মেনাখেম বেগিন
১৯১৩–১৯৯২
Menachem Begin
আধুনিক
ইসরায়েলর ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী এবং বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
তিনি
ইসরায়েলর ষষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৭৭
খ্রিষ্টাব্দে দেশটির রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন (বিপ্লব বা 'মেহাপাচ') আনেন।
১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বেলারুশ-এ জন্ম গ্রহণ
করেন। তিনি যৌবনে জেভ জাবোটিনস্কি-র 'রিভিশনিস্ট জায়নবাদ' আদর্শে অনুপ্রাণিত হন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠন কেবল আলোচনার মাধ্যমে সম্ভব নয়, বরং সশস্ত্র সংগ্রামের প্রয়োজন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁর পরিবারের অনেক সদস্য নাৎসিদের হাতে নিহত হন, যা তাঁর আদর্শকে আরও দৃঢ় করে।
ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে তিনি আন্ডারগ্রাউন্ড সামরিক সংগঠন 'ইর্গুন'-এর নেতা ছিলেন। ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের বিরুদ্ধে তিনি কঠোর অবস্থান নেন। তাঁর নেতৃত্বে ১৯৪৬ সালে জেরুজালেমের কিং ডেভিড হোটেল বোমা বিস্ফোরণ ঘটেছিল, যা তৎকালীন ব্রিটিশ প্রশাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল।
হামলায় ৯১ জন নিহত হয়েছিল (ব্রিটিশ, আরব ও ইহুদি)।
এই সময় ব্রিটিশরা তাঁকে "এক নম্বর জঙ্গি" হিসেবে ঘোষণা করেছিল।
ইর্গুন বাহিনী ইউরোপ থেকে 'অল্টালেনা' নামক একটি জাহাজে করে প্রচুর পরিমাণে অস্ত্র (প্রায় ৫,০০০ রাইফেল, ২৫০টি স্টেন গান এবং লাখ লাখ রাউন্ড গুলি) এবং প্রায় ৯০০ জন স্বেচ্ছাসেবী যোদ্ধা নিয়ে আসছিল। জাহাজটি যখন ইসরায়েলের উপকূলে পৌঁছায়, তখন সরকার ও ইর্গুন নেতার মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়।
মূল বিবাদ ছিল- ইর্গুন নেতা মেনাখেম বেগিন চেয়েছিলেন এই অস্ত্রের একটি বড় অংশ (২০%) ইর্গুন ইউনিটের জন্য রাখতে, যারা জেরুজালেম যুদ্ধে
ব্যবহার করব। ইসরায়েল প্রধানমন্ত্রী বেন-গুরিয়ন এটি মেনে নিতে অস্বীকার করেন। তার যুক্তি ছিল, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে কোনো দলের নিজস্ব অস্ত্রাগার থাকতে পারে না। তিনি একে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত এবং "বিদ্রোহের চেষ্টা" হিসেবে দেখেন।
২২ জুন, অল্টালেনা' জাহাজটি যখন তেল আবিব উপকূলে ভেড়ার চেষ্টা করে, তখন বেন-গুরিয়ন আইডিএফ-কে জাহাজটি লক্ষ্য করে কামান দাগানোর নির্দেশ দেন।
কামানের গোলায় জাহাজটিতে আগুন ধরে যায়।
জাহাজে থাকা ইর্গুন সদস্যরা প্রাণ বাঁচাতে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
এই ঘটনায় ১৬ জন ইর্গুন সদস্য এবং ৩ জন আইডিএফ সেনা নিহত হন। জাহাজটি যখন জ্বলছিল, ইর্গুন নেতা মেনাখেম বেগিন তার অনুসারীদের পাল্টা গুলি চালাতে নিষেধ করেন। তিনি রেডিওতে ঘোষণা দেন, "ইহুদিদের মধ্যে কোনো গৃহযুদ্ধ হবে না।" তার এই সিদ্ধান্তের কারণেই ইসরায়েল এক ভয়াবহ অভ্যন্তরীণ রক্তপাত থেকে রক্ষা পায়।
এই ঘটনার পর ইর্গুন পুরোপুরি ভেঙে যায় এবং সবাই আইডিএফ-এ যোগ দেয়। বেন-গুরিয়নের "এক রাষ্ট্র, এক সেনাবাহিনী" নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই ঘটনাটি ইসরায়েলি রাজনীতিতে কয়েক দশক ধরে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে রেখেছিল। বেন-গুরিয়ন এবং মেনাখেম বেগিন-এর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতা তৈরি হয়। ১৯৭৭
খ্রিষ্টাব্দে মেনাখেম বেগিন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন।
দীর্ঘ ২৯ বছর বিরোধী দলে থাকার পর ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর দল 'লিকুদ' ক্ষমতায় আসে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো মিশরের সাথে শান্তি চুক্তি (Camp David Accords, ১৯৭৮)।
তিনি এবং মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন।
এই চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েল প্রথম কোনো আরব রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পায় এবং সিনাই উপদ্বীপ মিশরকে ফেরত দেয়।
তাঁর শাসনকালেই ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দে লেবানন যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধ এবং পরবর্তীতে সাবরা ও শাতিলা হত্যাকাণ্ডের কারণে তাঁর জনপ্রিয়তা হ্রাস পায়। ব্যক্তিগত শোক (স্ত্রী আলিজার মৃত্যু) এবং যুদ্ধের চাপ সহ্য করতে না পেরে ১৯৮৩
খ্রিষ্টাব্দে তিনি পদত্যাগ করেন এবং জনসম্মুখ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন।