মহাভারত
আদিপর্ব


ভাষাংশ>মহাভারত >আদিপর্ব>দ্ব্যশীতিতম অধ্যায়


দ্ব্যশীতিতম অধ্যায়
যযাতির শর্ম্মিষ্ঠাগ্রহণ

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! রাজা যযাতি স্বনগরে প্রত্যাগত হইয়া পরম-সমাদরে দেবযানীকে অন্তঃপুরে প্রবেশ করাইলেন এবং তাঁহার নির্দেশক্রমে অশোকবনসন্নিধানে এক গৃহ নির্ম্মাণ করাইয়া বৃষপর্ব্বতনয়া শর্ম্মিষ্ঠাকে তথায় বাস করিতে আদেশ দিলেন। রাজা গ্রাসাচ্ছাদন প্রদানপূর্ব্বক শর্ম্মিষ্ঠার প্রতিপালন ও দেবযানীর সহিত পরমসুখে যৌবনসুখ চরিতার্থ করিতে লাগিলেন। কালক্রমে দেবযানীর ঋতুকাল উপস্থিত হইলে, তিনি রাজসহযোগে গর্ভবতী ও যথাকালে পুৎত্রবতী হইলেন। এইরূপে সহস্র বৎসর অতিবাহিত হইলে, একদা শর্ম্মিষ্ঠা আপন নবযৌবন ও গর্ভাধানকাল আবির্ভূত দেখিয়া চিন্তা করিতে লাগিলেন, “আমার ত’ ঋতুকাল উপস্থিত, কিন্তু অদ্যাপি বিবাহ হইল না; এক্ষণে কি করি, কি উপায়েই বা স্বীয় মনোরথ সম্পাদন করি। দেবযানী একটি পুৎত্র প্রসব করিয়া স্বকীয় বাসনা চরিতার্থ করিয়াছে, কিন্তু আমার যৌবনকাল বুঝি নিষ্ফল হইল। দেবযানী যেরূপে কৃতকার্য্য হইয়াছে, আমিও সেইরূপে মহারাজকে পতিত্বে বরণ করিয়া চরিতার্থ হইব। আমি সন্তানকামনায় নির্জ্জনে তাঁহার সহযোগ প্রার্থনা করিলে, বোধ করি, তিনি কখনই তাহাতে পরাঙ্মুখ হইবেন না।” এই অবসরে রাজা যযাতি অন্তঃপুর হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া যদৃচ্ছাক্রমে অশোকবনসন্নিধানে আগমন করিলেন। সুচারুহাসিনী শর্ম্মিষ্ঠা রাজাকে নির্জ্জনে পাইয়া প্রত্যুদ্‌গমনপূর্ব্বক কৃতাঞ্জলিপুটে নিবেদন করিলেন, “মহারাজ ইন্দ্র, চন্দ্র, বিষ্ণু, যম ও বরুণের অন্তঃপুরে কিংবা আপনার অন্তঃপুরে যে-সকল স্ত্রীলোক বাস করেন, তাঁহাদিগকে কেহই নয়নগোচর করিতে পান না। হে রাজন্! আমার কুল, শীল, রূপ, যৌবন প্রভৃতি কিছুই আপনার অবিদিত নহে। সম্প্রতি আমি বিনয়পূর্ব্বক প্রার্থনা করি, আপনি অনুগ্রহ করিয়া আমার ঋতুরক্ষা করুন।” যযাতি কহিলেন, “হে সুন্দরি! তুমি অতি সুশীলা, সৎকুলোদ্ভবা এবং তোমার রূপ কোন অংশেই নিন্দনীয় নহে; কিন্তু দেবযানীর পাণিগ্রহণকালে শুক্র আমাকে কহিয়াছিলেন, এই বৃষপর্ব্বতনয়া শর্ম্মিষ্ঠাকে তুমি কদাচ শয্যায় আহ্বান করিও না।” শর্ম্মিষ্ঠা কহিলেন, “মহারাজ! পরিহাসপ্রসঙ্গে, স্ত্রীর মনোরঞ্জনের নিমিত্তে, বিবাহকালে, প্রাণসঙ্কটে ও সর্ব্বস্বনাশকালে মিথ্যাব্যবহার কদাচ পাপাবহ নহে। সাক্ষ্যপ্রদানে বা বিচারস্থলে মিথ্যাকথা কহিলেই মহাপাপে পরিলিপ্ত হইতে হয়।”

যযাতি কহিলেন, “রাজাই প্রজাদিগের দৃষ্টান্তস্থল, মিথ্যা কহিলে রাজা অবশ্যই বিনষ্ট হন, অতত্রব আমি অর্থকষ্টেও মিথ্যা কহিতে সম্মত নহি।” তখন শর্ম্মিষ্ঠা পুনর্ব্বার কহিলেন, “মহারাজ! সখীর পতি ও আমার পতি উভয়েই তুল্য এবং একের বিবাহে অন্যেরও বিবাহ সিদ্ধ হইয়া থাকে; অতএব যখন আমার সখী আপনাকে পতিত্বে বরণ করিয়াছেন, তখন আমারও বরণ করা হইয়াছে।” যযাতি কহিলেন, “সুন্দরি! অর্থীদিগের প্রার্থনা পরিপূর্ণ করা আমার এক প্রধান ধর্ম্ম ও অবশ্য কর্ত্তব্য কর্ম্ম। তুমিও আমার নিকট প্রার্থনা করিতেছ, অতএব বল, তোমার কি প্রিয়কার্য্য সম্পাদন করিতে হইবে?” শর্ম্মিষ্ঠা কহিলেন, “মহারাজ! আমাকে অধর্ম্ম হইতে পরিত্রাণ করিয়া আমার ধর্ম্ম স্থাপন করুন, অতঃপর আমি আপনার প্রসাদে পুৎত্রবতী হইয়া পৃথিবীতে ধর্ম্মানুষ্ঠান করিতে পারিব। আরও দেখুন, ভার্য্যা, দাস ও পুৎত্র ইহারা যে কিছু ধন উপার্জ্জন করে, সে ধনে তাহাদিগের অধিকার নাই, তাহাদিগের প্রভুরই সম্পূর্ণ অধিকার; আমি দেবযানীর দাসী এবং তিনি আপনার বশ্যা; অতএব আমাদের উভয়েরই মনোরথ সফল করিবেন, এই অঙ্গীকার করিয়া আমার পাণিগ্রহণ করুন।” বৈশম্পায়ন কহিলেন, অনন্তর ধর্ম্মপরায়ণ রাজা যযাতি শর্ম্মিষ্ঠার প্রার্থনায় সম্মত হইয়া তাঁহার ঋতুরক্ষা করিয়া পরস্পর প্রিয়সম্ভাষণপূর্ব্বক স্বস্থানে প্রস্থান করিলেন। বৃষপর্ব্বতনয়া শর্ম্মিষ্ঠা রাজার সহযোগে গর্ভবতী হইয়া যথাকালে এক পরমসুন্দর পুৎত্র প্রসব করিলেন।