বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: ব্রজের দুলাল ব্রজে আবার আসবে ফিরে কবে
ব্রজের দুলাল ব্রজে আবার আসবে ফিরে কবে?
জাগবে কি আর ব্রজবাসী ব্যাকুল বেণুর রবে?
বাজবে নূপুর তমাল-ছায়ায়
বেইবে উজান হৃদ্-যমুনায়,
অভাগিনী রাধার কি আর তেমন সুদিন হবে? সখী গো!
গোঠে নাহি যায় রাখালেরা আর লুটায়ে কাঁদে পথে ধূলায়,
ধেনু ছুটে যায় মথুরা পানে না হেরি গোঠে রাখাল-রাজায়।
উড়িয়া গিয়াছে শুক-সারি পাখি শুনি না কৃষ্ণ-কথা (আর),
শ্যাম-সহকার তরুরে না-হেরি শুকালো মাধবী-লতা।
শ্যাম বিনে নাই সে শ্যাম-কান্তি, শুকায়েছে সব।
কদম তমাল তরু পল্লব হাসি উৎসব শুকায়েছে সব! সখি গো-
চির-বসন্ত ছিল যথা আজ সেথা শূন্যতা হাহাকার রবে কাঁদে শ্যাম (হে)
ললিতা বিশাখা নাই, নাই চন্দ্রাবলী নাই ব্রজে শ্রীদাম সুদাম। (সখী গো)
- ভাবসন্ধান:এই গানে শ্রীকৃষ্ণের মথুরাগমনের পর বৃন্দাবনের গভীর শূন্যতা, রাধার বিরহ এবং সমগ্র ব্রজবাসীর হৃদয়বিদারক বেদনার চিত্র অঙ্কন করেছেন। এখানে কেবল একজন প্রিয়জনের অনুপস্থিতির কথা নয়; বরং কৃষ্ণের বিদায়ে সমগ্র বৃন্দাবনের প্রাণশক্তি, আনন্দ ও সৌন্দর্য যেন নিঃশেষ হয়ে গেছে।
গানের শুরুতেই এক সখী ব্যাকুল হয়ে প্রশ্ন করেন- ব্রজের দুলাল কৃষ্ণ আবার কবে বৃন্দাবনে ফিরে আসবেন? তাঁর ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই কি আবার বাঁশির সুরে ব্রজবাসীর প্রাণ জেগে উঠবে? তমালছায়ায় কি আবার নূপুরের ধ্বনি বাজবে? হৃদয়-যমুনা কি আবার প্রেমের স্রোতে উজান বয়ে যাবে? আর অভাগিনী রাধার জীবনে কি সেই আনন্দময় দিন আর কোনোদিন ফিরে আসবে? এই প্রশ্নগুলোর মধ্যে উত্তর নেই; আছে শুধু দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও গভীর আকুলতা।
গানটির পরবর্তী অংশে উপস্থাপন করেছেন, কৃষ্ণের অনুপস্থিতিতে ব্রজের দৈনন্দিন
স্থবির জীবনযাত্রার নিপূণ চিত্র থেমে গেছে। সেখানে রাখালেরা আর গোঠে যায় না; তারা পথের ধুলায় লুটিয়ে কাঁদে। গাভীরাও গোঠে থাকতে চায় না; তারা মথুরার দিকে ছুটে চলে, যেন তাদের প্রিয় রাখাল-রাজাকে খুঁজছে। এখানে পশুরাও কৃষ্ণবিরহে কাতর- এই কল্পনার মাধ্যমে কবি দেখিয়েছেন, কৃষ্ণ কেবল মানুষের নয়, সমগ্র প্রাণিজগতের প্রাণকেন্দ্র।
এরপর প্রকৃতির রূপান্তরের কথা বলা হয়েছে। শুক-সারি পাখি উড়ে গেছে, কৃষ্ণকথার গান আর শোনা যায় না। শ্যামবর্ণ সহকার গাছের প্রাণ নেই, মাধবীলতা শুকিয়ে গেছে। কদম, তমাল, পল্লব—সবুজ প্রকৃতির সমস্ত হাসি, উৎসব ও সৌন্দর্য যেন লোপ পেয়েছে। এখানে প্রকৃতির এই বিবর্ণতা আসলে রাধা ও ব্রজবাসীর অন্তরের শূন্যতারই প্রতীক। কৃষ্ণবিহীন বৃন্দাবনে বসন্তও আর বসন্ত নয়।
গানটির শেষাংশে কবি আক্ষেপে বলেন, যেখানে একদিন চিরবসন্ত বিরাজ করত, আজ সেখানে কেবল শূন্যতা ও হাহাকার। ললিতা, বিশাখা, চন্দ্রাবলী, শ্রীদাম, সুদাম—কৃষ্ণলীলার সেই আপনজনদেরও আর দেখা যায় না। অর্থাৎ কৃষ্ণকে কেন্দ্র করে যে প্রেম, বন্ধুত্ব ও আনন্দের সমাজ গড়ে উঠেছিল, তাঁর বিদায়ে সেই সমাজও ভেঙে পড়েছে। বৃন্দাবনের অস্তিত্ব যেন কৃষ্ণের সঙ্গেই অবিচ্ছেদ্য ছিল।
- রচনাকাল ও স্থান:
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে
সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ
(ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৪০) মাসে মেগাফোন
রেকর্ড কোম্পানি থেকে এই গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল।
এই সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৩৪ বৎসর ৯ মাস।
- গ্রন্থ:
-
গীতি-শতদল।
- প্রথম সংস্করণ [বৈশাখ ১৩৪১। এপ্রিল ১৯৩৪। কীর্তন]
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংকলন। পঞ্চম খণ্ড। বাংলা একাডেমী। ঢাকা। জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮ মে, ২০১১। গীতি-শতদল।
কীর্তন। গান সংখ্যা
৭৭। পৃষ্ঠা ৩২৭]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
২০৩৬। পৃষ্ঠা: ৬১২]
- রেকর্ড: মেগাফোন
[ মার্চ ১৯৩৪ (ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৪০)] জেএনজি ১০২। শিল্পী:
শোভারাণী গুপ্তা
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ
- সুরাঙ্গ: কীর্তনাঙ্গ