বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: আমরা পানের নেশার পাগল
আমরা পানের নেশার পাগল, লাল শারাবে ভর গেলাস
পান-বেহুশে আয় রেখে ঐ সাকির বিলোল্ আঁখির পাশ॥
চাঁদ পিয়ালায় রবির কিরণ ঢালার মতো শারাব ঢাল,
ছায় না যেন দিনের আনন কস্তুরী-কেশ খোঁপার ফাঁস॥
শারাব খানার সদর-ঘরে বসো খানিক ধর্মাধিপ,
এই আনন্দ-ধারায় নেয়ে নাও ধুয়ে সব পাপের রাশ॥
মোমের বাতির মতো, সুফী কেঁদে গলাও আপনাকে!
এই বিষাদ এই ব্যথার পারে দাও আনন্দ ভর্-আকাশ॥
নূতন দিনের বধূ যদি আসে তোমার, খোশ-নসীব!
যৌতুক তায় দিও লিখে হাফিজেরি এই প্রেম-বিলাস॥
- ভাবসন্ধান: দীওয়ান-ই-হাফিজের নজরুল-কৃত অনুবাদ।
এই বিচারে এটি নজরুলে মৌলিক রচনা নয়। কিন্তু নজরুল-সঙ্গীত হিসেবে গানটি 'নজরুল-গীতিকা'তে
স্থান পেয়েছিল। একই ভাবে গানটি নজরুলের গান হিসেবে পরিচিত।
যে সাধনার দ্বারা স্রষ্টার প্রেমে মত্ত হওয়া যায়, সুফিবাদী দর্শনে তাই শারাব বা
মদ। আর যাঁর মাধ্যমে এই জ্ঞান লাভ করা যায়, তিনি হলেন সাকি। সাধারণ অর্থে সাকি
হলো- পদ পরিবেশনকারী তরুণী। হাফিজের গজলের জ্ঞানদাতা হলেন সাকি, যিনি খোদার
প্রেমের শরাব সাধকদের মধ্যে বিতরণ করেন। মদ পান করে, মানুষ যেমন বাহ্যজ্ঞানহীন
মাতালে পরিণত হন। খোদার প্রেমের শরাব পান করে, সাধকরা তেমনি সংসারের মোহ ত্যাগ
করে নেশাগ্রস্থের মতো স্রষ্টার প্রেমে বাহ্যজ্ঞানহারা হয়ে যান।
এই গানের শুরুতে সুফিবাদী সাধকরা নিজেদেরকে পরিচয় দিয়েছেন- পানের নেশায় পাগল।
অর্থাৎ আল্লাহর প্রেমের নেশায় তাঁরা পাগল। হাফিজা স্রষ্টাকে পাওয়ার
জ্ঞান-পাত্র পূর্ণ করার জন্য সতীর্থ সাধকদের আহ্বান করছেন এই গানে। বাহ্যজ্ঞান
সাধকরা জানেন এই জ্ঞান প্রদান করার ক্ষমতা রয়েছে তাঁদের ধর্মগুরু সাকির। খোদার
প্রেমের রঙিন নেশা খেলা করে ধর্মগুরুর দর্শনে। তাই খোদার প্রেমের মদ পান করে
বাহ্যজ্ঞানহীন সাকির কাছে পৌঁছাতে চান তাঁরা।
প্রতিফলিত সূর্যের আলো চাঁদ ধারণ করে, যেমন করে অন্ধকারের সে সূর্য কিরণ
ঢালে। তেমনি স্রষ্টার জ্যোতি্রময় জ্ঞানের আলো- গুরুর মাধ্যমে বিতরিত হয় সাধকদের
কাছে। সাকির কাছে তাঁদের একান্ত অনুরোধ তিনি যেন চাঁদ হয়ে খোদার প্রেমময়
জ্ঞানের আলো তাঁদের মধ্য বিতরণ করেন। তাঁদের একান্ত কামনা, পার্থিব মোহ
যেন তাঁদের আচ্ছন্ন না করে, যেন প্রেয়সীর কস্তুরি সুরভী মাখা প্রেমের খোঁপার
ফাঁদে জড়িয়ে না পড়েন তাঁরা।
যাঁরা ধর্মের অধিপতি হয়ে ভালো মন্দের বিচার করেন, তাঁদেরকে হাফিজ খোদার প্রেমের
শরাবখানার সদর ঘরে কিছুক্ষণ বসতে অনুরোধ করেছেন। যেন তাঁরা এই পবিত্র শরাবখানায়
এসে, তাঁদের সকল পাপপঙ্কিলতা ধুয়ে পরিশুদ্ধ হতে পারেন।
সুফিদেরকে হাফিজ বলছেন, তাঁরা যেন তাঁদের অতীতের কৃত অপরাধকে অনুশোচনায় ক্রন্দসী
হয়ে ওঠে। যেন জ্ঞানের আলোয় তাঁদের কঠোর হৃদয় মোমের মতো গলে যায়। এখানে মোমবাতি
হলো- কঠিন হৃদয়। যতক্ষণ না আগুনের স্পর্শ পায়, ততখন এই বাতি কঠিন দশায়
অজ্ঞানতাকে ধারণ করে। কিন্তু জ্ঞানের উত্তাপে এই বাতি যখন গলে পড়ে তখন খোদার
প্রেমময় জ্ঞানের আলো ছাড়িয়ে পড়ে। তাই পাপ-পঙ্কিল দৈন্যদশার ব্যথা বিসর্জন দিয়ে
হৃদয় আকাশকে প্রেমের আলোতে উদ্ভাসিত করার কথা বলা হয়েছে এই গানে। এর মধ্য দিয়ে
ধর্ম যদি প্রেমের নতূন বধূ বেশে হয়ে আসে, তাহলে তাই হবে সাধকের সৌভাগ্য।
তখন সাধক যেন তাঁর নব-প্রেমের নববধূকে হাফিজের এই গজল দান করেন নববধূর যৌতুক
হিসেবে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু
জানা যায় না। ১৩৩৭ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাসে প্রকাশিত 'নজরুল গীতিকা' গ্রন্থে
গানটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩১ বৎসর ৩ মাস।
- গ্রন্থ:
-
নজরুল-গীতিকা
- প্রথম সংস্করণ [ভাদ্র ১৩৩৭ বঙ্গাব্দ। ২ সেপ্টেম্বর ১৯৩০। দীওয়ান-ই
হাফিজ গীতি। ২। বাগেশ্রী-কাফি-কাহারবা। পৃষ্ঠা ১০ ]
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। তৃতীয় খণ্ড [বাংলা একাডেমী,
ঢাকা ফাল্গুন ১৪১৩/মার্চ ২০০৭] নজরুল গীতিকা। দীওয়ান-ই হাফিজ
গীতি। ১০।
বাগেশ্রী-কাফি-কাহারবা।
পৃষ্ঠা: ১৭৬]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। সুফিদর্শন।