কথিত ভাষা
spoken language

মানুষের মুখনিঃসৃত ভাব-প্রকাশক ধ্বনি এবং তার ব্যবহারবিধি-কে এক কথায় মানুষের ভাষা বলা হয়। মানুষের ভাষাকে কতকগুলো স্বতঃসিদ্ধ শর্ত দ্বারা নির্দেশিত করা হয়।  

ব্যুৎপত্তি
মানদণ্ড
মানুষের মৌখিক ভাষা ৩টি প্রধান মানদণ্ডের বিচারে আদর্শিক রূপ পায়। যেমন-

১: বাগ্‌যন্ত্রজাত ধ্বনি কথিত ভাষার প্রধান উপাদান হবে মানুষের বাগ্‌যন্ত্রের সাহায্যে উৎপন্ন ধ্বনি। অর্থাৎ কণ্ঠ, জিহ্বা, তালু, দাঁত, ওষ্ঠ, কণ্ঠনালি প্রভৃতি বাক্‌প্রত্যঙ্গের সমন্বয়ে উৎপন্ন ধ্বনিই কথিত ভাষার ভিত্তি। ইশারা, স্পর্শ, অঙ্গভঙ্গি বা মুখাবয়বের অভিব্যক্তি যোগাযোগে সহায়ক হলেও সেগুলো কথিত ভাষার উপাদান নয়। ধ্বনির উৎপত্তির দিক থেকে কথিত ভাষার ধ্বনি প্রধানত দুই প্রকার—

১. বহির্গামী ধ্বনি (Egressive sounds)
২. অন্তর্গামী ধ্বনি
(Ingressive sounds)
উল্লেখ্য, মানবভাষার অধিকাংশ ধ্বনিই বহির্গামী বায়ুপ্রবাহের মাধ্যমে উৎপন্ন হয়।

২. অর্থবহতা ও সামাজিক স্বীকৃতি কথিত ভাষার ধ্বনি কেবল উচ্চারিত হলেই ভাষা হয় না; তা অর্থবহ হতে হবে এবং একটি ভাষাসমাজে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ব্যবহৃত হতে হবে। ভাষা মূলত একটি সামাজিক ব্যবস্থা; তাই তার অর্থ ও ব্যবহার সংশ্লিষ্ট ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত স্বীকৃতির ওপর নির্ভরশীল।

উদাহরণস্বরূপ, "ভাত" একটি শব্দ; এটি নিজে ভাষা নয়। কিন্তু "আমি ভাত খাই"—এই বাক্যে শব্দগুলো ব্যাকরণসম্মতভাবে সংগঠিত হয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থ প্রকাশ করে। এই নিয়মবদ্ধ অর্থপ্রকাশের ক্ষমতাই ভাষার মৌলিক বৈশিষ্ট্য।  

কোনো শব্দের অর্থ সকল ভাষাভাষী সমানভাবে জানবেন—এমনটি প্রয়োজনীয় নয়। একটি ভাষায় এমন বহু শব্দ রয়েছে, যেগুলো অপ্রচলিত, আঞ্চলিক, প্রাচীন বা বিশেষায়িত হওয়ার কারণে অনেকের কাছে অপরিচিত হতে পারে। তাই কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিসমষ্টি কোনো শব্দের অর্থ না জানলেই সেই শব্দ ভাষার অন্তর্ভুক্ত থাকবে না—এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায় না।

গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের রচিত গানে পাওয়া যায়- "আমি যামিনী, তুমি শশী হে, ভাতিছ গগন মাঝে"এখানে ভাতিছ শব্দটি ভাত্ (আলোকিত হওয়া, উদ্ভাসিত হওয়া) ধাতু থেকে উৎপন্ন। আধুনিক বাংলায় এই অর্থে ভাত্ ধাতুর ব্যবহার বিরল হওয়ায় অনেক পাঠকের কাছে শব্দটি অপরিচিত মনে হতে পারে। কিন্তু প্রভাত (প্রকৃষ্টরূপে আলোকিত অবস্থা; ভোর) শব্দটি অধিকাংশ বাঙালির কাছেই পরিচিত, যদিও তার সঙ্গে ভাত্ ধাতুর সম্পর্ক অনেকেই উপলব্ধি করেন না। অতএব, কোনো শব্দের ভাষাগত মর্যাদা কোনো ব্যক্তির জ্ঞানের ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট ভাষার শব্দভাণ্ডারে তার স্বীকৃতি, ঐতিহাসিক ব্যবহার এবং ভাষাসমাজে তার গ্রহণযোগ্যতার ওপর। অপ্রচলিত, প্রাচীন বা দুর্বোধ্য হলেও যদি কোনো শব্দ একটি ভাষার স্বীকৃত শব্দভাণ্ডারের অংশ হয়, তবে তা সেই ভাষার উপকরণ হিসেবেই বিবেচিত হবে।

আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বন্ধুমহলে প্রচলিত ইঙ্গিতময় শব্দ বা গোয়েন্দা বিভাগের সাঙ্কেতিক শব্দ উচ্চারণযোগ্য হলেও সেগুলো মূল ভাষার অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে এ ধরনের শব্দ যদি ব্যাপক জনগোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে, তাহলে তা ভাষার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতে পারে। ব্যবহারের ক্ষেত্রগত সীমাবদ্ধতার কারণে কোনো কোনো শব্দ আমরা সব পরিস্থিতিতে ব্যবহার করি না। বিষয়টি অনেকাংশে নির্ভর করে কোনো নির্দিষ্ট জাতির সংস্কৃতি কিংবা সেই জাতির কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর ভাষা-ব্যবহারের রীতির ওপর। যেমন, বাঙালি সমাজের বহু পরিবারে প্রথাগতভাবে মুরুব্বিদের সামনে যৌনগন্ধী শব্দ ব্যবহার করা শোভন বলে বিবেচিত হয় না। তবে কোনো কোনো পরিবার বা গোষ্ঠীতে এ ধরনের ব্যবহার প্রচলিত। আবার একই শব্দ কোনো গোষ্ঠীর কাছে সাধারণ ব্যবহারযোগ্য শব্দ হিসেবে বিবেচিত হলেও অন্য কোনো গোষ্ঠী বা অঞ্চলে তা গালি বা অশালীন শব্দ হিসেবে গণ্য হতে পারে।

৩. উচ্চারণযোগ্য ধ্বনির প্রকাশ অন্য কোনো মাধ্যমেও হতে পারে। তবে সেই মাধ্যম থেকে যদি মূল ভাষার প্রমিত উচ্চারণ পুনর্নির্মাণ করা সম্ভব হয়, তাহলে সেটিকে ভাষার একটি বিকল্প প্রকাশমাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এ দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো ভাষার নিজস্ব বর্ণলিপি সেই ভাষার একটি বিকল্প প্রকাশমাধ্যম, কারণ সেই লিপি পাঠ করে ভাষার ধ্বনিরূপ যথাসম্ভব অবিকৃতভাবে পুনরুৎপাদন করা যায়। কিন্তু কোনো প্রতীক বা চিত্র যদি একাধিক উচ্চারিত রূপ নির্দেশ করে, তবে তা নিজে কোনো নির্দিষ্ট ভাষার প্রত্যক্ষ বাহক নয়। যেমন, এক গ্লাস পানির একটি ছবি দেখে কেউ ‘এক গ্লাস পানি’, কেউ ‘এক গ্লাস জল’, আবার অন্য ভাষাভাষী ব্যক্তি ‘
water’, ‘eau’ বা অন্য কোনো শব্দ উচ্চারণ করতে পারেন।

অর্থের দিক থেকে প্রতীকটি একই বস্তুকে নির্দেশ করলেও ধ্বনিগত দিক থেকে তা কোনো নির্দিষ্ট ভাষাকে প্রকাশ করে না। বিপরীতে, বাংলা বর্ণলিপিতে ‘এক গ্লাস পানি’ বা ‘এক গ্লাস জল’ লিখলে পাঠক নির্দিষ্ট ধ্বনিগত রূপেই তা উচ্চারণ করতে পারেন। যে লিপি কোনো নির্দিষ্ট ধ্বনিগত রূপ নির্দেশ করে না, বরং কেবল ধারণা বা অর্থ প্রকাশ করে, তাকে কোনো নির্দিষ্ট ভাষার প্রত্যক্ষ বাহক বলা যায় না।

তবে কোনো লিপিচিহ্ন যদি একটি নির্দিষ্ট ভাষা বা উপভাষায় একটি নির্দিষ্ট ধ্বনিগত রূপের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে যায়, তাহলে সেই চিহ্ন ওই ভাষার লিখিত রূপের অংশ হিসেবে গণ্য হয়।

চীনা লিপিকে প্রায়ই ভাবলিপি বা চিত্রলিপি বলা হলেও আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানে একে প্রধানত লোগোগ্রাফিক লিপি
(logographic writing system) হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একই চীনা অক্ষর মান্দারিন, ক্যান্টনিজ, হক্কিয়েন বা অন্যান্য চীনা ভাষায় ভিন্ন ভিন্নভাবে উচ্চারিত হতে পারে; কিন্তু প্রতিটি ভাষা বা উপভাষার নিজস্ব বক্তাসমাজে সেই অক্ষরের উচ্চারণ সুনির্দিষ্ট ও স্থির। ফলে প্রতিটি ভাষাগত সম্প্রদায়ে ওই লিপিচিহ্ন একটি নির্দিষ্ট ধ্বনিগত রূপের প্রতীক হিসেবে স্বীকৃত।

একসময় ভাষার প্রধান লিখিত প্রকাশমাধ্যম ছিল বর্ণলিপি। আধুনিক যুগে ধ্বনি-সংরক্ষণ ও পুনরুৎপাদনের বিভিন্ন প্রযুক্তি ভাষা প্রকাশের নতুন মাধ্যম সৃষ্টি করেছে। টেপ, সিডি, ডিভিডি, ডিজিটাল অডিও ফাইল কিংবা অন্যান্য শব্দ-সংরক্ষণ প্রযুক্তির মাধ্যমে ভাষার ধ্বনিরূপ সংরক্ষণ ও পুনঃপ্রকাশ করা যায়। একইভাবে, কম্পিউটারভিত্তিক বাচন-সংশ্লেষণ
(Text-to-Speech) প্রযুক্তির সাহায্যে লিখিত ভাষাকে উচ্চারিত ভাষায় রূপান্তর করা সম্ভব। এসব প্রযুক্তিও ভাষার ধ্বনিরূপ প্রকাশের কার্যকর বিকল্প মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।