মহাভারত
আদিপর্ব


ভাষাংশ>মহাভারত >আদিপর্ব>একনবতিতম- দ্বিনবতিতম অধ্যায়


একনবতিতম অধ্যায়
চারি প্রকার আশ্রমধর্ম্মবর্ণন

অষ্টক কহিলেন, “মহারাজ! ব্রহ্মচারী, গৃহী, বানপ্রস্থ ও ভিক্ষু্ ইঁহারা কিরূপ আচরন করিলে সৎপথে থাকিয়া ধর্ম্মোপার্জ্জন করিতে পারেন, এই বিষয়ে নানাপ্রকার প্রবাদ আছে। আপনার মত কি?” যযাতি কহিলেন, “ব্রহ্মচারীর ধর্ম্ম এই যে, অধ্যাপনাদি গুরুকার্য্যের নিমিত্ত কদাচ গুরুকে প্রেরণা করিবেন না; গুরু যখন তাঁহাকে আহ্বান করিবেন, তখন অধ্যয়ন করিবেন; গুরুর শয়নের পর শয়ন ও গাত্রোত্থানের পূর্ব্বে গাত্রোত্থান করিবেন এবং মৃদু, দান্ত, সন্তুষ্ট-স্বভাব, অপ্রমত্ত ও বেদাধ্যয়নে নিরত থাকিবেন। গৃহস্থের ধর্ম্ম এই যে, ধর্ম্মতঃ ধনোপার্জ্জন করিয়া তদ্দ্বারা যাগদানাদি ক্রিয়াকলাপ সম্পন্ন করিবেন, অতিথিভোজন করাইবেন এবং অদত্ত বস্তু প্রতিগ্রহ করিবেন না। বানপ্রস্থের কর্ত্তব্য এই যে, স্বকীয় বীর্য্য উপজীব্য করিয়া জীবনধারণ করিবেন, কোনরূপ পাপকর্ম্মে আসক্ত হইবেন না; পরকে দান করিবেন; কাহাকেও কষ্টদান করিবেন না। ভিক্ষুক কর্ত্তব্য এই যে, শিল্পকর্ম্ম দ্বারা জীবিকানির্ব্বাহ করিবেন না; গুণবান্, জিতেন্দ্রিয়, বিষয়বাসনা হইতে বিরক্ত ও বৃক্ষমূলশায়ী হইবেন এবং অধিক দেশ পর্য্যটন করিবেন না। লোকে নিদ্রায় অভিভূত ও কামপরতন্ত্র হইয়া যে রজনী সুখে অতিবাহিত করে, জ্ঞানী ব্যক্তি সংযতচিত্তে অরণ্যে বাস করিয়া সেই রজনী যাপন করিবেন। যিনি এইরূপে অরণ্যবাস করিয়া তথায় কলেবর পরিত্যাগ করেন, তিনি পূর্ব্ব দশ পুরুষ,পশ্চাৎ দশ পুরুষ এবং আপনাকে-এই একবিংশতি পুরুষকে পরিত্রাণ করেন।”

মুনিলক্ষণ

অষ্টক কহিলেন, “মহারাজ! মুনি ও মৌনব্রতী কয় প্রকার, বলুন, শুনিতে আমাদিগের সাতিশয় বাসনা হইতেছে।” রাজা কহিলেন, “হে অষ্টক! যিনি পৃষ্ঠভাগে গ্রাম রাখিয়া কিংবা পৃষ্ঠভাগে অরণ্য রাখিয়া গ্রামে বাস করেন তাঁহাকেই মুনি বলা যায়।”
অষ্টক কহিলেন, “মহারাজ! যিনি অরণ্যে বাস করেন, তাঁহার পশ্চাদ্ভাগে অরণ্য থাকে, সে কি প্রকার?” রাজা কহিলেন, “যিনি অরণ্যে বাস করিয়া গ্রাম্য ফলমূলাদি ভক্ষণ করেন না, তাঁহার পশ্চাদ্ভাগে গ্রাম; আর যিনি গ্রামে বাস করিয়া অগ্নিহোত্রী নহেন, বাসস্থান নির্দিষ্ট নাই, অগোত্রচারী ও কৌপীনধারী এবং যতদিন প্রাণসংযোগ, ততদিন অন্নপানেচ্ছা, তাঁহারই পশ্চাদ্ভাগে অরণ্য। আর যিনি সর্ব্ববাসনাপরিশূন্য হইয়া সর্ব্বকর্ম্ম বিসর্জ্জন ও ইন্দ্রিয় দমনপূর্ব্বক মৌনাবলম্বন করিয়া থাকেন, তাঁহাকে মৌনব্রতী কহে; মৌনব্রতী সর্ব্বসিদ্ধিলাভ করিতে পারেন। ধৌতদন্ত, ছিন্ননখ, স্নাত, অলঙ্কৃত, অসিতকলেবর শুভকর্ম্মা মুনি সকলের অর্চ্চনীয়। যিনি তপস্যা দ্বারা কর্ষিত, ক্ষীণ, শীর্ণ-কলেবর, জীর্ণ-মাংস ও শুষ্কাস্থি হয়েন, সেই মুনি ইহলোক জয় করিয়া পরলোকও জয় করেন। আর যিনি নির্দ্বন্দ্ব হইয়া মৌনব্রতাবলম্বনপূর্ব্বক তপশ্চরণ করেন, তিনি ইহলোক জয় করিয়া পরলোক জয় করেন। যে মুনি মুখ দ্বারা গোবৎ৪ আহার অন্বেষণ করেন, ইহলোক ও পরলোক উভয়ই তাঁহার প্রীতিকর হইয়া উঠে।”

দ্বিনবতিতম অধ্যায়
যযাতির স্বধর্ম্মানুরক্তি

অষ্টক যযাতিকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “উক্ত উভয়বিধ ভিক্ষুর মধ্যে অগ্রে কাহার মুক্তিলাভ হইয়া থাকে?” যযাতি কহিলেন, “যিনি গৃহস্থাশ্রমে বাস করিয়াও আশ্রমবিবর্জ্জিত এবং কামাচারপরাঙ্মুখ, তিনিই অগ্রে মুক্তিলাভ করেন। যথার্থ জ্ঞানী হইয়া পাপাচরণ করিলেও ধারাবাহিক সুখভোগ করিতে পারেন। যে-ব্যক্তি পণ্ডশ্রম মনে করিয়া ধর্ম্মোপাসনা করে, তাহার সেই ধর্ম্মাচরণ বিফল; কেবল ক্রুরতা মাত্র।”

মহারাজ! রাজা যযাতির একম্প্রকার ধর্ম্মসংগীত শ্রবণ করিয়া, অষ্টক জিজ্ঞাসা করিলেন, “মহারাজ! আপনি যুবা, মাল্যধারী, তেজস্বী এবং দর্শনীয়; কোন্ ব্যক্তি আপনাকে দূতরূপে প্রেরণ করিয়াছেন এবং আপনি কোথা হইতে আগমন করিলেন ও কোন দিকে গমন করিবেন? আপনার কি পার্থিব স্থানে গমন করিতে হইবে?” যযাতি কহিলেন, “আমার পূণ্যক্ষয় হওয়াতে স্বর্গ হইতে চ্যুত হইয়া এই পৃথিবীরূপ ভৌম নরকে পতিত হইতেছি; আপনাদিগের সহিত কথোপকথন করিয়া অচিরে ভূতলে পতিত হইব; যেহেতু ব্রহ্মলোকরক্ষকেরা আমার ভূলোকপতনের নিমিত্ত ত্বরা করিতেছেন। আর পতনকালে ইন্দ্র আমাকে এই বর দিয়াছেন, ‘হে নরেন্দ্র! তুমি সাধুসমাজে পতিত হইবে’, তাহাও হইল।” অষ্টক কহিলেন, “তুমি পতিত হইও না, হে রাজন! যদি আমার অন্তরীক্ষ বা দিব্য কোন লোক থাকে, আমি তোমাকে তাহার অধিকারী করিলাম।” যযাতি কহিলেন, “মহারাজ! যতদিন পৃথিবীতে গবাশ্ব প্রভৃতি জীবজন্তু আছে, ততদিন আপনার স্বর্লোকে অধিকার আছে।” অষ্টক কহিলেন, “আমার দিব্য বা অন্তরীক্ষ যে-কোন লোক থাকে, তাহা তোমাকে প্রদান করিলাম, তুমি অচিরাৎ সেই স্থানে গমন কর।” যযাতি প্রত্যুত্তর করিলেন, “হে রাজশ্রেষ্ঠ বেদবিৎ ব্রাহ্মণেরাই প্রতিগ্রহ করিয়া থাকেন, মাদৃশ ক্ষৎত্রিয়েরা কদাচ যাচ্ঞাদৈন্য স্বীকার করেন না; বরং ব্রাহ্মণ ভিন্ন অন্য জাতির অভাবে প্রাণত্যাগ করা কর্ত্তব্য, তথাপি যাচ্ঞাজনিত লঘুতা স্বীকার করা অনুচিত।”
পরে অষ্টকের সমভিব্যাহারী প্রতর্দ্দন কহিলেন, “হে দর্শনীয়! আমি প্রতর্দ্দন, তুমি তত্ত্বজ্ঞানী, অতএব যদি অন্তরীক্ষে বা স্বর্গে আমার কোন স্থান থাকে, আমি তোমাকে তাহার অধিকারী করিলাম।” যযাতি কহিলেন, “হে নরেন্দ্র! আপনার অতি উৎকৃষ্ট বহুসংখ্যক লোক আছে। সেই সকল লোক আপনাকে প্রতীক্ষা করিতেছে; উহা এত অধিকসংখ্যক যে, প্রতি সপ্তাহে এক এক লোক ভোগ করিলেও নিঃশেষিত হয় না।” প্রতর্দ্দন কহিলেন, “আমি তোমাকে সেই সকল লোক প্রদান করিলাম। তুমি মোহ পরিত্যাগপূর্ব্বক শীঘ্র তথায় গমন কর।” রাজা প্রত্যুত্তর করিলেন, “সমতেজস্ক শ্রেষ্ঠ রাজারা অন্যের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেন না। ধর্ম্মপরায়ণ রাজা ধর্ম্ম্য মান্য ও যশস্কর কর্ম্ম যত্নপূর্ব্বক সম্পাদন করিয়া থাকেন; কিন্তু আপনি যেরূপ বলিতেছেন, মাদৃশ লোক এরূপ কৃপণ কর্ম্ম করিতে সম্মত নহেন। মদ্বিধ লোকের কর্ত্তব্য যে, যাহা অন্যে না করিয়াছে তদ্রূপ অপূর্ব্ব কর্ম্ম সম্পাদন করে।” রাজা যযাতি এইরূপ কহিতেছেন, ইত্যবসরে মহারাজ বসুমান্ তাঁহাকে বলিতে আরম্ভ করিলেন।