বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: নওল শ্যাম তনু গোরীর পরশে
নওল শ্যাম তনু গোরীর পরশে গো গলে পড়ে
নবনীর প্রায়।
কোমল শিরীয় ফুল ঝরিয়া পড়ে যেন মৃদুল আলতো হাওয়ায়॥
দুহু তনু থর থর গরগর গরবে প্রেম’রস আলসে,
মাধবী শ্রী যেন লতা হয়ে জড়াল মাধবে লালসে।
(রাই শ্যাম জড়াল; পাষাণ শিলার বুকে বিগলিত হয়ে যেন
চন্দন, গড়াল,)
কোলের হরিণ ফেলে আকাশের চাঁদ নীল উৎপল নিল কোলে
হরিদ্রা রঙে হরি অঙ্গ আর্দ্র্য হয়ে পীত বসন রূপে
দোলে,
(দোলে দোলে গো – প্রীতির রঙে পীত বসন হ’য়ে হরি
দোলে দোলে গো।)
আঁধারের কোলে হেন রসের প্রদীপ
কালো কদম গাছে যেন ফুটিয়াছে নীপ
রতন দেউল যেন নীলার বিগ্রহ – রাই হৃদে কৃষ্ণ কিশোর
কৃষ্ণ ফাঁদ যেন ধরেছে সোনার চাঁদে চোর আজি ধরিয়াছে
চোর।
(চোরে চোর ধরেছে গো – ননী-চোর আজি বাঁশি চোর ধরেছে
গো
বসন-চোরা আজি নূপুর চোর ধরেছে গো)
পীত ধড়া বিগলিত নীল সাড়ি বিজড়িত সিন্দুরে চন্দনে
মাখামাখি গো
কে যে শ্যাম কে যে রাই চেনার উপায় নাই,
(শ্রী) চরণ দেখিয়া শুধু চেনে এ আঁখি গো।
- ভাবসন্ধান: এই গানে রাধা ও শ্রীকৃষ্ণ -এর অপূর্ব প্রেমমিলন,
রূপমাধুর্য এবং প্রেমের আত্মবিস্মৃত অবস্থার চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। বৈষ্ণব ভাবধারার
মাধুর্য রসে রচিত এই গানে
রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকে জাগতিক প্রেমের ঊর্ধ্বে এক গভীর আধ্যাত্মিক মিলনরূপে প্রকাশ
করা হয়েছে।
গানের শুরুতেই কবি রাধাকৃষ্ণ-লীলার মিলনাত্মক
শৃঙ্গার রসকে অপূর্ব রূপকল্পের মাধ্যমে চিত্রিত করেছেন। রাধার স্পর্শে কৃষ্ণের
শ্যাম দেহ যেন গলিত নবনীতের মতো কোমল হয়ে উঠেছে। আবার কৃষ্ণের সান্নিধ্যে রাধার
সৌন্দর্যও প্রেমের আবেশে আরও মাধুর্যময় হয়ে প্রকাশ পেয়েছে। তাঁদের প্রেমমিলন এতই
কোমল ও নিবিড় যে, তা যেন মৃদু বাতাসে শিরীষ ফুল ঝরে পড়ার মতো স্নিগ্ধ ও অনুভবময়।
প্রেমের গভীর আবেশে রাধা ও কৃষ্ণের দেহ-মন
শিহরিত হয়ে উঠেছে। কবি তাঁদের মিলনকে মাধবী লতার মাধবকে আকুলভাবে জড়িয়ে ধরার সঙ্গে
তুলনা করেছেন। এখানে প্রেমিক ও প্রেমিকার পৃথক সত্তা যেন প্রেমের আবেগে বিলীন হয়ে
একাত্ম হয়ে গেছে। কবি অনুভব করেছেন, প্রেমের স্পর্শে কঠিন হৃদয়ও কোমল হয়ে ওঠে।
রাধা-কৃষ্ণের প্রেম এমনই শক্তিশালী, যা সমস্ত কঠোরতা দূর করে মাধুর্য ও আনন্দে
পরিপূর্ণ করে।
কৃষ্ণের নীল শ্যাম রূপ ও রাধার গৌর
সৌন্দর্যের মিলনে এক অনন্য রূপের সৃষ্টি হয়েছে। কৃষ্ণের পীতবসন যেন রাধার প্রেমের
রঙে রঞ্জিত হয়ে উঠেছে। প্রেমের আবেশে কৃষ্ণের সমগ্র সত্তাই যেন রাধাময় হয়ে প্রকাশ
পেয়েছে।
কৃষ্ণের শ্যাম রূপ অন্ধকারের মধ্যে জ্বলে ওঠা
প্রেমের দীপশিখার মতো। যেমন অন্ধকারের বুকে প্রদীপ আলো ছড়ায়, তেমনি কৃষ্ণের
শ্যামবর্ণ রূপের মধ্যেও অপূর্ব সৌন্দর্য ও আনন্দের দীপ্তি প্রকাশিত হয়েছে। কবির
কল্পনায় রাধার হৃদয়ই যেন কৃষ্ণের রত্নমন্দির, যেখানে কৃষ্ণ চিরপ্রতিষ্ঠিত। কৃষ্ণ
রাধার হৃদয়ের পরম আরাধ্য।
গানে বৈষ্ণব সাহিত্যের পরিচিত ‘চোর’ ভাবের সুন্দর প্রয়োগ
ঘটেছে। কৃষ্ণ যেমন মাখনচোর, বাঁশিচোর, তেমনি রাধাও তাঁর প্রেমের চোর। তাঁরা উভয়েই
পরস্পরের হৃদয় হরণ করেছেন। এই প্রেমের সম্পর্কে কে জয়ী আর কে পরাজিত—তার কোনো বিচার
নেই; প্রেমিক ও প্রেমিকা দুজনেই পরস্পরের কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করেছেন।
গানের শেষাংশে রাধা ও কৃষ্ণের রূপ একাকার হয়ে
যাওয়ার অপূর্ব চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। কৃষ্ণের পীতবসন, রাধার নীল শাড়ি, সিঁদুর ও
চন্দনের মিলনে এমন এক অনির্বচনীয় রূপের সৃষ্টি হয়েছে যে, কে শ্যাম আর কে রাই—তা
বোঝার উপায় থাকে না। কেবল তাঁদের চরণ দেখেই ভক্ত হৃদয় তাঁদের পরিচয় লাভ করতে পারে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের ১২ জানুয়ারি (রবিবার ২৮ পৌষ ১৩৪৭) কলকাতা বেতার থেকে 'কলহ' নামক পালা-কীর্তন প্রচারিত হয়েছিল। এই পালা-কীর্তনে এই গানটি ব্যবহৃত হয়েছিল। এই সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল
৪১ বৎসর ৭ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট, ফেব্রুয়ারি ২০১২)।
গান সংখ্যা ১৯৫৬
- বেতার:
কলহ। পালা-কীর্তন
।
কলকাতা-ক। তৃতীয় অধিবেশন। সময়: ৭.৪০-৮.৩৯ [১২ জানুয়ারি ১৯৪১ (রবিবার ২৮ পৌষ ১৩৪৭)।
[সূত্র:
- বেতার জগৎ।১২শ বর্ষ ১ম সংখ্যা। ১লা জানুয়ারি ১৯৪১, (বুধবার, ১৭ পৌষ ১৩৪৭)]
পৃষ্ঠা: ৪৮
- The
Indian-listener [1940, Vol VI, No 1. page 79
- রেকর্ড: হিন্দুস্তান [মে ১৯৪১ (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৮)। এইচ ৯০১ । শিল্পী: সুপ্রভা
ঘোষ।]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। রাধা-কৃষ্ণ লীলা।
প্রণয়