বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: মত্তময়ূর ছন্দে নাচে কৃষ্ণ প্রেমানন্দে
মত্তময়ূর ছন্দে নাচে কৃষ্ণ প্রেমানন্দে।
রুমু ঝুম্ ঝুম্ মঞ্জীর বাজে কঙ্কণ মণিবন্ধে॥
রিমঝিম্ রিমঝিম্ ঝিম্ কেকা-বর্ণ ঘন বরষে
তৃষ্ণা-তৃপ্ত আত্মা নাচে নন্দনলোকে হরষে,
ঝঞ্ঝার ঝাঁঝরতাল বাজে শূন্যে মেঘ-মন্দ্রে॥
পল্লব ঘন-চক্ষে ঝরে অশ্রু-রসধারা
পূব হাওয়াতে বংশী ডাকে আয় রে পথহারা,
বন্দে দামিনী বর্ণা রাধা বৃন্দাবন চন্দে॥
- ভাবসন্ধান: সংস্কৃত মত্তময়ুর ছন্দ অবলম্বনে এই গানটি রচিত
হয়েছিল। গানে যখন এই ছন্দটি মত্তময়ুরী তাল হিসেবে স্বীকৃত। এই তালের ছন্দের
লীলার বাইরে বিষয় হিসেব উপস্থাপিত হয়েছে বৈষ্ণব ভাবাদর্শ। এই গানে প্রেমানন্দে কৃষ্ণের নৃত্য, বর্ষার প্রকৃতি এবং রাধা-কৃষ্ণের দিব্য প্রেমের
এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। কবি বর্ষার মেঘ, বৃষ্টি, বিদ্যুৎ, ঝড় ও
বাঁশির সুরকে কৃষ্ণের প্রেমানন্দের সঙ্গে মিলিয়ে এক গভীর আবেগময় পরিবেশ
সৃষ্টি করেছেন।
তালের নামের সাথে মিল রেখে- কবি গানটি শুরু করেছেন- 'মত্ত ময়ূর' বিশেষণে।
এখানে মত্ত ময়ূর দ্ব্যর্থক। হতে মনের মত্ত ময়ুরের মতো কৃষ্ণ প্রেমানন্দে নৃত্য করছেন।
হতে পারে মত্তময়ুর তালের ছন্দে তিনি নাচজছেন। তাঁর পায়ের মঞ্জীর এবং হাতের কঙ্কণের ঝংকারে চারদিক মুখরিত। এই নৃত্য কেবল বাহ্যিক নৃত্য নয়—এ যেন প্রেমের অতিরিক্ত আনন্দে আত্মার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ।
কবি কল্পবিহারে অনুভব করেন- যেন এর সঙ্গে প্রকৃতিও কৃষ্ণের নৃত্যে অংশ নিয়েছে। আকাশে ঘন মেঘের “রিমঝিম” বর্ষণ, মেঘের গম্ভীর গর্জন এবং ঝঞ্ঝার তালে তালে চারদিক যেন এক বিশাল
তাল-বাদ্যযন্ত্রে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ তৃষ্ণার পর যেমন বৃষ্টিতে প্রকৃতি তৃপ্ত হয়, তেমনি কৃষ্ণপ্রেমে তৃষ্ণার্ত আত্মাও আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এখানে বৃষ্টি যেমন পৃথিবীর তৃষ্ণা মেটায়, কৃষ্ণপ্রেম তেমনি ভক্ত-হৃদয়ের তৃষ্ণা মেটায়।
এ গানের 'পল্লব ঘন-চক্ষে ঝরে অশ্রু-রসধারা'—এই চিত্রকল্পে প্রকৃতি ও ভক্তের
যুগল অনুভবকে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাই পাতার ওপর জমে থাকা বৃষ্টিধারাকে কবি
অনুভব করেছেন প্রকৃতির চোখের অশ্রু। যেন তা আনন্দ আনন্দাশ্রু হয়ে ঝরে পড়ছে।
এরই মাছে কবি অনুভব করেন- পুবালি বাতাসে কৃষ্ণের বাঁশির আহ্বান। যেন
কোন এক পথহারা পথিককে সকাতরে ডাকছেন—“আয় রে পথহারা”। এই ডাক যেন সংসার-পথে হারিয়ে যাওয়া প্রাণকে প্রেমের পথে ফিরে আসার আহ্বান। বাঁশির সুর তাই কেবল সংগীত নয়; এটি আত্মার প্রতি
কৃষ্ণের আহ্বান।
শেষে দামিনীর মতো উজ্জ্বল রাধাকে এবং বৃন্দাবনের চাঁদ কৃষ্ণকে বন্দনা করা হয়েছে। রাধা যেন বিদ্যুতের দীপ্তি আর কৃষ্ণ যেন বৃন্দাবনের চন্দ্র; তাঁদের মিলনে শ্যাম-শ্যামল বৃন্দাবন প্রেমের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে।
- রচনাকাল ও স্থান:
গানটির
রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।
১৯৪১
খ্রিষ্টাব্দের ২৬শে জুলাই (শনিবার, ১০ শ্রাবণ ১৩৪৮) কলকাতা
বেতার কেন্দ্র থেকে ছন্দিতা নামক অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪২ বৎসর ২ মাস
- গ্রন্থ:
-
শেষ সওগাত
- প্রথম সংস্করণ [২৫শে বৈশাখ ১৩৬৫ (বৃহস্পতিবার, ৪ মে
১৯৫৮)। ছন্দিতা। ৪ মত্তময়ূর।]
- নজরুল রচনাবলী ষষ্ঠ খণ্ড [জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯, জুন ২০১২। শেষ
সওগাত। ছন্দিতা। ৪ মত্তময়ূর। পৃষ্ঠা ১১৯]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২।
গান সংখ্যা ১৬৪৪। তাল: মত্ত ময়ূর (২২ মাত্রা)। পৃষ্ঠা: ৪৯১]
- বেতার: ছন্দিতা।
২৬ জুলাই ১৯৪১ [শনিবার, ১০ শ্রাবণ ১৩৪৮] কলকাতা বেতার-কেন্দ্র। সময়:
৮-৮.৩৯।
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। ভক্তি ও
প্রেম
- সুরাঙ্গ: তালাশ্রয়ী [ছন্দপ্রধান]
- তাল:
মত্তময়ূর।
সংস্কৃত 'মত্তময়ুর' ছন্দের আদলে নজরুল ইসলাম এই তালটি সৃষ্টি করেছিলেন।
সূত্র:
- বেতার জগৎ। ১২শ বর্ষ, ১৪শ সংখ্যা। ১৬ জুলাই ১৯৪১। পৃষ্ঠা: ৮৩৬
- The Indian Listener
পত্রিকার Vol VI, No. 14, 7 july 1941.
page 71