রামপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায়
(১৮৭১-১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দ)
বিষ্ণুপুর ঘরানার অন্যতম সঙ্গীতজ্ঞ, খ্যাতনামা ধ্রুপদী ও যন্ত্রশিল্পী।

পিতার নাম অনন্তলাল বন্দোপাধ্যায় তাঁর প্রথম সঙ্গীতশিক্ষা পিতার কাছেপরে গোপালচন্দ্র চক্রাবতীর কাছে টপ্পা, নীলমাধব চক্রবর্তীর কাছে সেতার ও সুরবাহারে যন্ত্রসঙ্গীত শেখেন। তিনি বুন্দেলখন্ডের কিংবদন্তী শিল্পী মহম্মদ খাঁর কাছে দুই আঙুলে সেতারবাদন শেখেন ও তাতে দক্ষতা অর্জন করেন। ক্রমে পাখোয়াজ, সুরবাহার, সেতারবাদক ও সঙ্গীতগুণী হিসাবে তাঁর সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

কর্মজীবনে তিনি প্রথমে বিষ্ণুপর রাজবংশের কুচিয়াকোলের রাজদরবারের সভাগায়ক ছিলেন পরে নাড়াজোল রাজসভায় সঙ্গীতাচার্যরূপে যোগ দেন। এছাড়া তিনি বিভিন্ন সময়ে বর্ধমান রাজদরবারে, মহারাজা যতীন্দ্র্রমোহনের সঙ্গীত সভায়, আদি ব্রাহ্মসমাজে ও প্রমোদা দেবী চৌধুরাণীর 'সঙ্গীত সম্মিলনী'তে গায়ক হিসাবে যুক্ত ছিলেন।

নাড়াজোলের মহারাজার মৃত্যুর পর তিনি বিষ্ণুপরের পিতৃ-প্রতিষ্ঠিত সঙ্গীত বিদ্যালয়টিকে ‘অনন্ত সঙ্গীত বিদ্যালয়’ নামাঙ্কিত করে সম্পূর্ণ নুতনভাবে তার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি বাংলা ভাষায় রাগ-সঙ্গীতের সুর-সংগ্রহের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘সঙ্গীতমঞ্জরী (১৮৯৩)’ প্রণয়ন।  তাঁচিত। অন্যান্য গ্রন্থ: ‘মৃদঙ্গ দর্প’, ‘তবলা তরঙ্গ’ ও ‘এসরাজ তরঙ্গ’।

‘সঙ্গীত প্রবেশিকা’ পত্রিকায় তাঁর লিখিত বিভিন্ন গানের স্বরলিপি প্রকাশিত হয়। তিনি প্রাচীন হিন্দী গীতগুলি সংগ্রহ করে তার যথাসাধ্য নির্ভুল স্বরলিপি রচনা করেন। হিন্দী (ব্রজভাষা) ও বাংলায় কয়েকটি গানও তিনি রচনা করেন

প্রখ্যাত সঙ্গীতবিদ গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, গোকুলচন্দ্ৰ নাগ, গৌরহরি কবিরাজ প্রভৃতি অনেকেই তাঁর কাছে সঙ্গীত শিক্ষা করেন। তাঁর পুত্রদের (পরেশচন্দ্র, ভূপেশচন্দ্র, যোগেশচন্দ্র ও অশেষচন্দ্ৰ) সঙ্গীতশিক্ষার গুরুও তিনি ছিলেন।

শৈশবে ইনি পিতাকে হারান। তাঁর গান শুরু হয়েছিল ধ্রুপদ ধামার ও টপ্পা দিয়ে। কণ্ঠসঙ্গীতের পাশাপাশি, তিনি সেতার সুরবাহার এস্রাজে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন।

  তাঁর রচিত গ্রন্থের নাম- বিষ্ণুপুর। ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দের দিকে রবীন্দ্রনাথের সাথে তাঁর প্রথম দেখা হয়েছিল ঠাকুরবাড়িতে। তিনি স্বরলিপি করতে জানেন, এই পরীক্ষা নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। প্রাথমিকভাবে তিনটি গানের স্বরলিপি করার পর রবীন্দ্রনাথ তাঁকে গ্রহণ করেছিলেন। যথার্থ স্বরলিপিকার হিসেব তাঁর কদরও ছিল রবীন্দ্রনাথের কাছে। ইনি রবীন্দ্রনাথের বহুগানের স্বরলিপি তৈরি করেছিলেন।

১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ২৩শে ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন।