ন
ুরুল হক নুর
জন্ম ১৯৯১
খ্রিষ্টাব্দ
একজন বাংলাদেশী রাজনীতিবিদ। ভিপি নুর নামে পরিচিত। গণঅধিকার পরিষদ
(জিওপি) এর সভাপতি] এবং ছাত্র, যুব ও প্রবাসী অধিকার পরিষদের সমন্বয়ক,
সংসদ সদস্য।
১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে বরিশাল বিভাগের পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা উপজেলার বৃহত্তর চর কাজল ইউনিয়ন বর্তমান চর বিশ্বাস ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ইদ্রিস হাওলাদার একজন ব্যবসায়ী এবং সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য ও মায়ের নাম নিলুফা বেগম।
তিন ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে নুর দ্বিতীয়। তিনি পটুয়াখালীর চর বিশ্বাস জনতা
মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। এরপরে ২০১০
খ্রিষ্টাব্দে তিনি গাজীপুরের
কালিয়াকৈর গোলাম নবী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে মাধ্যমিক
এবং ২০১২ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকার উত্তরা হাই স্কুল এন্ড কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৩–১৪ শিক্ষাবর্ষে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন।
২০১৬ খ্রিষ্টাব্দে চরবিশ্বাস জনতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের
শিক্ষক হাতেম আলী মাস্টারের মেয়ে মারিয়া আক্তার লুনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ
হন। লুনা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। বর্তমানে এই দম্পতির দুই কন্যা ও এক
পুত্র সন্তান আছে।
২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে সাধারণ শিক্ষার্থীরা একটি বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে।
এই সময় শিক্ষার্থী হাসান আল মামুন এবং নুরুল হক নুর-সহ
আরও কয়েকজনকে নিয়ে ' বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার
সংরক্ষণ পরিষদ ' একটি সংগঠন গঠন করে।
এই আন্দোলনের প্রধান নেতৃত্ব দানকারী
নুরুল হক নুর ব্যাপক আলোচনায় আসেন।
২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ই এপ্রিল
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে ঘোষণা দেন যে, সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করা হবে
বলে ঘোষণা দেন।
২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের ১১ই মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নির্বাচন
হয়। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলে। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর ওই রাতেই অর্থাৎ ১১ মার্চ দিবাগত রাত ৩টার পর (যা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১২ মার্চ ভোররাত হয়ে যায়) তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান সিনেট ভবনে আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল ঘোষণা করেন।
নির্বাচন চলাকালে রোকেয়া হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক জিনাত হুদাকে লাঞ্ছিত ও ভাঙচুরের অভিযোগে নুরুল হক নুরসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে
মামলা হয়। মামলাটি হয়েছিল ২০১৯
খ্রিষ্টাব্দের ১১ মার্চ রাতে। এই মামলা করেছিলেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন শিক্ষার্থী মারজুকা রায়না।
অভিযোগে বলা হয়েছিল - তিনি নির্বাচনে ভোটগ্রহণ চলাকালীন রোকেয়া হলে গিয়ে প্রভোস্টকে লাঞ্ছিত করা
হয়, শিক্ষকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং হলের সম্পদ ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি
করা হয়।
২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নির্বাচনে
তিনি সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে অংশ নেন। এই নির্বাচনে নুরুল হক নুর পান ১১,০৬২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন, যিনি পেয়েছিলেন ৯,০১২ ভোট।
তিনি কোনো রাজুনৈতিক দলের পক্ষে না দঁড়িয়ে 'সাধারণ ছাত্র
অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ (কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম) থেকে দাঁড়িয়ে জয়ী
হয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন। ভিপি পদে নুর জয়ী হলেও, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে গোলাম রাব্বানীসহ বাকি ২৫টি পদের মধ্যে ২৩টিতেই জয়লাভ করেছিল ছাত্রলীগ।
এই নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষিত হয়েছিল ১৯ মার্চে। নির্বাচনের পর পুনর্নির্বাচনের দাবিতে শিক্ষার্থীদের
একাংশ আন্দোলন করেছিল। অবশেষে ২০১৯ সালের ২৩ মার্চ নবনির্বাচিত কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল।
এরপর থেকে তিনি ভিপি নুর নামে পরিচিত লাভ করেন।
২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে তরুণদের নিয়ে একটা নতুন রাজনৈতিক দল তৈরি করার ব্যাপারে প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন।
