আত্মতত্ত্ব
আত্ম (নিজ) বিষয়ক তত্ত্ব বা জ্ঞান। বাউল দর্শনের একটি অন্যতম বিষয়াঙ্গ।
নিজেকে জানার আগ্রহ যে সকল প্রশ্ন মনে জাগ্রত হয়ে ওঠে, তার উত্তর পাওয়ার সাধনাই
হলো- আত্মতত্ত্বের সাধনা। এ সাধনার মূলে থাকে প্রাথমিক কিছু জিজ্ঞাসা- আমি
কে? আমার মূল সত্তা কে? আমার উদ্ভব কোথায়, আমার গন্তব্য কি?
বাউল দর্শনে আত্মতত্ত্বের জিজ্ঞাসার মূলে রয়েছে আত্মা বা পরমাত্মা সম্বন্ধীয় জ্ঞান, মতবাদ বা দর্শন।
এই দর্শনের মধ্য দিয়ে নিজের স্বরূপকে জানার চেষ্টা করা। মূলর পরম সত্যকে উপলব্ধি করার একটি গভীর আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়ার
বিষয় হলো আত্মতত্ত্ব। এই তত্ত্বটি চারটি মুখ্য বিষয় অবলম্বনে বিকশিত হয়েছে। এগুলো
হলো-
- মূলসত্তা: আত্মতত্ত্ব অনুসারে, আত্মা হলো নিত্য, অবিনশ্বর এবং প্রমাণের অতীত।
এইআত্ম পরামাত্মা রূপে মানুষের দেহেই বিরাজ করেন।
- জ্ঞানের উৎস: আত্মতত্ত্ব হলো সেই পারমার্থিক জ্ঞান বা তত্ত্বজ্ঞান, যার
দ্বারা তাঁর মনের ঘরের মনের মানুষকে (পরমাত্মা) চিনতে পারে।
- মোক্ষ বা মুক্তি: আত্মোপলব্ধির মাধ্যমে মোক্ষ বা মুক্তি অর্জনই জীবনের পরম লক্ষ্য।
পর্মাত্মাকে চিনতে পারলেই নিজেকে চেনা যায়।
আত্মতত্ত্বে আত্মার ধারণা:
- ভারতীয় উপনিষদ ও বেদান্ত অনুসারে- আত্মা এবং ব্রহ্ম অভিন্ন। 'এই আত্মাই ব্রহ্ম'—এই সত্যকে উপলব্ধি করাই আত্মতত্ত্ব। আত্মাকে জানলেই সবকিছু জানা হয়ে যায়।
- গীতায় বলা হয়েছে- আত্মা হলো জ্ঞানের কণা যা অবিনশ্বর এবং দেহের বিনাশ হলেও যার বিনাশ নেই। আত্মার স্বরূপ জানালে মোহ দূর হয়।
- সাংখ্য ও যোগশাস্ত্রে বলা হয়েছে- আত্মা বা পুরুষ হলো বিশুদ্ধ চৈতন্য এবং নিত্য। যোগের মাধ্যমে চিত্তবৃত্তির নিরোধ করে পুরুষ বা আত্মা তার স্ব-স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারে।
- বৌদ্ধ ও চার্বাক দর্শনে বলা হয়েছে-বৌদ্ধ দর্শনে 'অনাত্মবাদ' বা নৈরাত্ম্যবাদ প্রচার করা হয়, যা আত্মার স্থায়ী সত্তাকে অস্বীকার করে। চার্বাক দর্শন কেবল চৈতন্যবিশিষ্ট দেহকেই আত্মা বলে মনে করে এবং আত্মার পৃথক অস্তিত্ব স্বীকার করে না।
- বাউল দর্শনে আত্মতত্ত্ব ও দেহতত্ত্ব (দেহ-কেন্দ্রিক দর্শন) অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত এবং বাউলরা মনে করেন যে, নিজেকে জানলেই পরমাত্মা বা সৃষ্টিকর্তাকে জানা যায়।
আত্মতত্ত্বে পরমাত্মার অবস্থান
- বাউলরা বিশ্বাস করেন যে, স্রষ্টা বা পরম পুরুষ বাইরে কোথাও নেই, তিনি মানবদেহের মধ্যেই বাস করেন। এই পরমাত্মাকে বাউলরা বিভিন্ন প্রতীকের মাধ্যমে প্রকাশ করেন।
লালন সাঁই এই পরমাত্মাকে মনের মানুষ, অচিন পাখি প্রতীকী শব্দে অভিহিত করেছেন।
পরমসত্তা মানবদেহে বাস করেন- পরমাত্মা রূপে।
- বাউল সাধকরা মনে করেন দেহ হলো বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড।
তাই মানবদেহ হলো ক্ষুদ্র ব্রহ্মাণ্ড বা 'ভাণ্ড' হিসেবে দেখেন। তাঁদের মতে, "যে লীলা ব্রহ্মাণ্ডের মাঝার, সে লীলা ভাণ্ডের মাঝার।" অর্থাৎ, সৃষ্টি রহস্য দেহের ভেতরেই বিদ্যমান। আত্ম-সাধনা এবং দেহতত্ত্ব
আত্মতত্ত্ব উপলব্ধি করার জন্য বাউলরা দেহকে প্রধান অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করেন, এই সাধনাকেই দেহতত্ত্ব বলা হয়।
বাউলরা দেহকে পবিত্র ভাবেন। কারণ আত্মা (পরম পুরুষ) দেহে বাস করে।
তাই তাঁর পার্থিব দেহ সাধনার ভেতর দিয়েই দেহোত্তর জগতে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন।
আত্মতত্ত্বে গুরুর গুরুত্ব:
বাউল তত্ত্বের সাধনা গুরু-নির্ভর।
তাই বাউলদের এই দেহকেন্দ্রিক আধ্যাত্মিক সাধনা গুরু-নির্ভর। গুরুর কাছে দীক্ষা নিয়ে যোগ ও অন্যান্য আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁরা দেহের ভেতরে থাকা 'মনের মানুষ'-এর সন্ধান করেন।
আত্মতত্ত্বে মোক্ষ লাভ: আত্ম-সাধনার মূল লক্ষ্য হলো মানবাত্মার সাথে পরমাত্মার মিলন সাধন করা, যা বাউলতত্ত্বে 'নির্বাণ' বা 'মোক্ষ' বা 'মহামুক্তি' লাভ নামে পরিচিত।
আত্মতত্ত্ব ও অসাম্প্রদায়িকতা: যেহেতু সকল দেহেই পরমাত্মা বিরাজ
করেন। তাই অসাম্প্রদায়িক চেতনা
আত্মতত্ত্বের গভীর উপলব্ধি থেকেই বাউল দর্শনে এসেছে। এই তত্ত্বে জাতভেদের স্থান নেই।