বিষয়: নজরুল সঙ্গীত
শিরোনাম: সৃজন-ভোরে প্রভু মোরে
সৃজন-ভোরে প্রভু মোরে সৃজিলে গো প্রথম যবে,
(তুমি) জানতে আমার ললাট-লেখা, জীবন আমার কেমন হবে॥
তোমারই সে নিদেশ প্রভু,
যদিই গো পাপ করি কভু,
নরক-ভীতি দেখাও তবু, এমন বিচার কেউ কি সবে॥
করুণাময় তুমি যদি দয়া করো দয়ার লাগি
ভুলের তরে ‘আদমেরে’ করলে কেন স্বর্গ-ত্যাগী!
ভক্তে বাঁচাও দয়া দানি
সে তো গো তার পাওনা জানি,
পাপীরে লও বক্ষে টানি করুণাময় কইব তবে॥
- ভাবসন্ধান: সুফি দর্শনে সৃষ্টিজগৎ আল্লাহর ইচ্ছা ও জ্ঞানের মধ্যেই অবস্থিত। মানুষ জন্মের পূর্বেই তার স্রষ্টার জ্ঞাত—
তার দুর্বলতা, তার ভুল, তার পতন এবং তার ফিরে আসার সম্ভাবনাও তাঁর অজানা নয়।
তাই ভক্তের প্রশ্ন—যদি তুমি আগে থেকেই জানতে যে আমি ভুল করব, তবে আমার ভুলের জন্য শুধু শাস্তিই কেন?
কিন্তু এ প্রশ্ন আল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়; এটি সুফি প্রেমিকের প্রিয়তমের সঙ্গে অন্তরঙ্গ কথোপকথন। সুফি কবি আল্লাহকে দূরবর্তী বিচারক হিসেবে নয়, হৃদয়ের অতি নিকটতম প্রিয়জন হিসেবে অনুভব করেন। সেই ঘনিষ্ঠতার অধিকারেই তিনি প্রশ্ন করেন।
সুফিবাদের একটি প্রধান প্রবণতা হলো— ভয়ের ধর্ম থেকে প্রেমের ধর্মে উত্তরণ।
শুধু নরকের ভয়ে ইবাদত করা বা স্বর্গের আশায় আল্লাহকে স্মরণ করা সুফির কাছে প্রেমের সর্বোচ্চ স্তর নয়। প্রকৃত আশিক আল্লাহকে ভালোবাসে আল্লাহর জন্যই।
অতএব, এখানে ‘নরক-ভীতি’ কেবল পরকালের শাস্তির ভয় নয়; এটি মানুষের সেই ধর্মচেতনার প্রতীক, যেখানে ঈশ্বরকে প্রধানত বিচারক ও দণ্ডদাতা হিসেবে দেখা হয়। গানের ভক্ত সেই ধারণাকে অতিক্রম করে প্রেমময় করুণাময় প্রভুর সন্ধান করছে।
সুফি ভাবনায় আদমের পতন কেবল শাস্তির ইতিহাস নয়; এটি মানুষের বিচ্ছেদ ও পুনর্মিলনের মহাকাহিনি।
স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে আগমন মানে প্রিয়তম থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া। আর মানবজীবনের সমস্ত সাধনা হলো সেই বিচ্ছিন্ন আত্মার পুনরায় তার উৎসের দিকে ফিরে যাওয়া।
এই অর্থে ‘আদমের ভুল’ মানবজীবনের প্রতীক। মানুষ ভুল করে, পতিত হয়, পথ হারায়; কিন্তু সেই পতনই তাকে নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করায় এবং শেষ পর্যন্ত
আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নেয়।
সুফি সাধনার ভাষায় বলা যায়—পতন কখনও কখনও প্রত্যাবর্তনের পথও তৈরি করে।
যে ভক্ত ইতিমধ্যেই প্রভুর পথে আছে, তাকে আশ্রয় দেওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু যে পথভ্রষ্ট, যে পাপী, যে দূরে সরে গেছে—তাকে ফিরিয়ে আনার মধ্যেই করুণার সর্বোচ্চ প্রকাশ।
সুফিবাদের ভাষায়, পাপীও প্রভুর প্রেম থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়। তার অন্তরের গভীরে এখনও সেই ঐশী সত্তার আকর্ষণ রয়েছে। সে পথ হারিয়েছে, কিন্তু তার ফিরে আসার পথ বন্ধ হয়নি।
তাই কবির আবেদন—
হে প্রভু, তুমি যদি সত্যিই করুণাময় হও, তবে শুধু তোমার অনুগত ভক্তকে নয়, তোমার থেকে দূরে চলে যাওয়া মানুষকেও বুকে টেনে নাও।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল
সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৩৩৭ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাসে প্রকাশিত 'নজরুল গীতিকা' গ্রন্থে গানটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩১ বৎসর ৩ মাস।
- গ্রন্থ:
-
নজরুল-গীতিকা
- প্রথম সংস্করণ [ভাদ্র ১৩৩৭ বঙ্গাব্দ। ২ সেপ্টেম্বর ১৯৩০।
ওমর খৈয়াম-গীতি। ১। সিন্ধু কাফি-কাওয়ালী। পৃষ্ঠা ১]
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। তৃতীয় খণ্ড [বাংলা একাডেমী, ঢাকা
ফাল্গুন ১৪১৩/মার্চ ২০০৭] নজরুল
গীতিকা। ওমর খৈয়াম-গীতি। ১। সিন্ধু কাফি-কাওয়ালী। পৃষ্ঠা: ১৭১]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ
[ ফেব্রুয়ারি ২০১১ ] । নজরুল
ইনস্টিটিউট, ঢাকা। ১৮১২ সংখ্যক গান।
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। সুফিবাদী।
প্রার্থনা