বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম:
মাকে আদর করে কালী বলি সে সত্যি কলো নয়
মাকে আদর করে কালী বলি সে সত্যি কলো নয়
রে।
তার ঈষৎ হাসির এক ঝলকে জগৎ আলো হয় রে,
ত্রি-জগৎ আলো হয় রে॥
(কালো নয় কালো নয়, চরণে যার মহাকাল
পায়ের নথে চাঁদের মালা, কালো নয় কালো নয়)
সত্যি কালো নয় রে॥
(আমরা) আপনভোলা পাগলী গিরিবালা
মুণ্ডামালায় মনে করে কুন্দফুলের মালা;
(রয়) মরা-ছেলে বুকের ধ’রে শ্মশানে তন্ময় রে,
রয় শ্মশানে তন্ময় রে।
শ্মশানে সে থাকে ব’লে ভয়ঙ্করী নয় রে!
(ভবের) খেলা-শেষে সকলেরে দেয সে বরাভয় রে॥
(সে) মারে যাকে, মালা করে তারেও পরে রয় রে!
(সেই) তামসিকও যায়রে তরে (মাকে) তামসী যে কয় রে॥
-
ভাবসন্ধান: এই গানটির অন্তর্নিহিত ভাব হলো—দেবী কালীর বাহ্যত ভয়ংকর ও কৃষ্ণবর্ণ রূপের অন্তরালে তাঁর অপরিসীম সৌন্দর্য, মাতৃস্নেহ, করুণা ও মুক্তিদাত্রী সত্তাকে উপলব্ধি করা। কবি প্রচলিত ধারণাকে ভেঙে দিয়ে বলতে চেয়েছেন—মাকে আমরা আদর করে ‘কালী’ বলি বটে, কিন্তু তিনি প্রকৃত অর্থে অন্ধকার বা ভয়ংকর নন; তিনি জগতের পরম আলোকস্বরূপিণী।
গানের শুরুতেই কবি কালীর কালো রূপের মহিমা উপস্থাপন করে বলেছেন—
“মাকে আদর করে কালী বলি, সে সত্যি কালো নয় রে।”
এখানে ‘কালো’ শব্দটি বাহ্যিক বর্ণের পাশাপাশি অন্ধকার, অশুভ বা ভয়ংকরতার ধারণাকেও নির্দেশ করে। কবি বলছেন, দেবীর গাত্রবর্ণ কৃষ্ণবর্ণ হলেও তিনি অন্ধকারের প্রতীক নন। বরং—
“তার ঈষৎ হাসির এক ঝলকে জগৎ আলো হয় রে।”
তাঁর সামান্য হাসিতেই সমগ্র জগৎ, এমনকি ত্রিলোক আলোকিত হয়ে ওঠে। অর্থাৎ তিনি নিজেই চৈতন্য, জ্ঞান ও আলোর উৎস।
“চরণে যার মহাকাল”—এই কথায় দেবীর কালাতীত ও সর্বশক্তিময় রূপ প্রকাশিত হয়েছে। ‘মহাকাল’ স্বয়ং তাঁর পদতলে অবস্থান করেন। অর্থাৎ যিনি কাল বা সময়কেও অতিক্রম করেছেন, তাঁকে সাধারণ অন্ধকার বা কালিমার সঙ্গে তুলনা করা যায়
না। দেবীর সৌন্দর্যের উপমা হিসেবে বলেছেন- “পায়ের নথে চাঁদের মালা”—চাঁদের শুভ্র আলোও যেন তাঁর অলংকারমাত্র। এই চিত্রকল্পের দ্বারা কবি বোঝাতে চেয়েছেন—আলো তাঁর থেকে পৃথক কোনো শক্তি নয়; জগতের আলোও তাঁর সৌন্দর্যের অংশ।
গানের পরবর্তী অংশে দেবীর এক অনাবিল, স্বতঃস্ফূর্ত ও সংসারবিমুখ মাতৃরূপ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি মুণ্ডমালা ধারণ করলেও কবির চোখে তা ভয়ের বস্তু নয়। মায়ের কাছে সেই মুণ্ডমালাও যেন কুন্দফুলের মালা।
এর গভীর অর্থ হলো—দেবীর দৃষ্টিতে জীবন-মৃত্যুর বিভেদ ক্ষীণ। যা মানুষের কাছে ভয়ংকর, মাতৃসত্তার কাছে তা বিশ্বলীলার একটি অংশমাত্র।
