আঙ্গুরবালা
(১৯০০-১৯৮৪)
বিশিষ্ট কণ্ঠশিল্পী।

১৯০০ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ আগষ্ট জন্মগ্রহণ করেন। কোনো কোনো মতে- তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে। এঁর পৈত্রিক নিবাস বর্ধমানের ইন্দ্রাস। জন্মস্থান নিয়ে মতভেদ আছে। কোনো কোনো মতে তিনি বর্ধমানের ইন্দ্রাসে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আবার কোনো কোনো মতে- উত্তর কলকাতার কাশীপুরে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম বিজলীভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (সেনা অফিসার)। তাঁর অন্যনাম ছিল সুধীরকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। মায়ের নাম হীরামতি দেবী।

তাঁর পিতৃদত্ত নাম ছিল প্রভাবতী দেবী। ডাক নাম ছিল নেড়া। তাঁর শৈশব কেটেছিল কলকাতার শ্যামপুকুর অঞ্চলে। আর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়েছিল দর্জিপাড়ায় জয়রাম মিত্র স্ট্রিটের মিশনারি স্কুলে। এরপর তিনি হেঁদোর কাছে নরম্যাল স্কুলে ভর্তি হন। এই স্কুল থেকে ছাত্রবৃত্তির পরীক্ষায় তিনি বৃত্তি লাভ করেন।

তিনি ছাত্রবৃত্তি পাশ করেন। শৈশব থেকে তাঁর গানে দারুন উৎসাহ ছিল। ছোটবেলায় বেলায় তিনি একবার যে কোনো গান শুনেই কণ্ঠে তুলে নিতে পারতেন। গানের প্রতি আগ্রহ দেখে মা হীরামতি দেবী তাকে গান শিখবার উৎসাহ দেন। সাত বৎসর বয়সে তিনি তাঁর পিতার বন্ধু অমূল্য মজুমদারের কাছে গান শেখা শুরু করেন। পরে তিনি তিনি ঈষাণ ঠাকুরের কাছে কীর্তন, জমীরুদ্দিন খাঁর কাছে গজল, দাদরা এবং ঠুংরী এবং কাজী নজরুল ইসলামের কাছে নজরুলগীতি শিখেছিলেন।

শৈশবে তাঁর পরিবার আর্থকভাবে স্বচ্ছল ছিল না। তাই নৃত্য শিক্ষক ললিত মোহন গোস্বামী তাঁকে স্টার থিয়েটারে ছোটো মেয়েদের নৃত্যদলের জন্য আনেন। এখানে থেকে প্রাপ্ত যৎসামান্য অর্থ তিনি সংসারে দিতেন। এই সময় মঞ্চের নৃত্যশিল্পী হিসেবে তাঁর নাম দিয়েছিলেন আঙ্গুরবালা।

১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে (৮ বছর বয়সে) নাট্যকার নৃপেন্দ্র চন্দ্র বসুর পরিচালিত একটি নাটকে নৃত্যগীত-শিল্পী হিসেবে মঞ্চে অভিনয় করেন।

১৯১২ খ্রিষ্টাব্দে কর্নওয়ালিস স্ট্রিটে অবস্থিত কর্নওয়ালিস মঞ্চস্থ হয়েছিল 'মুক্তার মুক্তি'। নাটকটিতে সে সময়ের প্রখ্যাত অভিনেত্রী কুসুম কুমারী অভিনয় করা সত্ত্বেও, মঞ্চসফল হয় নি। এই সময় নাট্যকার মণিলাল গাঙ্গুলি এই নাটকের দায়িত্ব নেন। এবং তিনি সুদ্ক্ষ কণ্ঠশিল্পীদের দ্বারা নাটকে গান পরিবেশনার ব্যবস্থা করেন। এই সময় মণিলাল আঙ্গুরবালাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে মঞ্চে নামান। এর ফলে নাটকটি আবার জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। একই সাথে আঙ্গুরবালা মঞ্চাভিনেত্রী হিসেবে পরিচিতা হয়ে ওঠেন। এই মঞ্চে তিনি গেয়েছিলেন মণিলাল গাঙ্গুলীর সুরারোপিত ভৈরবী রাগে- 'ভোরের পাখি সুরে সুরে মাঠে বাজে বীণা বেণু।

