শেখ সাদি
(১২১৩-১২৯১ খ্রিষ্টাব্দ)
পারশ্যের মধ্যযুগের অনয্তম ফার্সি কবি। অন্যনাম সাদি শিরাজি।
১২১৩ খ্রিষ্টাব্দে ইরানের শিরাজে জন্মগ্রহণ করেন। ধারণা করা হয়
শৈশবে তাঁর পিতার মৃত্যু হয়। শিরাজে স্থানীয় গুরুদের কাছে শিক্ষালাভের পর তিনি, বাগদাদের নিজামিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।
এখানে তিনি ইসলাম ধর্মতত্ত্ব, বিজ্ঞান, আইন, প্রশাসন, ইতিহাস, ফার্সি সাহিত্য বিষয়ে
অধ্যায়ন করেন।
ইরানে মোগল আগ্রাসনের কারণে তিনি দেশের বাড়ি ফিরে আসেন নি। ১২৩১ খ্রিষ্টাব্দের দিকে
তিনি বাগদাদ থেকে তুরস্কের আনাতোলিতে যান। এরপর তিনি কেনিয়া ও সিরিয়া ভ্রমণ করেন।
এই সময় দামেস্কতে দুর্ভিক্ষ চলছিল বলে তাঁর রচনা থেকে জানা যায়। এরপর তিনি টাইগ্রিস
নদীর তীরবর্তী অঞ্চল ভ্রমণ করেন। এই সময় ক্রুসেড যুদ্ধ চলছিল। ক্রুসেডরদের হাতে
বন্দী হওয়ার পর সাতবছর দাস হিসেবে দুর্গের বাইরে খনন কাজ করেন। পরে মামলুকদের দেওয়া
মুক্তি পণের বিনিময়ে তিনি মুক্ত হন। এরপর তিনি জেরুজালেম হয়ে- মক্কা ও মদিনা ভ্রমণ
করেন। ধারণা করা হয় এই সময় আরব-উপদ্বীপের অধিকাংশ অঞ্চল ভ্রমণ করেন। এরপর তিন
মঙ্গোল আগ্রাসনের হাত থেকে বাঁচার জন্য নির্জন অঞ্চলে বাস করা শুরু করেন।
সাদি মূলত
এই সময় সাদি বিচ্ছিন্ন শরণার্থী শিবিরগুলিতে বাস করতেন। এই শিবিরগুলতে দস্যু, ইমাম, প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক,
সৈন্য বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ লোকদের সাথে দেখা করতেন। এঁদের সাথে তিনি তাঁর জ্ঞান ও
অভিজ্ঞতা নিয়ে মতবিনিময় করতেন। সাদির রচনাগুলোতে মঙ্গোল আগ্রাসনের সময়ের বাস্তুচ্যুতি, যন্ত্রণা ও সংঘাতের শিকার সাধারণ
সকল শ্রেণির মানুষের দুর্দশ উপলব্ধি করে তাঁর জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছিলেন।
প্রায় ২০ বছর পর তিনি ইরানে ফিরে আসেন। খোরাসানে এসে সাদির সাথে তুঘরাল নামের তুর্কি আমিরের বন্ধুত্ব হয়। সাদি তার ও তার লোকদের সাথে সিন্ধু যাত্রার সাথে যোগ দিলেন যেখানে তিনি পারসী সুফি গ্র্যান্ড মাস্টার শায়খ উসমান মারভানদ্বীর (১১১৭–-১২৭৪) অনুসারী পীর পুত্তুরের সাথে দেখা
হয়। পরে তিনি ভারতে আসেন। ইতিমধ্যে সাদির জ্ঞানের কথা প্রচারিত হয়। তুঘরালের সূত্রে
তিনি দিল্লীর সুলাতনের দরবারের আমন্ত্রণ পান। গুজরাটে অবস্থানের সময় তিনি হিন্দু
ধর্ম সম্পর্কে জানতে পারেন। গুজরাটের সোমানাথ মন্দিরের ব্রাহ্মণদের সাথে ধর্ম তর্ক-বিতর্কে
অংশগ্রহণ করেন।
ভারত ভ্রমণের সময় তাঁর সাথে
আমির খসরুর
দেখা হয়। তিনি তাঁর রচিত
গজলের
উচ্চ প্রশংসা করেন। উল্লেখ্য, তিনি নিজেও গজল রচনা করেছিলেন।
১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দে হুলাগুর নেতৃত্বে মঙ্গোল আক্রমণকারীদের দ্বারা আব্বাসীয় খিলাফতের পতন এবং বাগদাদের ধ্বংসের শোক প্রকাশ করেছিলেন।
ভারত ভ্রমণ শেষে তিনি নিজ জন্মস্থান শিরাজিতে ফিরে আসেন। সেখানকার প্রশাসক এবং
সাধারণ মানুষ তাঁকে সাদরে বরণ করে নিয়েছিলেন। জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলো তিনি শিরাজেই
কাটান।
১২৯১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
সাদীর রচিত মোট ২২ খানা গ্রন্থের নাম শোনা যায়। তাঁর শ্রেষ্ঠগ্রন্থ গুলিস্তা বিশ্বসাহিত্যের এক অতুলনীয় সম্পদ। ইংরেজি, ফরাসি, ডাচ, জার্মান, আরবি, উর্দু, তুর্কি, স্প্যানিশ ইত্যাদি বহু ভাষায় এ জনপ্রিয় গ্রন্থের অনুবাদ হয়েছে। দ্য গার্ডিয়ান অনুসারে, তাঁর রচিত বুস্তান বইটি সর্বকালের সেরা ১০০ বইয়ের মাঝে স্থান পেয়েছে। মাস্টার অফ স্পিচ,দ্য মাস্টার ইত্যাদি বহু খেতাবেই তিনি পরিচিত।
সূত্র: