা প্রকাশ ছাড়া রচনা করা সম্ভব নয়।  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে, 'ঢাকাপ্রকাশ' এর সর্বশেষ সংখ্যাটির তারিখ ১২-৪-১৯৫৯। সম্পাদক আবদুর রশীদ খান। প্রকাশিত হয় ৫৯/৩ কিতাব মঞ্জিল, ইসলাম পুর থেকে। বিশ শতকের ষাটের দশকে পত্রিকাটির প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকাপ্রকাশ তার পাঠকপ্রিয়তার কারণে পরবর্তি প্রায় ১০০ বছর ধরে প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটি প্রকাশের পরে প্রচার সংখ্যা ছিল আড়াইশো। পরবর্তিতে উনিশ শতকের নব্বই দশকে সে সংখ্যা দাঁড়িয়ে ছিল পাঁচ হাজারে।  
সূত্র :