রবীন্দ্রনাথের
কালানুক্রমিক জীবনবৃত্তান্ত
সপ্তম
বর্ষ:
২৫ বৈশাখ ১২৭৪ (মঙ্গলবার ৭ মে ১৮৬৭ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে ২৪ বৈশাখ
১২৭৫ (মঙ্গলবার ৫ মে ১৮৬৮
খ্রিষ্টাব্দ)
এই সময় তিনি নর্মাল স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র।
তাঁর গৃহশিক্ষার আনুষ্ঠানিক সূচনালগ্নও ছিল এই বছর। এই বছরেই মূলত তাঁর
শিক্ষাজীবনের সেই বিখ্যাত "কঠোর রুটিন" প্রথম দানা বাঁধতে শুরু করে। এই বছরেই রবীন্দ্রনাথের সেজদাদা হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছোট ভাইদের শিক্ষার সম্পূর্ণ ভার গ্রহণ করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, শিশুদের শিক্ষার ভিত্তি হওয়া উচিত মাতৃভাষা এবং শরীরচর্চা। তাই রবীন্দ্রনাথের জন্য এমন একটি রুটিন তৈরি করা হয় যা ছিল অত্যন্ত শ্রমসাধ্য।
এই বছরটিতেই রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর অগ্রজ সোমেন্দ্রনাথকে কলকাতার ওরিয়েন্টাল
সেমিনারি স্কুলে ভর্তি করা হয়। তবে নর্মাল স্কুলে যাওয়ার আগে এই স্কুলে তিনি খুব
অল্প সময়ই কাটিয়েছিলেন। স্কুলের ধরাবাঁধা শাসন তাঁর শিশুমনকে প্রবলভাবে পীড়িত করা শুরু
হয় এই বছর থেকেই।
ভৃত্যরাজকতন্ত্রের ভৃত্যরা।
- ব্রজেশ্বর বা ঈশ্বর। এঁরা ছিলেন অভিভাবক তুল্য। এই সময় বালক রবির খাবার দাবার এবং সন্ধ্যার শাসনের পুরো ভার ছিল তাঁর ওপর। রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'ছেলেবেলা' গ্রন্থে লিখেছেন যে, ব্রজেশ্বর তাঁকে চালভাজা বা যৎসামান্য জলখাবার দিয়ে নিজে ভালো মন্দ খেতেন।
সন্ধ্যায় প্রদীপের আলোয় ব্রজেশ্বরের মুখে রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনী শোনা এই বছরের একটি বড় অংশ ছিল।
- কিশোরী চাটুজ্যে (কুস্তি ও প্রাতঃভ্রমণ)
বিষয়ক ভৃত্য। তিনি ভোরে ঘুম থেকে তুলে এবং 'কানা পালোয়ানের' কাছে কুস্তি শেখাতে নিয়ে
যেতে।
তিনি অনর্গল ছড়া এবং পাঁচালীর ঢঙে বালক রবির কল্পনা জগতকে প্রভাবিত করতে শুরু করেন।
-
নদের চাঁদ ও কালিদাস (খাজাঞ্জি কৈলাস)।
এঁরা দুইজন পৌষ মাসে রবীন্দ্রনাথের দেখভালে দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দেওয়া হয়।
এদের পরিবর্তে দারি দাস নামক এক ভৃত্যকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই ভৃত্য রবীন্দ্রনাথ
ও সোমন্দ্রনাথ ঠাকুরের দায়িত্ব লাভ করেন।
শ্যাম (রবীন্দ্রনাথের শৈশবের সঙ্গী ছিলেন শ্যাম)। শ্যাম বালক রবিকে খড়ি দিয়ে
ঘরের মেঝেতে একটি গোল গণ্ডি কেটে তার মধ্যে বসিয়ে রাখতেন এবং শাসিয়ে যেতেন যেন
তিনি গণ্ডি না পেরোন। সীতা যেমন গণ্ডি পেরোলে বিপদ হয়েছিল, বালক রবিকেও তেমন ভয়
দেখানো হতো।
কালিদাস (খাজাঞ্জি কৈলাস)। কালিদাস বা কৈলাস এই সময়েই ঠাকুরবাড়ির খাজাঞ্জিখানায় কর্মরত ছিলেন। তিনি সরাসরি রক্ষণাবেক্ষণ না করলেও বালক রবির বিনোদনের অন্যতম উৎস ছিলেন এবং তাঁর ছড়াগুলো এই ৫-৬ বছর বয়সেই রবির কানে প্রথম প্রবেশ করে।
