বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: দুর্জয় অভিমান ত্যজ ত্যজ রাধে
দুর্জয় অভিমান ত্যজ ত্যজ রাধে
মুরলিধারী পায়ে ধরে সাধে॥
মানের গুণে তুই গুণময়ী হয়ে লো ভুল দেখিস বুঝি সবই।
স্বচ্ছ শ্যাম তনু দর্পণে দেখিছিলি রাধা আপনারই ছবি।
(সে যে ছায়া রাধা তারেই আপনার মায়া
মহামায়াময়ী মায়া-রাধা। সে যে ছায়া-রাধা॥)
এই বৃন্দাবন রূপ তোরই যে স্বরূপ তোরই রূপ ললিতা বিশাখা।
তুই পীতাম্বর কিশোরের বেণুকা তুই বনমালা, তুই শিখি পাখা।
শ্যামের চরণে তুই নূপুর রুনুঝুনু ভ্রমরী তুই তাঁর চরণ-কমলে
করুণ-বর্ণা হয়ে তুই যে চন্দ্রা হল ভুলাইলি মোরে কোন ছলে।
(আজ সব কথা বল্ব তোর লীলার আজ সব কতা বল্ব।
হাটের মাঝে ভাঙব হাঁড়ি, সব কতা বল্ব।
তুই আপনি নাচিস কৃষ্ণে নাচাস নাচাস্ গোপিনীদের সব কথা বল্ব।)
নিত্য প্রেমময়ী তুই নিত্য প্রেমময়ের সাথে খেলিস যে খেলা,
(সবই জানি ব্রজ-রানী সবই জানি গো।
তোর প্রেমের এক কণা পেয়ে, সবই জানি গো।)
দিনে তুই কুণ্ঠিতা কূলবধু নিশীথে নিলাজ সাথে নিলাজ খেলা।
যেমন নিলাজ শ্যাম তেমনি তোর অপরূপ লীলা।
যে বুঝেছে তোর খেলা প্রেমে সে গলে গেছে
যে বোঝেনি হয়ে আছে পাষাণ শিলা॥
- ভাবসন্ধান: গানটিতে রাধাকে প্রেম, মায়া ও ভক্তির পরমশক্তি এবং
কৃষ্ণকে সেই প্রেমের চিরন্তন আশ্রয়রূপে উপস্থাপন করা হয়েছে। রাধা-কৃষ্ণের
অভেদ সত্তা, প্রেমের অলৌকিক রহস্য এবং বৈষ্ণব ভাবধারার গভীর আধ্যাত্মিক তত্ত্বই
এ গানের মূল প্রতিপাদ্য।
গানের শুরুতে কবি রাধার প্রতি সম্বোধন করে তাঁর অভিমান ত্যাগের আহ্বান জানিয়েছেন এবং দেখিয়েছেন যে রাধা ও কৃষ্ণ প্রকৃতপক্ষে পৃথক নন, বরং একই চিরন্তন প্রেমসত্তার দুই রূপ।
রাধার মান বা অভিমানকে কেন্দ্র করে কৃষ্ণের আকুলতা চিত্রিত হয়েছে। কবি বলেন,
রাধা নিজের মহিমায় এতটাই মুগ্ধ যে তিনি নিজের প্রতিবিম্বকেও অন্য কিছু বলে ভুল
করছেন। প্রকৃতপক্ষে যে 'ছায়া-রাধা'কে তিনি পৃথক বলে ভাবছেন, তা তাঁরই
মায়াশক্তির প্রকাশ। এখানে রাধাকে 'মহামায়াময়ী মায়া' রূপে কল্পনা করা হয়েছে।
গানটির পরবর্তী অংশে- কবি রাধার সর্বব্যাপী রূপ বর্ণনা করেছেন। বৃন্দাবনের
প্রতিটি সৌন্দর্য, প্রতিটি সখী, এমনকি কৃষ্ণের বেণু, বনমালা ও ময়ূরপুচ্ছ
পর্যন্ত রাধারই প্রকাশ। অর্থাৎ কৃষ্ণকে ঘিরে যে লীলাজগত, তার প্রতিটি উপাদান
রাধাময়। কৃষ্ণের চরণে নূপুর হয়ে, ভ্রমর হয়ে, প্রেম হয়ে রাধাই বিরাজমান।
কৃষ্ণপ্রেমে রাধার প্রতিদ্বন্দ্বী চন্দ্রা, সেও রাধা। এই রূপে ব্রজবাসীকে
ভুলিয়েছিল সে। বৈষ্ণব দর্শনের 'রাধা-কৃষ্ণ অভেদ' তত্ত্ব এখানে সুস্পষ্টভাবে
প্রতিফলিত হয়েছে।
কবি রসিকতার ভঙ্গিতে রাধার গোপন লীলার কথাও প্রকাশ করতে চান। তিনি বলেন, রাধাই
কৃষ্ণকে নাচান, আবার গোপীদেরও নাচান। এই উক্তির মাধ্যমে রাধাকে প্রেমশক্তির
সর্বোচ্চ অধিষ্ঠাত্রী হিসেবে দেখানো হয়েছে। কৃষ্ণের লীলার অন্তর্নিহিত শক্তি
যে রাধা, সেই ভাবই এখানে প্রকাশ পেয়েছে।
গানটির শেষাংশে রাধাকে 'নিত্য প্রেমময়ী' এবং কৃষ্ণকে 'নিত্য প্রেমময়' নামে
অভিহিত করা হয়েছে। তাঁদের প্রেম কোনো পার্থিব সম্পর্ক নয়; এটি চিরন্তন,
আধ্যাত্মিক ও অনন্ত প্রেমের প্রতীক। দিনের বেলায় লজ্জাশীলা কুলবধূ এবং নিশীথে
প্রেমলীলায় মগ্ন রাধার এই দ্বৈত রূপ প্রেমের রহস্যময়তাকে আরও গভীর করেছে। কবি
মনে করেন, যে ব্যক্তি এই প্রেমলীলা উপলব্ধি করতে পেরেছে, সে প্রেমে গলে গেছে;
আর যে এর মর্ম উপলব্ধি করতে পারে নি, সে পাষাণের মতো কঠোরই রয়ে গেছে।
- রচনাকাল ও স্থান:গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই নভেম্বর (শনিবার, ২৩ কার্তিক ১৩৪৭), কলকাতা বেতারকেন্দ্র থেকে অভিমানিনী প্রথম প্রচারিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪১ বৎসর ৫ মাস।
- গ্রন্থ:
নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ১৯৪৯। গীতিচিত্র: 'অভিমানিনী'। পৃষ্ঠা: ৩৭৯-৩৮০]
- বেতার:
- অভিমানিনী
(গীতিচিত্র)।
- প্রথম প্রচার: কলকাতা বেতারকেন্দ্র-ক, তৃতীয় অধিবেশন।
৯ নভেম্বর ১৯৪০ (শনিবার, ২৩ কার্তিক ১৩৪৭)। রাত্রি: ৮.০০-৮.৪০ মিনিট]
- সূত্র:
- বেতার জগৎ। ১১শ বর্ষ, ২১ সংখ্যা। পৃষ্ঠা: ১১৬২
- The
Indian-listener 1940, Vol V, No 21. page 1665
- দ্বিতীয় প্রচার: কলকাতা বেতারকেন্দ্র-ক, তৃতীয় অধিবেশন। ২৮ জুন ১৯৪১ (শনিবার
১৩ আষাঢ়। ১৩৪৮)। রাত ৮.০০-৮.৩৯ মিনিট
- সূত্র: বেতার জগৎ। ১২শ বর্ষ, ১২ সংখ্যা। পৃষ্ঠা: ৭১৪
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। রাধাকৃষ্ণ লীলা।
প্রণয়