শান্তিনিকেতন পত্রিকা
শান্তিনিকেতন (বিশ্বভারতী) থেকে প্রকাশিত পত্রিকা। মূলত শান্তিনিকেতন আশ্রমের আদর্শ, শিক্ষা-ভাবনা এবং রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিক চেতনাকে জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে
এর প্রকাশনা শুরু হয়েছিল।
১৩২৬ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসে (১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দ) শান্তিনিকেতন পত্রিকার প্রথম প্রকাশিত
হয়। এই পত্রিকার প্রথম পর্যায়ের সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন বিধুশেখর শাস্ত্রী। পত্রিকার প্রথম দুই বছর অর্থাৎ ১৩২৬ এবং ১৩২৭ বঙ্গাব্দ (১৯১৯ - ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত নিয়মিতভাবে প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
১৩২৭ বঙ্গাব্দের শেষ দিকে এবং ১৩২৮ বঙ্গাব্দের শুরুতে (১৯২১ খ্রিষ্টাব্দ) পত্রিকার সম্পাদনা পদ্ধতিতে কিছু পরিবর্তন আসে। এই সময় থেকে ক্ষিতিমোহন সেন, জগদানন্দ রায় এবং আশ্রমের অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরা সম্পাদকমণ্ডলীতে যুক্ত হন এবং দায়িত্ব ভাগ করে নেন।
এই সময় বিধুশেখর শাস্ত্রী উপদেষ্টা হিসেবে বা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দীর্ঘকাল এই পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
জগদানন্দ রায়ের সম্পাদনায় পত্রিকা প্রকাশের সময় বিজ্ঞান বিষয়ক সহজপাঠ্য প্রবন্ধও স্থান
পায়। কারণ তিনি ছিলেন মূলত বিজ্ঞানের শিক্ষক ও লেখক। সাহিত্য দর্শনের পাশাপাশি
বিজ্ঞানের পাঠ আবশ্যক মনে করে তিনি ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। এই সময় বিশেষভাবে এই পত্রিকা
সম্পাদনায় সহযোগী হিসেবে সক্রিয় ছিলেন -ক্ষিতিমোহন সেন। তবে পত্রিকা সম্পাদনে আশ্রমের প্রবীণ শিক্ষকদের
সমন্বয়ে যৌথভাবে পরিচালিত হতো।
১৯১৯-২৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ এবং শান্তিনিকেতনের মন্দিরে দেওয়া ভাষণগুলো নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে।
ইতোমধ্যে শান্তিনিকেতন আশ্রম ধীরে ধীরে 'বিশ্বভারতী' বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত
হওয়ার প্রক্রিয়া চলছিল। পত্রিকার পাতায় সেই পরিবর্তনের ছাপ লক্ষ্য করা যায়। বিশ্বভারতীর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে নানা আলোচনা এই সময় গুরুত্ব পায়।
পত্রিকাটি মাঝেমধ্যে অনিয়মিত হলেও এর গুরুত্ব কখনো কমেনি। ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দের দিকে নাগাদ শান্তিনিকেতন পত্রিকার ধরনে কিছুটা পরিবর্তন আসে। আশ্রমিক সংবাদ এবং ছাত্র-ছাত্রীদের সৃজনশীল লেখা এতে বেশি স্থান পেতে শুরু করে।
রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত (১৯৪১) এই পত্রিকা তাঁর নির্দেশিত পথেই চলেছে।
শান্তিনিকেতন পত্রিকায় (১৯১৯ থেকে শুরু হয়ে পরবর্তীকালে বিশ্বভারতীর সঙ্গে যুক্ত) রবীন্দ্রনাথের বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ ও শান্তিনিকেতনের মন্দিরে দেওয়া ভাষণ নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে, বিশেষ করে ১৯১৯-১৯২৫ সময়কালে। এগুলোর অনেকগুলিই পরবর্তীকালে “শান্তিনিকেতন” নামক গ্রন্থে (বিশ্বভারতী থেকে প্রকাশিত, বিভিন্ন খণ্ডে) সংকলিত হয়েছে। এই গ্রন্থটি মূলত শান্তিনিকেতন পত্রিকায় প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক ও শিক্ষা-সংক্রান্ত ভাষণ-প্রবন্ধের সংকলন।
কিছু উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধের উদাহরণ (শান্তিনিকেতন গ্রন্থ থেকে):
- উত্তিষ্ঠত জাগ্রত
- উদ্দীপনা ও আত্মজাগরণের আহ্বান।
সংশয়
- সন্দেহের দার্শনিক আলোচনা।
অভাব
- অভাবের মধ্যে পূর্ণতার অনুভূতি।
আত্মার দৃষ্টি
- আত্মদর্শনের গভীর চিন্তা।
পাপ
- পাপের স্বরূপ ও মুক্তি।
দুঃখ
- দুঃখের আধ্যাত্মিক অর্থ।
ত্যাগ এবং ত্যাগের ফল
- ত্যাগের মাহাত্ম্য।
প্রেম
- প্রেমের আধ্যাত্মিক রূপ।
সামঞ্জস্য
- জীবনের সামঞ্জস্য ও ঐক্য।
কী চাই? প্রার্থনা
- প্রার্থনার মর্ম।
হিসাব
- জীবনের হিসাব-নিকাশ ও আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি।
- শান্তিনিকেতনে ৭ই পৌষের উৎসব
- পৌষমেলা বা আশ্রমের উৎসব নিয়ে বিশেষ আলোচনা।
সূত্র:
- শান্তিনিকেতন (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রচিত):
- প্রথম খণ্ড: ১৯৩৪ সালে বিশ্বভারতী গ্রন্থন
বিভাগ থেকে প্রকাশিত।
- দ্বিতীয় খণ্ড: ১৯৪৯ সালে প্রকাশিত।
- এই গ্রন্থে শান্তিনিকেতন পত্রিকায় প্রকাশিত
রবীন্দ্রনাথের অধিকাংশ আধ্যাত্মিক ভাষণ ও প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে।
- রবীন্দ্র-রচনাবলী (বিশ্বভারতী
সংস্করণ):
- এতে শান্তিনিকেতন-সংক্রান্ত প্রবন্ধগুলো
বিভিন্ন খণ্ডে (যেমন ১২, ১৪, ১৫, ১৬ ইত্যাদি খণ্ডে) সংকলিত। সম্পূর্ণ
সংস্করণে ২৭-৩০ খণ্ড পর্যন্ত বিস্তৃত। অনলাইনে রবীন্দ্র রচনাবলীর ডিজিটাল
সংস্করণে (যেমন rabindra-rachanabali.nltr.org) এই প্রবন্ধগুলো পড়া যায়।
- শান্তিনিকেতন পত্রিকার বিভিন্ন
সংখ্যা।