কর্নওয়ালিস থিয়েটার আর্থক সঙ্কটে পড়লে- মণিলাল গাঙ্গুলি থিয়েটারকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন। তাঁর সূত্রে  মঞ্চনাটকে আঙ্গুরবালার গায়িকা চরিত্রে অভিনয় করার ক্ষেত্র হয়েছিল। এরপর ধীরে ধীরে তিনি  মঞ্চে নিয়মিত শিল্পী হিসেবে অভিনয় করা শুরু করেন।

১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে এইচএমভি থেকে তার তাঁর প্রথম তাঁর প্রথম দুটি গান ের রেকর্ড প্রকাশিত হয়। এই গান দুটি ছিল এই বছরেই তাঁর গাওয়া ১টি রবীন্দ্রসঙ্গীতের রেকর্ড প্রকাশ করেছিল এইচএমভি প্রকাশ। গান দুটি ছিল- ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ ডিসেম্বর কর্ণওয়ালিশ থিয়েটারে ক্ষিরোদাপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদের রচিত  'রত্নেশ্বর মন্দির' নাটক মঞ্চস্থ হয়।  ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে কোহিনূর রঙ্গমঞ্চে অভিনয় করেন ক্ষিরোদাপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদের রচিত "বরুণা" নাটকে।

১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ সেপ্টেম্বর মুক্তি পায় তিন রিলের নির্বাক ছবি- ইন্দ্রসভা। এই ছবিটির তিন জনই ছিলেন অভিনেত্রী। এঁরা ছিলেন গুলফন—  মিস শরিফা, সবুজপরী— আর্টারিজান, রাজা— আঙুরবালা।

১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে মিনার্ভা থিয়েটারে মঞ্চস্থ হয় মহাতপচন্দ্র ঘোষের রচিত নাটক  'আত্মদর্শন'। এই বছরে এরপর আরও দুটি নাটকে 'সত্যভামা' ও 'তুলসীদাস'। এরপর ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে মিনার্ভা থিয়েটারে  অভিনয় করেন- অমৃতলাল বসুর রচিত 'ব্যাপিকা বিদায়' নাটকে। এই বছরে অভিনয় করেন 'যুগ মহাত্মা' নাটকে। ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে   'নর্তকী', ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে 'সত্যের সন্ধানে' এবং মিনার্ভা থিয়েটারে  ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে শরৎচন্দ্র ঘোষের 'জাতিচ্যুত নাটকে অভিনয় করেন। এই নাটকে তিনি নবকিশোরীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন।

১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর গাওয়া প্রথম নজরুল-সঙ্গীতের রেকর্ড প্রকাশ করেছিল- এইচএমভি। গান দুটি ছিল-
১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে মনোমোহন থিয়েটারে মণিলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচিত 'জাহাঙ্গীর' নামক একটি নাটক মঞ্চস্থ হয়। এই নাটকে তিনি অভিনয় করেন। এছাড়া এই থিয়েটারে শ্রী (১৯২৯),  রাঙাপাখি (১৯৩০) দেশের ডাক (১৯৩০), অভিজাত (১৯৩১), কালীর সমুদ্রমন্থন (১৯৩১), বামনবাতার (১৯৩৩) এবং শিবা শক্তি (১৯৩৫)-এ অভিনয় করেন।

এর মাঝে তিনি   ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি অভিনয় করেন নির্বাক চলচ্চিত্র 'ইন্দ্রসভা'-তে।

গ্রামোফোন কোম্পানি তাঁর গাওয়া প্রথম একটি রেকর্ড প্রকাশ করে। এই রেকর্ডের দুটি গান ছিল- 'কালা তোর তারে কদমতোলায় চেয়ে থাকি' এবং 'বাঁধো না তোরিখানি আমারই নদীকুলে'। রেকর্ড নম্বর ছিল পি-৪৭২১ ।

১৯২৮ খ্রিষ্টব্দের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত হয়েছিল এইচএমভি থেকে ২টি নজরুল সঙ্গীত। গান দুটির প্রশিক্ষক ছিলেন   কাজী নজরুল ইসলাম। গান দুটি ছিল-

তিনি হিন্দি, উর্দু, বাংলাতে বূগান গেয়েছেন। সেসময় ছায়াছবির গানেও সুনাম কুড়িয়েছিলেন। তাঁর রেকর্ডের সংখ্যা আনুমানিক পাঁচশত। এছাড়া তিনি মিনার্ভা থিয়েটারের অভিনেত্রী হিসেবে সুনাম অর্জন করেছিলেন।

১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিলিট উপাধি পান।
১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। আঙ্গুরবালার রেকর্ডে গাওয়া নজরুল-সঙ্গীতের তালিকা


সূত্র: