তোরা যা লো সখি মথুরাতে দেখে আয় কেমন আছে শ্যাম।
তোরা কুবুজা-সখির কাছে নিসনে লো নিসনে রাধা নাম॥
তারে রাধার কথা স্মরণ করায়ে দিয়ে দিসনে লাজ দিস্নে ব্যথা।
বড় বাজবে ব্যথা –
মোর শ্যাম যদি লো পায় ব্যথা তা’র দ্বিগুণ ব্যতা বাজবে বুকে
সে অভাগিনী রাধায় ভু’লে যে দেশে হোক আছে সুখে! সখি গো –
দেখে তোরে বিন্দে লো, বৃন্দাবনের কথা গোবিন্দ শুধায় সে যদি? (সখি লো)
বলিস্ – হে মাধব, মাধবী-কুঞ্জ তব ভেঙে গেছে শুকায়েছে যমুনা নদী (সখা হে)
যমুনা শুকাইয়া শ্যাম তব শোকে হে,
লভিয়াছে আশ্রয় শ্রীরাধার চোখে হে।
ব্রজে বাজে না কো বেণু, চরে না কো ধেনু, ফুল-দোল রাস বন্ধ,
আর ময়ূর নাচে না তমাল-চূড়ায়, কেঁদে লুটায় যশোদা-নন্দ
বলিস্-তুমি আসার সাথে শ্যাম পু’ড়ে গেছে ব্রজদাম।
গেছে জ্বলিয়া পুড়িয়া
গেছে গোকুলের খেলাঘর অকুলে ভাসিয়া॥
বলিস্ – কি হবে শুনে সে কথা, তুমি রাখাল নও ত আর,
এখন তুমি রাজাধিরাজ, এখন তুমি কুবুজার॥
গানের শুরুতে রাধা সখিদের বিশেষভাবে সতর্ক করে দেন যেন তারা কুব্জার কাছে
তাঁর নাম উচ্চারণ না করে। তিনি চান না, কুরূপা কুব্জাকে সুরূপা করে তোলা
কৃষ্ণের বর্তমান সঙ্গিনী রাধার নাম শুনে ঈর্ষান্বিতা হোক। একই সঙ্গে তিনি এটাও
চান না যে, রাধার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে কৃষ্ণকে বিব্রত বা ব্যথিত করা হোক। কারণ
কৃষ্ণের সামান্য কষ্টও রাধার হৃদয়ে দ্বিগুণ বেদনা হয়ে ফিরে আসবে। তাই নিজের
দুঃখ গোপন রেখে তিনি বলেন, যদি অভাগিনী রাধাকে ভুলে গিয়ে কৃষ্ণ সুখে থাকেন, তবে
সেই সুখেই তাঁর তৃপ্তি।
এরপর রাধা বিন্দেকে ডেকে বলেন- যদি তাকে দেখে, যদি কৃষ্ণ বৃন্দাবনের কথা জানতে
চান, তবে তাঁকে জানাতে যে তাঁর অবর্তমানে বৃন্দাবনের মাধবীকুঞ্জ আজ বিরান হয়ে
গেছে, যমুনা যেন শুকিয়েআশ্রয় নিয়েছে রাধার দুই নয়নে। এই কাব্যিক উক্তির মাধ্যমে
কবি রাধার অবিরাম অশ্রুধারার ইঙ্গিত দিয়েছেন। কৃষ্ণ-বিরহে আজ আর বাঁশি বাজে না,
গাভীরা গোচারণে যায় না, রাসোৎসবের আনন্দ স্তব্ধ হয়ে গেছে। তমালশাখায় ময়ূরের
নৃত্য থেমে গেছে। মাতা যশোদা ও পিতা নন্দ শোকে কাতর হয়ে কেঁদে বেড়ান।
রাধা আরও জানান, কৃষ্ণহীন ব্রজধাম যেন ভস্মীভূত হয়ে গেছে; গোকুলের সকল আনন্দ,
ক্রীড়া ও প্রাণচাঞ্চল্য বিরহবেদনার স্রোতে ভেসে গেছে। কিন্তু এইসব দুঃখের সংবাদ
জানিয়ে কৃষ্ণকে ব্যথিত করতেও তিনি অনিচ্ছুক। তাই অভিমানভরে বলেন, বৃন্দাবনের
সংবাদ শুনে আর কী হবে? গোকুলের সেই রাখালরাজ আজ মথুরার রাজাধিরাজ হয়েছেন; তিনি
এখন আর বৃন্দাবনের কৃষ্ণ নন, কুব্জার স্নেহ ও অনুরাগের অধিকারী।
মূলত, এই গানে
রাধার প্রেমের মহত্ত্ব, আত্মবিসর্জনের মানসিকতা, অভিমানমিশ্রিত অনুরাগ এবং
কৃষ্ণ-বিরহের গভীর করুণ রস অপূর্বভাবে প্রকাশিত হয়েছে। প্রিয়জনের সুখকেই নিজের
সুখ বলে মেনে নেওয়ার যে নিঃস্বার্থ প্রেম, তারই এক অনন্য ও হৃদয়স্পর্শী চিত্র
এই গানে ফুটে উঠেছে।