এরপর অর্থনীতিবিদ ড. রেজা কিবরিয়া ও নুরুল হক নুরের নেতৃত্বে ‘বাংলাদেশ গণ অধিকার পরিষদ’ নামে নতুন একটি রাজনৈতিক দলের ঘোষণা দেওয়া হয়।
২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের ২২ ডিসেম্বর ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ও জাতীয় নাগরিক নিবন্ধনের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে সমাবেশের কর্মসূচি দেয় নুরুল হক নূর। ওই সমাবেশে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের নেতা-কর্মীরা বাধা দিতে গেলে সংঘর্ষ বাঁধে৷ সংঘর্ষে দু’পক্ষের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়। একপর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ভবনে নুর ও তার সংগঠন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ সদস্যদের ওপর মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের কর্মীরা হামলা করে। এতে নুরসহ তার সংগঠনের একাধিক ছাত্র আহত হয়।
২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ ডিসেম্বর পুলিশ বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় মামলা দায়ের করে এবং হামলার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আল মামুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক ইয়াসিন আরাফাত তূর্য এবং দপ্তর সম্পাদক মেহেদী হাসান শান্তকে গ্রেফতার করা হয়৷উল্লেখ্য,
২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন আন্দোলেন ৭ বার
দৈহিকভাবে আক্রান্ত হন।
নুরের বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা
২০২০ খ্রিষ্টাব্দের ২০ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
ফাতেমা আক্তার (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ইসলামিক স্টাডিজ
বিভাগের শিক্ষার্থী)
নূরসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে লালবাগ থানায় ধর্ষণের মামলা করেছিলে। এই প্রেক্ষিতে
২০২০ খ্রিষ্টাব্দের ২১ সেপ্টেম্বর নূরসহ সাত জনকে আটক করে। সেই মামলার বিরুদ্ধে শাহবাগে বিক্ষোভ করছিলেন নুরুল হক নুর ও সাধারণ ছাত্র পরিষদ নামে তার সংগঠনের সদস্যরা। সেই বিক্ষোভ চলাকালীন তাদের আটক করা হয় এবং কিছুক্ষণ পর মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এরপর ২২ সেপ্টেম্বর রাজধানীর কোতোয়ালি থানায় ওই ছাত্রী ধর্ষণ, অপহরণ ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলাটি করেছিলেন।
তাঁর অভিযোগ ছিল-
- ধর্ষণের অভিযোগ: মামলার প্রধান আসামি হাসান আল মামুনের বিরুদ্ধে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়।
এবং ভিপি নূর ও অন্য চার আসামির বিরুদ্ধে ধর্ষণে সহযোগিতা করা এবং ওই ছাত্রীকে অপহরণ করে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ আনা হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওই ছাত্রীকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা, তাঁর চরিত্র হনন করা এবং মানহানিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলাটি করা হয়েছিল।
এই মামলার মোট আসামি ছিলেন ৬ জন। এরা হলেন- ১. হাসান আল মামুন (প্রধান আসামি) ২. নুরুল হক নূর ৩. নাজমুল হাসান সোহাগ ৪. মো. সাইফুল ইসলাম ৫. নাজমুল হুদা ৬. মো. আবদুল্লাহ হিল বাকি।
মামলার ফলাফল
দীর্ঘ তদন্ত শেষে পুলিশ এই মামলার সত্যতা পায়নি। ২০২১ সালের জুন মাসে ডিবি (ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ) পুলিশ আদালতকে জানায় যে, নুরুল হক নূরসহ অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তদন্তকারী কর্মকর্তারা আদালতে 'তথ্যগত ভুল' (Mistake of fact) উল্লেখ করে আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেন।
২০২১ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৯ এবং সংশ্লিষ্ট আদালত পুলিশের দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করেন। এর ফলে ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নূরসহ ৬ জন আসামিই এই মামলা থেকে অব্যাহতি পান। আদালত জানিয়ে দেন যে, আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।
মামলার বাদী ফাতেমা আক্তার পুলিশের এই চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ওপর 'নারাজি' আবেদন করেছিলেন। তবে আদালত সেই আবেদন নামঞ্জুর করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করেন এবং মামলাটির আইনি পরিসমাপ্তি ঘটে।
এই জোড়া মামলার প্রতিবাদে তৎকালীন ছাত্র অধিকার পরিষদ সারা দেশে বিক্ষোভ করেছিল এবং পরবর্তীতে নূরসহ আসামিরা আদালত থেকে জামিন পেয়েছিলেন।
২০২১ খ্রিষ্টাব্দের ৮ জানুয়ারি যুব অধিকার পরিষদের টাঙ্গাইল জেলা শাখা এক প্রতিনিধি সভায় নুরকে "গণবন্ধু" উপাধিতে ভূষিত করে একটি ক্রেস্ট প্রদান করে।
