স্নায়ুকোষ
neuron
দেহের অন্যান্য কোষের চেয়ে স্নায়ুকোষের প্রকৃতি ভিন্ন ধরনের। মানবশিশু জন্মের পর স্নায়ুকোষগুলো বিভাজিত হয়ে নতুন স্নায়ুকোষের উদ্ভব হতে থাকে। এই প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে মানুষের মস্তিষ্ক এবং সহায়ক স্নায়ুতন্ত্রের কাঠামো তৈরি হতে থাকে। প্রায় ১৮ বৎসর পর্যন্ত এই বৃদ্ধি হতে থাকে, তারপর স্নায়ুকোষের উৎপত্তি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে এই কোষ বিভাজিত হয়ে নতুন কোষের জন্ম দেয় না। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এই কোষের মৃত্যুর পর কোনো নতুন কোষ এসে তার জায়গা পূরণ করে না। এই ব্যতিক্রমী স্থানটি হলো- মস্তিষ্কের হিপ্পোক্যাম্পাস (hippocampus) অঞ্চল। মানুষের স্মৃতি-বিন্যাস এবং সংরক্ষণের স্থান হিসেবে এই অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই অঞ্চলে নতুন স্নায়ুকোষ তৈরির প্রক্রিয়া সারাজীবন ধরে চলতে থাকে।
গাঠনিক দিক থেকে স্নায়ুকোষকে ২টি ভাগে ভাগ করা হয়। বিবেচনা করে ২টি
ভাগ ভাগ করা হয়। এই ভাগ ২টি হলো −
কোষদেহ ও প্রবর্ধক।
cell body
):
একে বলা হয় স্নায়ুকোষের মূল দেহ। কোষ দেহ দেখতে তারকাকার, গোলাকার, ত্রিকোণাকার অথবা শঙ্কুর মতো হতে পারে। কোষদেহের বাইরের দিকে একটি একক
পর্দা থাকে। এই পর্দা তৈরি হয় লাইপো নামক এক ধরনের প্রোটিন দিয়ে। কোষদেহের ভিতরে সাইটোপ্লাজম দানাযুক্ত ও তন্তুময়
অংশকে বলা হয় নিউরোপ্লাজম। নিউরোপ্লাজমে অসংখ্য নিউক্লিওপ্রোটিন নির্মিত দানা থাকে, এদের
নিজল দানা বলে। নিজল দানা ছাড়াও নিউরোপ্লাজমে অসংখ্য
সুক্ষ্ম-সুক্ষ্ম তন্তু দেখা যায়, এগুলিকে নিউরোফাইব্রিল বলে। স্নায়ুকোষে একটি বড় গোলাকার বা ডিম্বাকার
নিউক্লিয়াস থাকে। যে অংশে নিউক্লিয়াস থাকে, তাকে বলা হয় সোম
(soma
)। কোষদেহের নিউরোপ্লাজমে অসংখ্য মাইটোকন্ড্রিয়াকে ছড়িয়ে
থাকতে দেখা যায়। এছাড়া রয়েছে গলগি বস্তু। এতে সেন্ট্রোজোম থাকলেও তা নিষ্ক্রিয়
থাকে।

কোষদেহের কাজ:
কোষ দেহ
স্নায়ুকোষের সার্বিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এই কার্যক্রমে কোষস্থ নানা
ধরনের অঙ্গাণু
(
Organelles
)
ব্যবহৃত হয়। বলাই বাহুল্য অঙ্গাণুর রয়েছে নিজস্ব কার্যক্রম। দেহকোষের প্রধান বা কেন্দ্রীয় অঙ্গাণু হলো এর
নিউক্লিয়াস বা প্রাণকেন্দ্র। নিউক্লিয়াস অন্যান্য অঙ্গাণুর সমন্বয়ে কোষের কাজকে
নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এর ভিতরে রয়েছে অঙ্গাণু সৃষ্টিকারী নিউক্লিয়োলাস।
দেহকোষের প্রোটিন সৃষ্টির জন্য রাইবোসোম সৃষ্টি করে। দেহকোষ প্রোটিন সৃষ্টির
মধ্য দিয়ে নতুন প্রবর্ধক (এ্যাক্সোন ও ডেন্ড্রিট) তৈরি করে এবং প্রয়োজনে অন্য
নিউরোনের সাথে সংযোগ স্থাপনের পথ তৈরি করে দেয়। তথ্য আদান-প্রদানের উপযোগী
রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করে।
