বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: দ্বারকার সাগর তীর হতে সই
দ্বারকার সাগর তীর হতে সই।
মধুর মুরলী ধ্বনি ভেসে আসে ঐ॥
রহি রহি সেই সুর নিশিদিন বাজে;
মোদের সখির অন্তর মাঝে।
(সখি) সকলে আসিল সেই বাঁশুরিয়া কই॥
ভাবসন্ধান: এই গানে শ্রীকৃষ্ণের বাঁশির সুরকে কেন্দ্র করে তাঁর প্রতি
গোপীদের গভীর প্রেম, আকুলতা ও বিরহভাব উপস্থাপিত হয়েছে। মহেন্দ্রগুপ্তের রচিত
‘রুক্মিণী
মিলন’ নাটকের এই গানে বৈষ্ণব ভাবধারার শৃঙ্গার রসের বিরহভাবের
প্রকাশ ঘটেছে। এখানে কৃষ্ণ কেবল পৌরাণিক চরিত্র নন; তিনি প্রেম, সৌন্দর্য,
আনন্দ ও পরম আকর্ষণের প্রতীক। তাঁর মধুর মুরলীধ্বনি ভক্ত হৃদয়ে প্রেম, ভক্তি ও
মিলনের আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলে।
গানের সূচনায় সখীরা দ্বারকার সাগরতীর থেকে ভেসে আসা শ্রীকৃষ্ণের মধুর বাঁশির ধ্বনি
অনুভব করছে। ‘দ্বারকার সাগর তীর’ কৃষ্ণের অবস্থান ও ঐশ্বরিক উপস্থিতির প্রতীক।
দূর থেকে ভেসে আসা সেই বাঁশির সুর যেন কৃষ্ণের আগমনের বার্তা বহন করছে। সেই সুর
শ্রবণ করে সখীদের হৃদয় আনন্দ, বিস্ময় ও প্রেমের আবেগে পূর্ণ হয়ে উঠেছে।
গানের পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে, সেই
মুরলীধ্বনি কোনো ক্ষণিকের অনুভূতি নয়; তা দিন-রাত্রি সর্বক্ষণ সখীদের অন্তরে
অনুরণিত হয়। এখানে বাঁশির সুর কেবল সংগীতের ধ্বনি নয়, এটি কৃষ্ণপ্রেমের এক
দিব্য আহ্বান। যেমন ভক্ত হৃদয়ে আরাধ্যের স্মরণ সর্বদা জাগ্রত থাকে, তেমনি
কৃষ্ণের মুরলীধ্বনিও সখীদের চিত্তে চিরস্থায়ী প্রেম ও আকাঙ্ক্ষার সৃষ্টি করেছে।
গানের শেষাংশে সখীরা ব্যাকুল হয়ে জানতে
চায়—যে বাঁশুরিয়া তাঁর মধুর সুরে সকলের হৃদয় হরণ করেছেন, তিনি কোথায়? সবাই
তাঁর বাঁশির সুর শুনেছে, কিন্তু তাঁকে দেখতে পাচ্ছে না। এই আকাঙ্ক্ষার মধ্যে
বৈষ্ণব সাহিত্যের বিরহভাব
প্রকাশিত হয়েছে। প্রিয়তমের উপস্থিতির আভাস পেয়েও তাঁর সান্নিধ্য লাভ করতে না
পারার যে ব্যাকুলতা, সেটিই এই গানের মুখ্যভাব হয়ে উঠেছে।
রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে
সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি (পৌষ-মাঘ
১৩৪৫) মাসে, এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি
মহেন্দ্রনাথ গুপ্তের রচিত নাটক
'রুক্সিনী মিলন'-এর রেকর্ড প্রকাশ করেছিল। এই সময় নজরুলের বয়স
ছিল ৩৯ বৎসর ৭ মাস।
গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
১৯৪৬। পৃষ্ঠা: ৫৮৫]