২০২১ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ অক্টোবর ঢাকায় পল্টনের প্রিতম জামান টাওয়ারে অবস্থিত দলটির কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দলের নাম
'
গণঅধিকার পরিষদ ' ঘোষণা করেন নুরুল হক নুর।
২০২৩ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে গণঅধিকার পরিষদের রেষারেষি জেরে দলের সদস্য সচিব নুরুল হক নুর ও রাশেদ খাঁনকে অব্যাহতির ঘোষণা আসে আহবায়ক ড. রেজা কিবরিয়ার পক্ষ থেকে।
২০২৩ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই জুলাই গণ অধিকার পরিষদের একাংশের কাউন্সিলে সভাপতি নির্বাচিত হন নুরুল হক নুর।
২০২৩ খ্রিষ্টাব্দের ২ আগষ্ট ছাত্র অধিকার পরিষদের ডাকা সমাবেশে যোগ দিতে শাহবাগ মোড় থেকে টিএসসির দিকে মিছিল নিয়ে গেলে হামলার স্বীকার হন নুর। নুরকে গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। নুরের দাবি অনুযায়ী তাদের উপর হামলা করেছিল ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা,
অবশ্য ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে তাদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন।
২০২৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ আগষ্ট জাতীয় পার্টির কার্যালয়ের সামনে তাঁর উপর আক্রমণ করা
হয়। এই সময় তিনি এবং গণ পরিষদের সদস্যরা মারত্মকভাবে আহত হন।
ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের তাঁর যোগাযোগের অভিযোগ
নুরুল হক নুরের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের
কথিত এজেন্ট মেন্দি এন সাফাদির
সাথে বৈঠকের অভিযোগটি মূলত ২০২২ খ্রিষ্টাব্দের শেষভাগ এবং ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দের শুরুতে ব্যাপকভাবে
আলোচনায় আসে। ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারির শুরুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি ভাইরাল হয়, যেখানে নুরুল হক নুর এবং মেন্দি এন সাফাদিকে একসাথে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। দাবি করা হয়, নুর কাতার ও দুবাই সফরে থাকাকালীন এই বৈঠকটি হয়েছে। অভিযোগ ওঠে যে, ২০২২
খ্রিষ্টাব্দের ২৭ ডিসেম্বর দুবাইয়ের কোনো একটি স্থানে এই বৈঠকটি হয়েছিল। এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে রাজধানীর শাহবাগ থানায় নুরুল হক নুরের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে একটি মামলা দায়ের করেন মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন। ২০২৩
খ্রিষ্টাব্দের ২১ জুলাই রাজধানীর উত্তরার একটি বাসা থেকে নুরকে ডিবি পুলিশ গ্রেফতার করে।
ভিন্নতর একটি মামলায় তাঁক গ্রেফতারের সময় মোসাদ ইস্যুটি পুলিশের পক্ষ থেকে গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়েছিল।
২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা মিরপুর ও বনানী এলাকায় সেতু ভবনে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা
হটে। এই ঘটনার কারণে বনানী থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। পুলিশ দাবি করে যে, নূর এবং তাঁর দলের নেতা-কর্মীরা এই নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে উসকানি দিয়েছেন এবং সরাসরি জড়িত ছিলেন।
২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের ২১ জুলাই গভীর রাতে (অর্থাৎ ২০ জুলাই দিবাগত রাত) ঢাকার বনানীর একটি বাসা থেকে নুরুল হক নূরকে ডিবি (গোয়েন্দা পুলিশ) পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয়া
পরে তাঁকে গ্রেফতার দেখানো হয়। গ্রেপ্তারের পর নূরকে আদালতে হাজির করা হলে নুরুল হক নুরকে ৫ দিনের রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়। মামলার এজাহারে তিনি ৩০০ কোটি টাকা ক্ষতি করেছেন অভিযোগ করা হয়।
রিমান্ড চলাকালীন নূর এবং তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল যে, ডিবি কার্যালয়ে তাঁর ওপর তীব্র শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছে।
আদালতে হাজির করার সময় নূরের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক ছিল। তিনি ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছিলেন না এবং তাঁকে দুইজনের কাঁধে ভর দিয়ে হাঁটতে দেখা গিয়েছিল। নূরের স্ত্রী এবং আইনজীবীরা দাবি করেন যে, তাঁকে হাত-পা বেঁধে উল্টো করে ঝুলিয়ে পেটানো হয়েছে। তবে তৎকালীন পুলিশ প্রশাসন এই নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছিল।
নূরের এই গ্রেপ্তারকে সেই সময় বিরোধী দলগুলো এবং মানবাধিকার কর্মীরা রাজনৈতিক হয়রানি হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তাদের মতে, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে দমানোর জন্য এবং আন্দোলনকারীদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্য নূরের মতো পরিচিত মুখদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে
দলটির বিভক্ত দুইপক্ষ একত্র হওয়ার প্রচেষ্টা নেয়।
কোটা সংস্কার আন্দোলন (জুলাই-আগস্ট) বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গণঅধিকার পরিষদের অঙ্গসংগঠন 'ছাত্র অধিকার পরিষদ' অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। এ সময় নূরসহ অনেক নেতা গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হন।
৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নূর কারাগার থেকে মুক্তি পান।
১৪ আগস্ট দলটি আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করার দাবি জানায়। ৩১ আগস্ট দলটির বিভক্ত দুই পক্ষের তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীরা বিভক্ত দুই
পক্ষকে একত্র হওয়ার আল্টিমেটাম দেয়। ২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন দলটিকে
ট্রাক প্রতীক বরাদ্দ সহ নিবন্ধন প্রদান করে।
২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই-আগষ্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের
তিনি
গণঅধিকার পরিষদ-এর একাংশের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন
করছেন। উল্লেখ্য গণঅধিকার পরিষদ-এর অপর অংশের নেতৃত্বে রয়েছেন ড. রেজা কিবরিয়া ও ফারুক হাসান।
২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের ২ সেপ্টেম্বর দলটি নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন লাভ করে। দলটির নির্বাচনী প্রতীক হলো ট্রাক। ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দের
২ ফেব্রুয়ারি উচ্চতর পরিষদের সবার সিদ্ধান্তে আনুষ্ঠানিকভাবে ৩০০ আসনে
প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দেয়।
১২ মে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিসহ ১৪ দলীয় জোটভুক্ত দলগুলোর নিবন্ধন বাতিলের দাবিতে নির্বাচন কমিশনে লিখিত আবেদন জমা দেয়।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর, সেপ্টেম্বর মাসে ভিপি নূরের ওপর হামলার ঘটনা তদন্তে সরকার একটি বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন করে। তাঁর বিরুদ্ধে আগের সরকারের আমলে করা অধিকাংশ মামলা (বিশেষ করে ২০২৪
খ্রিষ্টাব্দের কোটা আন্দোলনের সময় সেতু ভবনে হামলার মামলাৱ থেকে তিনি মুক্তি পেয়েছেন।
এই কমিশন তাদের প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ শেষ করেছে এবং হামলার সাথে জড়িত অনেক সাবেক ছাত্রনেতা ও পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। নুরুল হক নুর নিজে এই কমিশনকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন এবং তাঁর ওপর হওয়া হামলার সে সময়কার মেডিকেল রিপোর্টগুলো জমা দিয়েছেন।
নূর আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। তিনি নিজেকে তরুণ প্রজন্মের একজন প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন এবং 'তৃতীয় শক্তি' হিসেবে একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
রাজনৈতিক লক্ষ্য ও আদর্শ গণঅধিকার পরিষদের মূল স্লোগান হলো ‘জনতার অধিকার, আমাদের অঙ্গীকার’। তাদের রাজনীতির তিনটি প্রধান স্তম্ভ রয়েছে:
- গণতন্ত্র: ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও ভোটাধিকার নিশ্চিত করা।
- সামাজিক ন্যায়বিচার: সব নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ ও বিচার নিশ্চিত করা।
- মানবিক মর্যাদা: মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা।
২০২৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি নিয়মিতভাবে টকশো, সংবাদ সম্মেলন এবং রাজপথের কর্মসূচিতে সরব আছেন। বিশেষ করে ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও সাক্ষাৎকার দিয়েছেন এবং দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন।
তারপরেই ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিচারতে তিনি এবং তাঁর দলের কার্যক্রম আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে
ছিল না।
২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে
বিজয়ী হয়েছেন। তিনি তার জন্মস্থান পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা ও দশমিনা) আসন থেকে
প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি এই আসনে মোট ৭৩,৯৩৪ ভোট পেয়ে
বেসরকারিভাবে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপি নেতা হাসান মামুন
(স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঘোড়া প্রতীকে লড়েছেন), যিনি পেয়েছিলেন ৪৭,৯৫০ ভোট।
সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পর, ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তিনি অন্তর্বর্তীকালীন/নির্বাচিত সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান পান। তাকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
পদ দুটি হলো-
- শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় (প্রতিমন্ত্রী হিসেবে)।
- প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় (প্রতিমন্ত্রী হিসেবে)।