গিয়াসউদ্দিন তুঘলক
১৩২০-১৩২৫ খ্রিষ্টাব্দ
ভারতবর্ষের দিল্লীকেন্দ্রিক রাজত্বের তুঘলক বংশের শাসনের প্রতিষ্ঠাতা।

গিয়াসউদ্দিন তুঘলক এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পিতা ছিলেন একজন তুর্কি দাস। ভারতে আসার পর তিনি পাঞ্জাবের জাঠ নারীকে বিবাহ করেন। গিয়াসউদ্দিনে ভাই-বোন সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না।

যৌবনের শুরুতে তিনি দিল্লীর সম্রাট আলাউদ্দিনের সৈন্যবাহিনীতে সামান্য সৈনিক যোগদান করেন। নিজ যোগ্যতার গুণে সেনাবাহিনীতে বিশেষ স্থান অধিকার করে নেন। ১৩০৫ খ্রিষ্টাব্দে নিজ যোগ্যতায় তিনি পাঞ্জাবের শাসনকর্তা পদ লাভ করেন। এই সময় মোগলদের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য তাঁকে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়। কথিত আছে তিনি প্রায় ঊনত্রিশ বার মোগল আক্রমণ সফলভাবে প্রতিহত করেন। এই কারণে তাঁকে 'মালিক গাজী' নামে অভিহিত করা হতো।

সম্রাট আলাউদ্দিনের রাজত্বের শেষভাগে তিনি দিল্লীর দরবারে অন্যতম আমির ছিলেন। আলাউদ্দিন মালিক কাফুর প্ররোচনায়, তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র খিজির খাঁর পরিবর্তে, তাঁর নাবালক পুত্র সাহাবউদ্দিন ওমরকে সিংহাসনের উত্তরাধিকার করেন। আলাউদ্দিনের মৃত্যুর পর ১৩১৬ খ্রিষ্টাব্দে ওমর দিল্লীর সিংহাসনে বসেন। ওমর তাঁর অধীনস্ত কর্মচারী খসরুর পরামর্শে শাসনকার্য পরিচালনা করতে থাকেন। পরে খসরুর ষড়যন্ত্রে ওমর নিহত হন এবং খসরু দিল্লীর সিংহাসন অধিকার করেন। ক্ষমতা দখলের কিছুদিনের মধ্যেই খসরু অত্যাচারী শাসকে পরিণত হন। এই কারণে দিল্লীর আমিররা খসরুকে শাস্তি দেওয়ার জন্য পাঞ্জাবের শাসনকর্তা গিয়াসউদ্দিনকে আহ্বান করেন। গিয়াসউদ্দিন  দিল্লী আক্রমণ করলে খসরু সাথে তাঁর যুদ্ধ হয় এবং এই যুদ্ধ খসরু নিহত হন। এই সময় সম্রাট আলাউদ্দিনের কোনো বংশধর না থাকায়, দিল্লীর আমিররা গিয়াসউদ্দিন তুঘলককে দিল্লীর সম্রাট হিসেবে ঘোষণা দেন। এই সূত্রে ১৩২০ খ্রিষ্টাব্দে গিয়াসউদ্দিন তুঘলক রাজত্ব শুরু করেন এবং তুঘলক বংশের শাসন শুরু। সিংহাসন লাভের পর তিনি রাজ্যের আইন শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন এবং বহু জনহিতকর কাজ করেন। তিনি কৃষকদের নানাভাবে সহায়তা করেন।  তিনি গোঁড়া সুন্নি মুসলমান হিসেবে মদ্য পান ও মদ উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছিলেন।  রাজ্যের সড়াক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করেন এবং বিভিন্ন স্থানে দুর্গ স্থাপন করেন। তাঁর সময়ে ডাকবিভাগের উন্নয়ন হয়। রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তা চৌকি বসিয়ে লুণ্ঠনকারীদের দমন করেন।

সে সময়ে দাক্ষিণাত্যের বরঙ্গল রাজ্যের রাজা প্রতাপরুদ্র স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ১৩২১ খ্রিষ্টাব্দে গিয়াসউদ্দিন তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র জুনা খাঁকে প্রতাপরুদ্রকে দমন করার জন্য প্রেরণ করেন। প্রতাপরুদ্র কয়েক মাস অবরুদ্ধ থাকার পর সন্ধির প্রস্তাব পাঠান। জুনা খাঁ এই প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে আক্রমণের উদ্যোগ নেন। কিন্তু এই সময় গিয়াসউদ্দিনের মিথ্যা মৃত্যু সংবাদ প্রচারিত হলে, জুনা খাঁ দিল্লীতে ফিরে আসেন। ১৩২৩ খ্রিষ্টাব্দে জুনা খাঁ পুনরায় প্রতাপরুদ্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালান এবং বরঙ্গল অধিকার করেন। এর মধ্য দিয়ে বরঙ্গল রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটে।

১৩২২ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার সুলতান ফিরোজ শাহের মৃত্যু হয়। এরপর তাঁর পুত্রদের মধ্যে গিয়াসউদ্দিন, সাহাবউদ্দিন এবং নাসিরউদ্দিন দ্বন্দ্ব জড়েয়ে পড়েন। এঁদের ভিতরে গিয়াসউদ্দিন ১৩২২ খ্রিষ্টাব্দে সাহাবুদ্দিনকে পরাজিত করে গৌড় দখল করেন। এই অবস্থায় সাহাবউদ্দিন দিল্লির সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন। এই সূত্রে গিয়াসউদ্দিন তুঘলক বঙ্গদেশে আসেন এবং গৌড়ের সুলতান গিয়াসউদ্দিনকে পরাজিত করে, নাসিরউদ্দীনের কাছে শাসনভার অর্পণ করে দিল্লির পথে রওনা দেন। এর ফলে বঙ্গদেশে দিল্লির অধিকার পুন প্রতিষ্ঠিত হয়। দিল্লি ফেরার পথে তিনি ত্রিহূত আক্রমণ করেন। ত্রিহূত-রাজ পরাজিত হয়ে দিল্লির অধীনতা স্বীকার করে নেন।
শুরুর দিকে বাহাদুর শাহ লক্ষ্মণাবতী ও সোনারগাঁও দখল করে নেয়।

১৩২৪ খ্রিষ্টাব্দে  গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের রাজ্য মোঙ্গলদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। গিয়াসউদ্দিন এই আক্রমণ সাফল্যের সাথে প্রতিহত করেন।

১৩২৫ খ্রিষ্টাব্দে গিয়াসউদ্দিন বঙ্গদেশ থেকে দিল্লীর পথে রওনা দেন।
গিয়াসউদ্দিনের জ্যেষ্ঠপুত্র জুনা খাঁ পিতার অভ্যর্থনার জন্য দিল্লীর ছয় মাইল পূর্বে আফগানপুরে একটি শিবির স্থাপন করেন। গিয়াসউদ্দিন এই শিবিরে প্রবেশ করার কিছুক্ষণ পরে, শিবিরটি গিয়াসউদ্দিনের উপর ভেঙে পড়ে। এই দুর্ঘটনায় গিয়াসউদ্দিনের মৃত্যু ঘটে।

গিয়াসউদ্দিনের মৃত্যুর পর তাঁর জ্যৈষ্ঠপুত্র জুনা খাঁ 'মুহম্মদ বিন তুঘলক' উপাধি গ্রহণ করে দিল্লীর সিংহাসনে বসেন।

সূত্র :
ভারতের ইতিহাস । অতুলচন্দ্র রায়, প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়।