কোষদেহে অবস্থিত মাইটোকোন্ড্রিয়া শক্তিকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। কোষের যাবতীয়
কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি প্রদান করে থাকে মাইটোকোন্ড্রিয়া।
নিউরোনের প্রকরণ:
স্নায়ুতন্ত্রে নানা ধরনের স্নায়ুকোষ দেখা যায়।
সার্বিক বিচারে এদেরকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়।
এই ভাগগুলো হলো-
উদ্দীপনা পরিবহন করে এবং স্নায়ুসন্নিধির মাধ্যমে স্নায়ু-উদ্দীপনাকে পেশি বা অন্য কোনও স্নায়ুকোষে প্রেরণ করতে সাহায্য করে।
স্নায়ুকোষের কাজের প্রকৃতি অনুসারে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়ে থাকে। এগুলো হলো− সংজ্ঞাবহ স্নায়ুকোষ, আজ্ঞাবহ স্নায়ুকোষ ও সহযোগী স্নায়ুকোষ ।
কোষদেহ থেকে উৎপন্ন প্রবর্ধকের সংখ্যানুযায়ী স্নায়ুকোষকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়। এই ভাগগুলো হলো।
যে
স্নায়ুকোষ থেকে তথ্য সঞ্চালিত হয়, তাকে বলা হয় প্রিসিন্যাপটিক নিউরোন (presynaptic
neuron) আর তথ্যগ্রাহক স্নায়ুকোষকে বলা হয় পোস্টসিন্যাপ্টিক
নিউরোন (postsynaptic
neuron)। প্রিসিন্যাপ্টিক নিউরোন তথ্য পাঠায় তার এ্যাক্সোন
প্রান্তের মাধ্যমে। এ্যাক্সোন প্রান্তের প্রান্তীয় পর্দার নিচে এক ধরনের থলে থাকে,
এদেরকে বলা হয়, সিন্যাপ্টিক ভেসিকেল (synaptic
vesicles)। এই সিন্যাপ্টিক ভেসিকেল ভিতরে
নিউরোট্র্যান্সমিটার তৈরি হয় এবং এর ভিতরে অবস্থান করে।
স্নায়ুকোষের
এ্যাক্সোনের ভিতর দিয়ে তথ্য সঞ্চালিত হয় বৈদ্যুতিক স্পন্দনের দ্বারা। সাধারণত
নিষ্ক্রিয় স্নায়ুকোষে প্রায় ৭০ মিলিভোল্ট ঋণাত্মক বিদ্যুৎ সঞ্চিত থাকে। এই অবস্থায়
স্নায়ুকোষে তথ্য সঞ্চালিত হলে ক্যালসিয়াম আয়ন (Ca++)
দ্বারা সম্পৃক্ত হয়। দেখা যায় প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১০ কোটি ধনাত্মক আধান দ্বারা
এ্যাক্সোন প্রান্তে জমা হয়। ধনাত্মক আধনের আধিক্যের কারণে ক্যালসিয়াম আয়ন
সিন্যাপ্টিক ভেসিকেলে প্রবেশ করে। এই সময় এর ভিতরের
নিউরোট্র্যান্সমিটার তথ্যকে গ্রহণ করে এ্যাক্সোনের পর্দা সংলগ্ন এলাকায় চলে আসে।
এরপর ভেসিকেলের মুখ খুলে গিয়ে নিউরোট্র্যান্সমিটার সিন্যাপ্সের ভিতরে ছড়িয়ে পড়ে।
নিউরোট্র্যান্সমিটারের কিছু অংশ পরবর্তীত কোষে তথ্য সঞ্চালন করে, বাকিটা এ্যাক্সোন
প্রান্তে চলে আসে এবং একটি বিশেষ পথ দিয়ে এ্যাক্সোনের সিন্যাপ্টিক ভেসিকেলে প্রবেশ
করে। এই বিশেষ পথটিকে বলা হয় রি-আপটেক (Re-uptake)।
মানব-মস্তিষ্কে প্রায় ১০,০০০ কোটি স্নায়ুকোষ রয়েছে। আর এর চেয়েও বেশি রয়েছে স্নায়ুকোষের সহায়ক নিউরোগ্লিয়া। প্রতিটি স্নায়ুকোষের সাথে সক্রিয় সম্পৃক্ততা রয়েছে প্রায় ১০,০০০। এরা পরস্পরের মধ্যে তথ্য সঙ্কেত আদানপ্রদান করে থেকে কোটি কোটি সিন্যাপ্স-সংযোগের মাধ্যমে। এই বিন্যাসের দ্বার গড়ে উঠেছে স্নায়ু-নেটওয়ার্ক। এ সকল বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলাপ করবো পরবর্তী সিন্যাপ্স অধ্যায়ে।