সঙ্গীতে ভাববাদের প্রকাশ
ভাববাদের বিষয় যে কোনো বিষয় সত্যাশ্রয়ী হয়ে প্রকাশিত সঙ্গীতের প্রতীকী উপকরণের
মাধ্যমে। সঙ্গীতের ভাববাদ হলো-
সঙ্গীতের সত্য ও সুন্দরকে উপস্থাপন করা হয়। আত্মদর্শন এবং পরম সৌন্দর্যে সন্ধানের
ভিতরে রয়েছে সঙ্গীতের সার্থকতা। প্রাথমিকভাবে সঙ্গীতের সুর ও তাল হলো সঙ্গীতের
কাঠামো। গানের বাণীকে উপলব্ধি করে- ভাবের সত্য ও সুন্দরকে প্রকাশ করার ভিতরে রয়েছে
গানের ভাববাদী ভাবনা। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সুরে কিম্বা যন্ত্রসঙ্গীতের বাদনে
সৌন্দর্যের গভীরতলকে স্পর্শ করার সাধনায় রয়েছে ভাববাদের প্রকাশের অঙ্গীকার। প্রাকৃতিক
ভাষায় রচিত গানের বাইরের সঙ্গীতকে সাধারণভাবে বলা হয় বাণীবিহীন সঙ্গীত। এই ভাষাহীন
সুরের আনন্দ-বেদনার লীলাকে প্রকাশ করার জন্য প্রয়োজন গভীর সৌন্দর্যবোধ এবং রসগ্রাহী
মনোভাব। এই মনোভাব থেকে সৃষ্ট বাণীহীন গান হয়ে উঠবে গভীর অর্থবহ। যা মনোলোকের
অতলস্পর্শী সৌন্দর্যকে জাগরিত করবে।
ঈশ্বরভাবনা, ভক্তি, সাধনা সঙ্গীতের প্রধানক্ষেত্র হিসেবে ভাববাদী গানকে বিশেষভাবে
স্থান দেওয়া করা হয়। কারণ এই জাতীয় গানে থাকে পরমসত্য ও পরমসুন্দরের সম্মিলনে পরমসত্তাকে
উপলব্ধির আকাঙ্ক্ষা। এ্ সকল গানে ভক্তি, সাধনা ও আত্মার মুক্তির মাধ্যম হয়ে সঙ্গীত হয়ে
ওঠে মুক্তির বাহন। সেই উপলব্ধিতে রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন- তাঁর বাইরের ও
ভিতরের জীবন উপলব্ধির যে দ্বন্দ্ব- গানে গানে তাঁর সে
বন্ধন টুটে যাক।
ধর্মসঙ্গীতের বাইরে প্রেম, প্রকৃতি, স্বদেশ ইত্যাদি পর্যায়ে রয়েছে ভাববাদী প্রতীকী
উপকরণের মহত ব্যবহার। গানের সত্য সবসময় চোখে দেখা যায় না, তাই তাকে উপলব্ধি করতে হয় চেতনার গভীর তলে,
অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে। সঙ্গীত
গভীর অর্থবহ হয়ে ওঠে সেখানে।
ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে- সাধারণত শুদ্ধ মধ্যমকে প্রসন্নতা এবং কড়ি মধ্যমকে বেদনার
স্বর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শুদ্ধ মধ্যমের সাথে কোমল ঋষভের স্বরসঙ্গতি উদার,
প্রসন্ন ও শান্ত রূপ তৈরি করে। এর উদাহরণ ভৈরব ও ভৈরবী রাগের ম ঋ-এর প্রয়োগ। ভৈরবে
ম থেকে ঋ-তে যাওয়ার সময় শুদ্ধ গান্ধার ছুঁয়ে যায়। এর ফলে ভৈরব রাগটি প্রসন্ন, শান্ত
এবং উদার হয়ে ওঠে। পক্ষান্তরে ভৈরবী ম ঋ-তে যাওয়ার সময় কোমল গান্ধার ছুঁয়ে যায়। ফলে
ভৈরবীতে ভৈরবের চেয়ে অধিকতর স্নিগ্ধ রূপ প্রকাশ পায়। কড়ি মা প্রহরান্তরের রাগে
বিদায় বিষণ্ণ রূপকে প্রকাশ করে। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর রচিত 'যামযোজনায় কড়িমধ্যম'
গীতিআলেখ্যে এর সার্থক ব্যবহার দেখিয়েছেন। এ ছাড়া সন্ধি রাগ হিসেব কড়ি মধ্য
বেদনার্ত করে তোলে পূরবী মারবা রাগের বিষাদী চলনে।
চর্যগীতির আমল থেকে গানের বাণীর রহস্যময়তার বিচারে সন্ধ্যাভাষা নামক নাম পেয়েছিল:
সে ধারা এখনও আছে। লালনের 'খাঁচার ভিতর অচিন পাখিন কেমনে আসে যায়'- এর একটি উৎকৃষ্ট
উদাহরণ। ভাবদর্শনে বাণীতে ব্যবহার করা হয় নানা রূপকল্প। নজরুলে গানে পাওয়া যায়- 'দেখ
আমিনা মায়ের কোলে- দোলে শিশু ইসলাম দোলে' এখানে ইসলাম ধর্ম আর নবি সমার্থক। তাই
আমিনার কোলে যে শিশু তোলে- সে মূলত 'শিশু ইসলাম'।
চিত্রকর্মে ভাববাদের প্রকাশ
এক বিশেষ ধরনের চিত্রকর্ম ধারা। এই শিল্পধারায় শিল্পী বাইরের জগতের নিছক বাস্তব রূপকে
উপস্থাপন করার পরিবর্তে তাঁর অনুভূতি, আবেগ, স্বপ্ন, অন্তর্দৃষ্টিকে প্রকাশ করেন।
এই চিত্রকর্মে কোনো বিষয়কে শিল্পী কীভাবে অনুভব করছেন সেই সত্যকেই প্রকাশ করেন।
এক্ষেত্রে অনেক সময় শিল্পী বাস্তবদৃশ্যকে প্রতীকী উপকরণ হিসেবে- ছবির আকার, রঙ, রেখা
ইত্যাদি ব্যবহার করে। ফলে বাস্তব দৃশ্যের বিচারে সত্যাশ্রয়ী হয় না। কিন্তু শিল্পীর
ভাবনার বিচারে সত্যাশ্রয়ী। এতে প্রতিফলিত হয় শিল্পীর ভাব। এক্ষেত্রে শিল্পী হয়ে
ওঠেন পরমস্রষ্টা। কারণ তাঁর বিচারে তিনি যা ভাবেন- সেটাই শেষ কথা।
![]() |
|
The Starry Night (১৮৮৯), ভিনসেন্ট ভ্যান গগ |
ভাবচিত্রের নমুনা
এই জাতীয় চিত্রকর্ম নিদর্শন হলো- ভিনসেন্ট ভ্যান গগ (Vincent van Gogh)-এর বিখ্যাত চিত্রকর্ম
'The Starry Night' (১৮৮৯)।
এই ছবির অতিরঞ্জিত উজ্জ্বল, দীপ্তিময় বলয়গুলো হলো- আকাশের তারা। শিল্পী তার অন্তর্দৃষ্টি ও আবেগের ঘূর্ণি প্রকাশ করতে এগুলো ব্যবহার করেছেন।
এগুলো শিল্পীর মানসিক অস্থিরতা ও স্বপ্নদৃশ্যের প্রতীক।
এছবির চাঁদ বিশ্বগ্রাসীর মতো। তাই এটি আকারে বড়
অস্বাভাবিকভাবে উজ্জ্বল। এছাড়া প্রতিটি নক্ষত্রের চারপাশে হলুদ আভা শিল্পীর আলোক-অনুভূতির তীব্রতর প্রকাশ।
ছবিটির নিচের দিকে রয়েছে অন্ধকার ছাওয়া একটি শান্ত গ্রাম। এই গ্রামের কয়েকটি জানালায়
রয়েছে হলুদ আলো। এর মধ্য দিয়ে শিল্পী মানবজীবনের ক্ষুদ্রতারা সাথে উপরের আঁকা মহাবিশ্বের মহিমাকে
তুলনামূলক বিচারে উপস্থাপন করেছেন। মহাকাশ ও শান্তগ্রামের সামনে রয়েছে আকাশের দিকে
উঠে যাওয়া উঁচু সাইপ্রেস গাছ। এটি শিল্পী মৃত্যুর প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
উল্লেখ্য পাশ্চাত্যে সাইপ্রেস গাছ সমাধিক্ষেত্রে রোপণ করা হয়। এর মধ্য দিয়ে শিল্পী
এই ছবিতে জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব আর অনন্ত মহাজগতের দ্বন্দ্বকে প্রকাশ করে।