বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: নাচে গৌরীদিবা হিম-গির-দুহিতা
নাচে গৌরীদিবা হিম-গির-দুহিতা।
নাচে দীপ্তিমতী নাচে উমা তপতী নাচে রে চির-আনন্দিতা॥
গিরি-পাষাণ অটল করে টলমল
গলিয়া তুষার ঝরে নির্ঝর জল
তার চরণ-ছন্দ-চকিতা॥
তার নাচের মায়ায় প্রাণ পায় জড় জীব
ভুলি’ বিরহ সতীর জাগে যোগীন্দ্র শিব,
জাগে কুসুম-কলি গাহে বিহগ-অলি,
তার রূপে ত্রিদিব হ’ল দীপান্বিতা॥
-
ভাবসন্ধান: এই গানে দেবী পার্বতীর নৃত্যকে কেন্দ্র করে প্রকৃতি, জীবন, প্রেম এবং চিরআনন্দের এক মনোমুগ্ধকর চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। এখানে দেবী কেবল হিমালয়ের কন্যা নন, তিনি সৌন্দর্য, শক্তি, প্রেম ও নবজীবনের চিরন্তন উৎস। তাঁর নৃত্যের প্রভাবে সমগ্র বিশ্বপ্রকৃতি প্রাণবন্ত, সজীব ও আনন্দময় হয়ে ওঠে।
এই গানে মূলত নানা রূপকল্পের মধ্যে দেবী পার্বতীর বন্দনা করা হয়েছে।
গানের শুরুতে কবি দেবীকে গৌরীদিবা, হিমগিরিদুহিতা, উমা, তপতী এবং চির-আনন্দিতা নামে সম্বোধন করেছেন।
। এখানে গৌরীদিবা
(দেবী গৌরী, অর্থাৎ দেবী পার্বতী) আর
হিম-গির-দুহিতা
( হিমালয় পর্বতের কন্যা)। 'উমা' নামটি ব্যবহৃত হয়েছে তাপসিনী পারর্বতীকে। পুরাণ মতে পার্বতী যখন
শিবকে কঠোর তপস্যা করে শিবকে স্বামীরূপে লাভ করতে সংকল্প করেন, তখন তাঁর মা মেনকা কন্যার কষ্ট দেখে বলেন—"উ মা" (অর্থাৎ, "ও মা, এমন কঠোর তপস্যা করো না")। এই কাহিনির ভিত্তিতে তাঁর নাম উমা বলে ব্যাখ্যা করা হয়। যদিও এটি ব্যুৎপত্তিগত নয়, তবু পুরাণপ্রসিদ্ধ ব্যাখ্যা।
পার্বতীকে তপতী নামে অভিহিত করা হয়েছে- তেজোময়ী, তপস্যার মহিমায় উজ্জ্বল দেবী
হিসেবে। মূলত
এই বিভিন্ন নামে তাঁর সৌন্দর্য, পবিত্রতা, তপস্যা, মাতৃত্ব ও চিরআনন্দময় স্বরূপের পরিচয় ফুটে উঠেছে। তিনি আনন্দে নৃত্য করছেন, আর সেই নৃত্য কেবল একটি ব্যক্তিগত লীলা নয়; তা সমগ্র বিশ্বজগতের আনন্দ ও শক্তির প্রতীক।
দেবীর নৃত্যের প্রভাবে অচল হিমালয়ের পাষাণও টলমল করে ওঠে এবং জমাট বরফ গলে নির্ঝরের স্রোতধারা বয়ে যায়। অর্থাৎ, তাঁর প্রাণস্পর্শে জড় ও নিষ্প্রাণ প্রকৃতিও সজীব হয়ে ওঠে। এই চিত্রকল্পের মাধ্যমে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, দেবীশক্তি স্থবিরতা ভেঙে নতুন গতি, সৃষ্টিশীলতা ও জীবনধারার সূচনা করে।
পরবর্তী অংশে দেবীর নৃত্যের অলৌকিক প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়েছে। তাঁর নৃত্যের মায়ায় জড় পদার্থেও প্রাণের সঞ্চার ঘটে। সতীর বিরহে গভীর ধ্যানে নিমগ্ন যোগীশ্বর শিবও সেই বিরহ ভুলে পুনরায় জেগে ওঠেন। একই সঙ্গে ফুলের কুঁড়ি প্রস্ফুটিত হয়, পাখি ও ভ্রমর গানে মুখরিত হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, প্রেম, সৌন্দর্য ও জীবনের যে নবজাগরণ, তার উৎস দেবীর ঐশ্বরিক শক্তি। তাঁর রূপ ও লাবণ্যে স্বর্গলোকও আলোকোজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
-
রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি (পৌষ-মাঘ ১৩৪৪) মাসে, এইচএমভি শ্রীমতী রেণুকা সিংহের কণ্ঠে গানটির প্রথম রেকর্ড করেছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ৩৮ বৎসর ছিল ৭ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২]। গান সংখ্যা
১৯৭২।
পৃষ্ঠা: ৫৯৩
- রেকর্ড: এইচএমভি [জুন ১৯৪১ (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৩৪৮)]। এন ১৭০২। শিল্পী: সীতা দেবী।
- সুরকার:
কাজী নজরুল ইসলাম
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
আহসান
মুর্শেদ [নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি,
পঁয়তাল্লিশতম খণ্ড, কবি নজরুল ইসলাম
ইনস্টিটিউট। জুন ২০১৮] গান সংখ্যা ১৬। পৃষ্ঠা: ৬৫- ৬৬ [নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দু ধর্ম। শাক্ত। পার্বতী। বন্দনা
- সুরাঙ্গ: ভজন
- তাল: কাহারবা
- গ্রহস্বর: র