সরোজিনী নাইডু
(১৮৭৯-১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দ)
কবি ও রাজনীতিবিদ।
ভারতীয় কোকিল বা দ্য নাইটেঙ্গেল অফ ইন্ডিয়া নামে পরিচিতি লাভ করেছিলেন।
গান্ধীজি তাঁকে আদর করে ডাকতেন 'মিকি মাউস'।

১৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ই ফেব্রুয়ারি ভারতের হায়দ্রাবাদে জন্মগ্রহণ  করেন। তাঁর পৈত্রিক নিবাস ছিল বর্তমান বাংলাদেশের মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলার কনকসার। নাইডুর পিতা ড. অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন নিজাম শাসিত হায়দ্রাবাদের রাজ্যের শিক্ষা উপদেষ্টা। উল্লেখ্য, অঘোরনাথ হায়দ্রাবাদের নিজাম কলেজের প্রতিষ্ঠাতা। দর্শনিক  হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছিল। তাঁর মাতা ছিলেন কবি বরোদা সুন্দরী। তাঁর সাত ভাইবোনের ভিতর হারীন্দ্রনাথ কবি, নাট্যকার ও অভিনেতা ছিলেন। তাঁর অপর ভাই
বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী।

১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মাদ্রাজ ইউনিভার্সিটি থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। উল্লেখ্য তিনি সমগ্র
মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। এরপর ১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বন্ধ রেখে, নানা বিষয় অধ্যয়ন করেন।

১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে যান। সেখানে প্রথমে কিংস কলেজ এবং পরে ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটির গির্টন কলেজে অধ্যয়ন করেন (১৮৯৫-১৮৯৮)।

১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যান্ড থেকে ফেরার পর হায়দ্রাবাদের ড. মতিয়ালা গোবিন্দরাজলু নাইডুর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। উল্লেখ্য এই দম্পতির চারটি সন্তানরা ছিলেন-
জয়সূর্য, পদ্মজা, রণধীর ও লীলামণি। এর ভিতরে পদ্মজা পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হয়েছিলেন।

১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। এই সূত্রে তিনি তৎকালীন স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন। এই সূত্রে তৎকালীন সকল রাজনৈতিক নেতাদের সংস্পর্শে আসেন। এই বছরে তাঁর প্রকাশিত
The Golden Threshold, সাধারণ মানুষের কাছে ‘বুলবুলে হিন্দ’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন
১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে হায়দ্রাবাদে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ তৎপরতার জন্য ব্রিটিশ সরকার তাঁকে কায়সার-ই-হিন্দ স্বর্ণপদক প্রদান করে।

১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি অল ইন্ডিয়া ন্যাশনাল কংগ্রেসে যোগ দেন। এই সময় থেকে তিনি সমগ্র ভারতে সভা সমাবেশ করে নারী মুক্তি, শ্রমিক অধিকার রক্ষা ও জাতীয়তাবাদের সমর্থনে তাঁর বার্তা প্রচার করা শুরু করেন।
১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে বিহারে নীল চাষীদের বিষয়ে বৈঠক হয়। এরপর নীল চাষীদের অধিকার লাভের দাবিতে প্রচারাভিযানে অংশ নেন এবং চম্পারনের নীলচাষীদের পক্ষে সক্রিয়ভাবে নেতৃত্ব দেন।
১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে নারীর ভোটাধিকারের দাবিতে অ্যানি বেসান্তকে সভাপতি করে উইমেন ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন গঠিত হলে নাইডু এই সংগঠনের সদস্য হন।
১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ সরকারর রাওলাট আইন করে, সকল প্রকার ব্রিটিশবিরোধী রচনা নিষিদ্ধ করেন। এর প্রতিবাদে গান্ধীজি অসহযোগ আন্দোলন শুরু করলে, তিনি এই আন্দোলনে যোগদান করেন। এই বছরেই তিনি অল ইন্ডিয়া হোম রুল ডেপুটেশনের সদস্য হিসেবে ইংল্যান্ডে যান।

১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে জুলাই মাসে ভারতে ফিরে আসেন এবং ১লা আগষ্ট তিনি গান্ধীজির পক্ষে অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেন।
১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে পূর্ব আফ্রিকান ভারতীয় কংগ্রেসে, ভারতীয় কংগ্রেসের দলীয় প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করেন।
১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কানপুরে অনুষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া ন্যাশনাল কংগ্রেসের বার্ষিক সম্মেলনে সভাপতি নির্বাচিত হন।
১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে অল ইন্ডিয়া উইমেন কনফারেন্স গঠিত হলে সরোজিনী তিনি এর সভাপতি নির্বাচিত হন এবং নারী শিক্ষা অধিকার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন।
১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলনের বার্তা নিয়ে আমেরিকা যান। সেখানে তিনি আফ্রিকান আমেরিকান এবং ভারতীয় আমেরিকানদের মধ্যকার বৈষম্যের প্রতিবাদ জানান। আমেরিকা থেকে প্রত্যাবর্তনের পর তিনি কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের ২৬শে জানুয়ারি জাতীয় কংগ্রেস ভারতের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। এই কারণে গান্ধিজিকে ৫ই মে গ্রেফতার করা হয়। এর কিছুদিন পর একই কারণে সরোজিনী নাইডুকে গ্রেফতার করা হয়।

১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দের ৩১শে জানুয়ারি কারাগার থেকে মুক্তি মুক্তি পান। ছাড়া পাওয়ার পর কংগ্রেসের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি গান্ধীজির সঙ্গে লণ্ডনে গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেন। কিন্তু ওই বছরে আবার তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু অসুস্থতার কারণে পরে তাঁকে ছেড়ে দেয়া হয়।

১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের ২রা অক্টোবর ভারত ছাড় আন্দোলনে জড়িত থাকার জন্য তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে এশিয়ান রিলেশন্স কনফারেন্সে স্টিয়ারিং কমিটিতে তিনি সভাপতিত্ব করেন। সরোজিনী তাঁর বাগ্মিতার জন্য খ্যতিমান ছিলেন। ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর সরোজিনী নাইডু ভারতের উত্তর প্রদেশের গভর্নর নিযুক্ত হন এবং আমৃত্যু এ পদে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ২রা মার্চ এলাহাবাদে তাঁর মৃত্যু হয়।


সরোজিনী নাইডুর রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাদি
The Golden Threshold (১৯০৫)
The Bird of Time: Songs of Life, Death and the Spring
(১৯১২)
The Gift of India
(১৯১৫)
The Ambassador of Hindu Muslim Unity
(১৯১৬)
The Broken Wing: Songs of Love, Death and the Spring
(১৯১৭)
The Sceptred Flute: The Songs of India
(১৯৪৩)
The Feather of the Dawn
(১৯৬১)


সরোজিনী নাইডুর আজীবন কর্মসাধনার স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলাদেশ সরকার সরোজিনী নাইডু স্বর্ণপদক প্রবর্তন করেছেন।


সূত্র :
বাংলাদেশের ইতিহাস (আদিপর্ব)/রমেশচন্দ্র মজুমদার।
ভারতের ইতিহাস । অতুলচন্দ্র রায়, প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়।