এই বছরের রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা-সূচি
- কুস্তি ও শরীরচর্চা: এই বছরে রবীন্দ্রনাথকে খুব ভোরে ঘুম থেকে তুলে ল্যাঙট পরিয়ে জোড়াসাঁকোর কুস্তির আখড়ায় পাঠানো হতো। সেখানে কানা পালোয়ানের কাছে তাঁকে কুস্তি লড়তে হতো।
- গৃহশিক্ষক: এই সময়ে তাঁর প্রধান শিক্ষক ছিলেন মাধব পণ্ডিত।
পরে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান নীলকমল ঘোষাল ।
তিনি সকালে র কুস্তি
শেষে তাঁকে নীলকমল বাবুর কাছে বসতে হতো। তখন পাঠ্য ছিল— অক্ষয়কুমার দত্তের 'চারুপাঠ' (প্রথম ভাগ) এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের 'বর্ণপরিচয়' ও 'বোধোদয়'।
এই বছরে ইংরেজি শিক্ষার জন্য রবীন্দ্রনাথের গৃহশিক্ষকের তালিকায় যুক্ত হন- অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায়।
তিনি পড়াতেন প্যারিচরণ সরকারের বিখ্যাত 'ফার্স্ট বুক'। গৃহশিক্ষক নীলকমল বাবু কেবল বই পড়াতেন না, তিনি নানা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে বালক রবির কৌতূহল মেটাতেন। রবীন্দ্রনাথ 'জীবনস্মৃতি'তে লিখেছেন যে, এই বছরেই তিনি প্রথম লেন্সের সাহায্যে রোদে কাগজ পোড়ানো বা রামধনু তৈরির খেলা শিখেছিলেন, যা তাঁকে বিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট করেছিল। তাঁর কাছে পড়ার বিষয় ছিল- অক্ষয়কুমার দত্তের 'চারুপাঠ', 'বস্তুবিচার', বিজ্ঞান: 'প্রাণিবৃত্তান্ত', কাব্য: মাইকেল মধুসূদন দত্তের 'মেঘনাদবধ কাব্য'। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন যে, অল্প বয়সেই নীলকমল বাবু তাঁকে এই কঠিন কাব্যটি পড়িয়েছিলেন।
গণিত ও ভূগোলও তাঁর পাঠ্যতালিকায় ছিল। রবীন্দ্রনাথের বর্ণনা থাকে জানা যায়- নীলকমল বাবু ছিলেন অত্যন্ত কড়া শিক্ষক। তিনি খুব শুকনা গড়নের মানুষ ছিলেন বলে কবি তাঁকে "ছিপছিপে বেতের মতো"
সাথে তুলনা করেছেন। বাড়িতে স্কুলের চেয়েও অনেক বেশি পড়াশোনার চাপ ছিল নীলকমল বাবুর তত্ত্বাবধানে।
- বেলা সাড়ে ৯টা পর্যন্ত এই শিক্ষকের পড়া শেষ করে, তিনি যেতেন স্কুলে। দিনের বড় একটা সময় (দুপুর পর্যন্ত) তাঁকে স্কুলেই কাটাতে হতো। তবে স্কুলের চার দেয়ালের শাসন এবং পড়াশোনা তাঁর কাছে অত্যন্ত জেলখানার মতো মনে হতো।
- বিকেল বেলা স্কুল থেকে ফেরার পর জিমন্যাস্টিক এবং ছবি আঁকার শিক্ষকের কাছে
হাজির হতে হতো। জিমন্যাসটিকের মাস্টারের তাঁর নাম ছিল নীলমণি পণ্ডিত। স্কুল থেকে ফেরার পর রবীন্দ্রনাথকে তাঁর কাছে ব্যায়াম ও জিমন্যাসটিক করতে হতো। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির বারান্দায় একটি সমান্তরাল বার ছিল, যেখানে তিনি কসরত করতেন। তাঁর ছবি আঁকার শিক্ষকের নাম ছিল- প্রিয়নাথ
পাল। রবীন্দ্রনাথ নিজেই স্মৃতিচারণ করেছেন যে, সেই সময় ছবি আঁকার প্রতি তাঁর
খুব একটা মনোযোগ ছিল না, তিনি খাতার পাতায় কেবল হিজিবিজি কাটতেন।
- এই বছরে তাঁর রুটিনে ইংরেজি শিক্ষার প্রবেশ ঘটে।
সন্ধ্যাবেলায় শিক্ষক অঘোরবাবু (অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায়) আসতেন ইংরেজি পড়াতে।
অঘোরবাবু অত্যন্ত স্নেহশীল ছিলেন, যা নীলকমল বাবুর কঠোর শাসনের হাত থেকে বালক র বীন্দ্রানথা
কিছুটা মুক্তি পেতেন ।
- এই বছর থেকে তিনি বিষ্ণু চক্রবর্তীর
কাছে গান শেখা শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতিত থেকে জানা যায়- রবীন্দ্রনাথের সেজদাদা হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছোট ভাইদের শিক্ষার যে কঠোর রুটিন তৈরি করেছিলেন, তার মধ্যে গান শেখা ছিল বাধ্যতামূলক।
বিষ্ণুচন্দ্র চক্রবর্তীর কাছে গান শেখার জন্য আলাদা কোনো নির্দিষ্ট দিন থাকত না, তবে মূলত রবিবার সকালে তিনি জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে আসতেন। এছাড়া অন্যান্য দিনেও গানের চর্চা চলত।
বিষ্ণু চক্রবর্তীর কাছেই রবীন্দ্রনাথ ধ্রুপদ ও ব্রহ্মসংগীতের পাঠ নেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'ছেলেবেলা' গ্রন্থে লিখেছেন যে, বিষ্ণু ঠাকুর তাঁকে গান শেখানোর জন্য অনেক চেষ্টা করতেন, কিন্তু বাল্যকালে রবীন্দ্রনাথের কাছে সেই ধ্রুপদ গানের চেয়েও বাইরের জগতের ডাক বেশি আকর্ষনীয় ছিল।
এই সময় তিনি রামায়ণ পড়া শিখেছিলেন। একদিন কৃত্তিবাসের রামায়ণ পড়ার বর্ণনা দিয়েছেন
অন্যসূত্রে জীবনস্মৃতি-তে।
এক মেঘলা দিনে বাহিরবাড়িতে রাস্তার ধারের লম্বা বারান্দাটাতে খেলার সময়
ভাগিনেয় সত্যপ্রসাদ হঠাৎ তাঁর ক্ষুদ্রতম মাতুলটিকে ভয় দেখানোর জন্য
‘পুলিসম্যান’ ‘পুলিসম্যান’ বলে ডাকতে লাগলেন। পুলিসম্যানের নির্মম শাসনবিধি
সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা রবীন্দ্রনাথের ছিল। স্পষ্ট ধারণাও কিছু থাকা সম্ভব,
কেননা শ্যামাচরণ মল্লিকের যে বিরাট প্রাসাদতুল্য বাড়ির একাংশ নর্মাল স্কুল ও
গবর্মেন্ট পাঠশালার জন্য ভাড়া নেওয়া হয়েছিল, তারই অন্য অংশে একটি পুলিশ-থানা
অবস্থিত ছিল। সুতরাং ভীত বালক অন্তঃপুরে পালিয়ে গিয়ে মাকে এই বিপদের আশঙ্কা
জানালেন, কিন্তু পুত্রের এই সংকট তাঁকে বিন্দুমাত্র উৎকণ্ঠিত করেছে এমন কোনো
লক্ষণ প্রকাশ পেল না। কিন্তু বাইরে যাওয়াও যথেষ্ট নিরাপদ নয়, সুতরাং সারদা
দেবীর সম্পর্কিত খুড়ি শুভঙ্করী দেবী যে কৃত্তিবাসের রামায়ণখানা পড়তেন সেই
‘মার্বেলকাগজ-মণ্ডিত কোণছেঁড়া-মলাটওয়ালা মলিন’ বইটি কোলে নিয়ে মায়ের ঘরের
দরজার কাছে বসে পড়তে আরম্ভ করলেন : ‘সম্মুখে অন্তঃপুরের আঙিনা ঘেরিয়া চৌকোণ
বারান্দা; সেই বারান্দায় মেঘাচ্ছন্ন আকাশ হইতে অপরাহ্নের ম্লান আলো আসিয়া
