গণঅধিকার পরিষদের পতাকা

গণঅধিকার পরিষদের প্রতীক

গণঅধিকার পরিষদ ((জিওপি)  
জন্ম ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দ
বাংলাদেশের নিবন্ধিত একটি রাজনৈতিক দল।

২০২১ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ অক্টোবর বেলা ১২টার দিকে রাজধানীর পুরানা পল্টনে অবস্থিত দলটির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই নতুন রাজনৈতিক দলটি আত্মপ্রকাশ করে।
 দলটির প্রধান কার্যালয় ঢাকার পুরানা পল্টনের বিজয়নগরের আল-রাজী কমপ্লেক্সে অবস্থিত।

২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ ফেব্রুয়ারি  গঠিত 'বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ'-এর সূত্রে এই দলের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল।

২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ ফেব্রুয়ারি ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতারা তাদের অবস্থান এবং গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনা করে প্যানেল করে নির্বাচনে অংশ নেয়। এ নির্বাচন নিয়ে নানান মতবাদ ও কারচুপির অভিযোগ থাকলেও ভিপি এবং সমাজসেবা পদে জয়লাভ করেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের দুই নেতা। ধীরে ধীরে আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সারাদেশে সু-সংগঠিত হতে থাকে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ। যার ফলশ্রুতিতে একটি নব্য রাজনৈতিক ধারার দ্বার উন্মোচনের সম্ভাবনা তৈরি হয়।

২০২০ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ ফেব্রুয়ারি এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ।

২০২১ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ অক্টোবর মঙ্গলবার রাজনৈতিক দল হিসেবে গণঅধিকার পরিষদ আত্নপ্রকাশ করে।
  প্রতিষ্ঠাকালে দলটির একটি ১০১ সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। আহ্বায়ক ছিলেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাবেক কর্মকর্তা ড. রেজা কিবরিয়া। সদস্য সচিব ছিলেন  নুরুল হক নুর। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন রাশেদ খান, ফারুক হাসান, আবু হানিফ এবং ছাত্র ও যুব অধিকার পরিষদের তৎকালীন নেতৃবৃন্দ।

দলটি প্রতিষ্ঠার সময় চারটি মূল স্তম্ভ বা নীতি ঘোষণা করা হয়েছিল। নীতগুলো ছিল-  গণতন্ত্র, ন্যায় বিচার, অধিকার এবং জাতীয় স্বার্থ। প্রতিষ্ঠার দিন ২১ দফার প্রস্তাব রাখা হয়েছিল। এগুলো হলো-

১. সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা: দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান।
২. শাসনব্যবস্থা ও গণতন্ত্র: ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং একটি জবাবদিহিতামূলক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন।
৩. সংবিধান সংস্কার: সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা।
৪. নির্বাচনী ব্যবস্থা: অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষে শক্তিশালী ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন এবং নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা।
৫. বিচার বিভাগ ও আইন: বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং ব্রিটিশ আমলের কালাকানুন বাতিল করা।
৬. বাকস্বাধীনতা ও মানবাধিকার: সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং নাগরিকদের বাকস্বাধীনতা ও মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা।
৭. সুশাসন ও দুর্নীতি দমন: দুর্নীতি দমন কমিশনকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করা এবং রাষ্ট্রীয় সর্বস্তরে দুর্নীতি বন্ধ করা।
৮. অর্থনীতি ও শিল্প: টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রসার এবং দেশীয় পণ্যের বাজার নিশ্চিত করা।
৯. কৃষি ও কৃষক: কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং কৃষকদের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ও ভর্তুকির ব্যবস্থা করা।
১০. শিক্ষা ব্যবস্থা: আধুনিক ও কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন এবং জিডিপি-র উল্লেখযোগ্য অংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা।
১১. স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা: প্রতিটি নাগরিকের জন্য মানসম্মত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্য বিমা চালু করা।
১২. কর্মসংস্থান: বেকারত্ব দূরীকরণ এবং শিক্ষিত তরুণদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।
১৩. প্রবাসী কল্যাণ: প্রবাসীদের অধিকার রক্ষা এবং দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ ও হয়রানি মুক্ত সেবা নিশ্চিত করা।
১৪. ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু: ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং নাগরিক মর্যাদা সুসংহত করা।
১৫. পররাষ্ট্রনীতি: 'সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’—এই নীতির ভিত্তিতে সমমর্যাদার পররাষ্ট্রনীতি।
১৬. নারী ও শিশু: নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা এবং শিশু ও কিশোরদের সুরক্ষায় কঠোর আইন প্রয়োগ।
১৭. সড়ক ও যোগাযোগ: নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
১৮. জ্বালানি ও বিদ্যুৎ: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা অর্জন এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি।
১৯. পরিবেশ ও জলবায়ু: পরিবেশ রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
২০. প্রযুক্তি ও ডিজিটাল নিরাপত্তা: তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো নিবর্তনমূলক আইনের সংস্কার।
২১. খেলাধুলা ও সংস্কৃতি: সুস্থ ও সৃজনশীল সাংস্কৃতিক চর্চা এবং ক্রীড়া জগতের উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান।

২০২২ খ্রিষ্টাব্দে সাংগঠনিক বিস্তার ও আন্দোলন সারা দেশে সফর: এই বছর দলটি দেশের বিভিন্ন জেলায় সাংগঠনিক সফর এবং কর্মীসভা পরিচালনা করে। নির্দলীয় সরকারের দাবি: বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে রাজপথে সরব হয়।

২০২৩ খ্রিষ্টাব্দের জুন-জুলাই মাসে দলের শীর্ষ দুই নেতা ড. রেজা কিবরিয়া ও নুরুল হক নূরের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। একে অপরকে বহিষ্কারের পাল্টা ঘোষণা দেন। নুরুল হক নূরের সমর্থকরা একটি জাতীয় কাউন্সিল আয়োজন করে। সেখানে নুরুল হক নূর সভাপতি এবং মুহাম্মদ রাশেদ খান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। অন্য একটি অংশ রেজা কিবরিয়ার নেতৃত্বে আলাদা কার্যক্রম চালায়। পরে নুরুল হকের সমর্থকেরা ১০ জুলাই দলের জাতীয় কাউন্সিল করেন। তাতে নুরুল হক সভাপতি ও মুহাম্মদ রাশেদ খান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তবে আরেক পক্ষ রেজা কিবরিয়াকে আহ্বায়ক ও ফারুক হাসানকে ভারপ্রাপ্ত সদস্যসচিব করে আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে কার্যক্রম চালায়। সেপ্টেম্বর মাসে রেজা কিবরিয়া তার নেতৃত্বাধীন গণঅধিকার পরিষদকে বর্তমান (আমজনতার দল) রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন দিতে নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেন, তবে নির্বাচন কমিশন তা নামঞ্জুর করে। বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর সাথে যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেয়।

২০২৩ খ্রিষ্টাব্দে ৩১ ডিসেম্বর রেজা কিবরিয়া গণঅধিকার পরিষদ ছেড়ে যান। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে দলটি নিবন্ধনের আবেদন করলেও নিবন্ধন পেতে ব্যর্থ হয়।
২০২৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ ডিসেম্বর নির্বাচনী তফসিল বাতিল, সরকারের পদত্যাগ ও নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে কারচুপিবিহীন নির্বাচনের দাবিতে দলটি বিক্ষোভ মিছিল ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করে। ১৯ ডিসেম্বর পুলিশ দলটির কর্মসূচিতে বাধা দেয়

২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে দলটির বিভক্ত দুইপক্ষ একত্র হওয়ার প্রচেষ্টা নেয়কোটা সংস্কার আন্দোলন (জুলাই-আগস্ট) বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গণঅধিকার পরিষদের অঙ্গসংগঠন 'ছাত্র অধিকার পরিষদ' অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। এ সময় নূরসহ অনেক নেতা গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হন।

৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নূর কারাগার থেকে মুক্তি পান।
১৪ আগস্ট দলটি আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করার দাবি জানায়। ৩১ আগস্ট দলটির বিভক্ত দুই পক্ষের তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীরা বিভক্ত দুই পক্ষকে একত্র হওয়ার আল্টিমেটাম দেয়। ২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন দলটিকে ট্রাক প্রতীক বরাদ্দ সহ নিবন্ধন প্রদান করে। 

২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের ২ সেপ্টেম্বর দলটি নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন লাভ করে। দলটির নির্বাচনী প্রতীক হলো ট্রাক। ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দের ২ ফেব্রুয়ারি  উচ্চতর পরিষদের সবার সিদ্ধান্তে আনুষ্ঠানিকভাবে ‌৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দেয়।

১২ মে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিসহ ১৪ দলীয় জোটভুক্ত দলগুলোর নিবন্ধন বাতিলের দাবিতে নির্বাচন কমিশনে লিখিত আবেদন জমা দেয়।  

সেপ্টেম্বর ভিপি নূরের ওপর হামলার ঘটনা তদন্তে সরকার একটি বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন করে। এই কমিশন তাদের প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ শেষ করেছে এবং হামলার সাথে জড়িত অনেক সাবেক ছাত্রনেতা ও পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে।  নুরুল হক নুর নিজে এই কমিশনকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন এবং তাঁর ওপর হওয়া হামলার সে সময়কার মেডিকেল রিপোর্টগুলো জমা দিয়েছেন।

২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভিপি নূরের অংশগ্রহণ করে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি তার জন্মস্থান পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা ও দশমিনা) আসন থেকে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি এই আসনে মোট ৭৩,৯৩৪ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপি নেতা হাসান মামুন (স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঘোড়া প্রতীকে লড়েছেন), যিনি পেয়েছিলেন ৪৭,৯৫০ ভোট। সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পর, ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তিনি অন্তর্বর্তীকালীন/নির্বাচিত সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান পান। তাকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পদ দুটি হলো- শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় (প্রতিমন্ত্রী হিসেবে)। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় (প্রতিমন্ত্রী হিসেবে)।