পড়িয়াছে। রামায়ণের কোনো-একটা করুণ বর্ণনায় আমার চোখ দিয়া জল পড়িতেছে
দেখিয়া দিদিমা জোর করিয়া আমার হাত হইতে বইটা কাড়িয়া লইয়া গেলেন।’
ঠাকুরবাড়ির বিশেষ ঘটনা
- ২ অগ্রহায়ণ [রবি ১৭
নভেম্বর ১৮৬৭ ] স্বর্ণকুমারী দেবীর সঙ্গে জানকীনাথ ঘোষালের বিবাহ হয়। তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা-য় পৌষ সংখ্যায় বিবাহ-সংবাদটি প্রকাশিত হয়
‘ব্রাহ্মবিবাহ। গত ২ অগ্রহায়ণ রবিবার ব্রাহ্মসমাজের প্রধান আচার্য্য শ্রদ্ধাস্পদ শ্রীযুক্ত দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের চতুর্থা কন্যার সহিত কৃষ্ণনগরের অন্তঃপাতী জয়রামপুর নিবাসী বাবু জানকীনাথ ঘোষালের ব্রাহ্মবিধানানুসারে শুভ বিবাহ হইয়া গিয়াছে। বরের বয়ঃক্রম ২৭ বৎসর। কন্যার বয়ঃক্রম ১৩ বৎসর। এই বিবাহ উপলক্ষে দেশবিদেশ হইতে বহুসংখ্য ভাদ্রলোক ও ব্রাহ্মণ পণ্ডিত উপস্থিত হইয়াছিলেন। উক্ত দিবস রাত্রি ৮ ঘটিকার সময় এই শুভকাৰ্য্য আরম্ভ হইল।’
- ১৫ অগ্রহায়ণ [শনি ৩০ নভেম্বর ] হেমেন্দ্রনাথের
জ্যেষ্ঠ পুত্র ও দ্বিতীয় সন্তান হিতেন্দ্রনাথের জন্ম হয়।
- ১৬ অগ্রহায়ণ [রবি ১ ডিসেম্বর ] দ্বিজেন্দ্রনাথের
তৃতীয় পুত্র ও চতুর্থ সন্তান নীতীন্দ্রনাথের জন্ম হয়।
- ৩ আশ্বিন [বুধ ১৮ সেপ্টেম্বর ] গুণেন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠপুত্র গগনেন্দ্রনাথের জন্ম হয়। তাঁর নাম প্রথমে ‘গৌরীন্দ্র’ রাখার কথা ভাবা হয়েছিল, হয়তো দেবেন্দ্রনাথই তাঁর ‘গগনেন্দ্র’ নামকরণ করেন।
অন্যান্য বিষয়
- ২৯ আশ্বিন ১২৭৪ [সোম ১৪ অক্টোবর ১৮৬৭ ]
ঠাকুরবাড়ির সেরেস্তার কর্মচারী প্রসন্নকুমার বিশ্বাসের সঙ্গে ব্রজসুন্দর
মিত্রের তৃতীয়া কন্যার বিবাহ ব্রাহ্মমতে নিষ্পন্ন হয়।
বর দক্ষিণরাঢ়ী শ্রেণীর ও কন্যা বঙ্গজ-কায়স্থ শ্রেণীর
ছিল। বল্লাল সেন-প্রবর্তিত কৌলীন্য প্রথা অনুযায়ী
এই বিবাহ নিষিদ্ধ ছিল ।
- ৫ কার্তিক [সোম ২১ অক্টোবর ১৮৬৭ ] কেশবচন্দ্র
প্রমুখ ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজের ১২ জন সভ্য দেবেন্দ্রনাথের কাছে গিয়ে তাঁকে
একটি অভিনন্দন পত্র প্রদান করেন।
- ৯ কার্তিক [শুক্র ২৫ অক্টোবর ১৮৬৭ ] সন্ধ্যায় চিৎপুর রোড়ে ব্রাহ্মসমাজগৃহে পুস্তকালয়ের হলে রাজনারায়ণ বসুর সভাপতিত্বে
Brahmo Union Society
প্রতিষ্ঠিত হয়।
-
১১ কার্তিক দেবেন্দ্রনাথ এই সমিতির সভায় ‘ব্রাহ্মদিগের ঐক্যস্থান’ বিষয়ে উদ্বোধনী বক্তৃতা দেন।
- ৯ অগ্রহায়ণ [রবি ২৪ নভেম্বর ] কেশবচন্দ্রের
কলুটোলার ভবনে ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজের প্রথম ব্রহ্মোৎসব অনুষ্ঠিত হয়।
সন্ধ্যায় দেবেন্দ্রনাথ এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে সায়ংকালীন উপাসনাকার্য
সম্পন্ন করেন।
- ১১ মাঘ [ শুক্র ২৪জানুয়ারি ১৮৬৮ ] ব্রাহ্মসমাজের
অষ্টত্রিংশ সাংবৎসরিক উৎসবের দিনে মেছুয়াবাজার স্ট্রীটে [বর্তমান কেশবচন্দ্র
সেন স্ট্রীট] ‘ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজসংক্রান্ত উপাসনা-মন্দির’-এর ভিত্তি
সংস্থাপিত হয়। এই উপলক্ষে সারাদিনব্যাপী উৎসবের আয়োজন করা হয়েছিল।
- ৯ চৈত্র ১২৭৩ [শুক্র ২২ মার্চ ১৮৬৭ ] তারিখে
রাজনারায়ণ বসুর দ্বিতীয়া কন্যা হেমলতার সঙ্গে অপৌত্তলিক ব্রাহ্ম পদ্ধতি
অনুসারে দীননাথ দত্তের বিবাহ হয়।
- দ্বিতীয় অধিবেশন: চৈত্র মেলা : ১৮৬৮
খ্রিষ্টাব্দের ১১ এপ্রিল [শনিবার ৩০ চৈত্র ১২৭৪ বঙ্গাব্দ] আশুতোষ দেবের
বেলগাছিয়ার বাগানবাড়ি , হিন্দু মেলার দ্বিতীয় অধিবেশন
হয়। সম্পাদক ছিলেন
গণেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং সহ-সম্পাদক
ছিলেন নবগোপাল মিত্র।
এবারে মেলায় কয়েকটি বিভাগের নাম এবং বিভাগের সদস্যদের নাম ঘোষণা করা হয়। এই
বিভাগগুলো ছিলো – সাধারণ বিভাগ, প্রগতি বিভাগ, শিক্ষা বিভাগ, প্রদর্শনী বিভাগ,
সংগীত বিভাগ এবং ব্যায়াম-শিক্ষা বিভাগ। বেলা দশটায় ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন। এই মেলা উপলক্ষে
সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'মিলে সবে ভারতসন্তান গান'টি পরিবেশিত হয়।
উল্লেখ্য এই গানটি ভারতের প্রথম জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা অর্জন করে্ছিল। এছাড়া
এই মেলা উপলক্ষে রচিত আর যে সকল গান ও কবিতা পরিবেশিত হয়েছিল, সেগুলো হলো–
- লজ্জায় ভারত যশ গাহিব কি করে [গান]। রচনা গণেন্দ্রনাথ ঠাকুর।
- জন্মভূমি জননী, স্বর্গের গরীয়সী [কবিতা]। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর
- শিবনাথ ভট্টাচার্য, অক্ষয়চন্দ্র চৌধুরী'র কবিতা।
এছাড়া এই অধিবেশনে দেশীয় পণ্যের প্রদর্শনী, ব্যায়াম, রাসায়নিক পরীক্ষা
প্রদর্শিত হয়েছিল এই অধিবেশনে একটি স্থায়ী কমিটি গঠনের উদ্যাগ নেওয়া হয়েছিল। এই
অধিবেশনে শরীর গঠনের জন্য একটি ব্যায়ামাগার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব পাশ হয়। সেই
সূত্রে সার্কুলার রোডের ধারে ৬৪ নম্বর ফরিদ পুকুর লেনে শিবচন্দ্র গুহের
বাগানবাড়িতে একট ব্যায়াম-শিক্ষালয় খোলা হয়। এরপর ৭ই ডিসেম্বর চোরাবাগানে
গোপালচন্দ্র সরকারের প্রিপারেটরি ইনস্টিটিউশন ভবনে আর একটি ব্যায়াম-শিক্ষা
কেন্দ্র চালু হয়।
- দ্বিজেন্দ্রনাথের ‘তত্ত্ববিদ্যা ২য় খণ্ড—কর্মকাণ্ড’ [১২ ফাল্গুন
২৩ ফেব্রুয়ারি ১৮৬৮ ] ও সত্যেন্দ্রনাথের
শেকস্পীয়রের
Cymbeline নাটক অবলম্বনে লিখিত
‘সুশীলা-বীরসিংহ নাটক’ [২০ ফাল্গুন ২ ,মারচ ]
প্রকাশিত হয়।
তথ্যসূত্র:
-
জ্যোতিন্দ্রনাথের জীবন-স্মৃতি। বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়। বসন্তকুমার প্রণীত।
প্রশান্তকুমার পাল সম্পাদিত। ১ল বৈশাখ ১৪১৯।
-
রবিজীবনী প্রথম খণ্ড। প্রশান্তকুমার পাল। ভূর্জপত্র, কলকাতা।