গানের “মরা-ছেলে বুকের ধ’রে শ্মশানে তন্ময়”—এই চিত্রটি অত্যন্ত গভীর মাতৃভাবের প্রকাশ। মা তাঁর মৃত সন্তানকেও পরিত্যাগ করেন না; তাঁকে বুকের মধ্যে ধারণ করেন।
তাই তিনি শ্মশানে থাকেন বলে ভয়ংকরী নন। বরং শ্মশান হলো জীবনের শেষ সীমা, যেখানে মানুষের সমস্ত অহংকার, সম্পদ ও পরিচয় বিলীন হয়ে যায়। সেই শেষ সীমাতেও মা উপস্থিত আছেন। অর্থাৎ জীবনের শুরু থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সন্তান কখনো তাঁর আশ্রয়ের বাইরে নয়।
মৃত্যুর পরেও মায়ের বরাভয়
“ভবের খেলা-শেষে সকলেরে দেয় সে বরাভয়”—সংসারের খেলায় জীবন শেষ হলে মা সকলকে ভয়মুক্তির আশীর্বাদ দেন। মৃত্যু তাই এখানে শুধু ভয়ের বিষয় নয়; এটি মায়ের কাছে ফিরে যাওয়ার একটি পথ।
দেবী যাঁকে ‘মারেন’, তাঁকেও তিনি নিজের কাছ থেকে দূরে ঠেলে দেন না—
“সে মারে যাকে, মালা করে তারেও পরে রয় রে।”
এখানে মুণ্ডমালার গভীর প্রতীকী অর্থ প্রকাশিত হয়েছে। দেবীর সংহার প্রতিহিংসা নয়; তাঁর হাতে ধ্বংসও শেষ পর্যন্ত তাঁর মধ্যেই আশ্রয় লাভ করে। তিনি অশুভকে বিনাশ করেন, কিন্তু অস্তিত্বকে পরিত্যাগ করেন
না। শেষ পঙ্ক্তিতে কবি বলেছেন—
“সেই তামসিকও যায়রে তরে, মাকে তামসী যে কয় রে।”
যাঁরা দেবীর বাহ্যরূপ দেখে তাঁকে তামসিক বা অন্ধকারের শক্তি বলে মনে করেন, তাঁরাও শেষ পর্যন্ত তাঁরই আশ্রয় লাভ করেন। কারণ মা সকলের মা—জ্ঞানের, অজ্ঞানের, সজ্জনের ও পাপীরও।
এখানে কবি বলতে চেয়েছেন, দেবীর প্রকৃত স্বরূপ বাহ্যচক্ষে ধরা যায় না। তাঁর শ্মশানবাস, মুণ্ডমালা, কৃষ্ণবর্ণ রূপ ও সংহারশক্তি দেখে তাঁকে বিচার করলে তাঁর মঙ্গলময় মাতৃসত্তাকে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।
-
রচনাকাল ও স্থান:
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু
জানা যায় না। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর
(ভাদ্র- আশ্বিন ১৩৪৬), মাসে, এইচএমভি রেকর্ড
কোম্পানি থেকে গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪০ বৎসর ৩ মাস।
- গ্রন্থ:
নজরুল-সংগীত সংগ্রহ [রশিদুন্ নবী সম্পাদিত। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট। তৃতীয় সংস্করণ দ্বিতীয় মুদ্রণ, আষাঢ় ১৪২৫। জুন
২০১৮। গান ২০৬৬। পৃষ্ঠা ৬২২]
- রেকর্ড: এইচএমভি [সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ (ভাদ্র- আশ্বিন ১৩৪৬)।
এন ১৭৩৫০। শিল্পী: মৃণালকান্তি ঘোষ। সুর: কমল দাশগুপ্ত ]
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। শাক্ত। দুর্গা। মাতৃরূপা
-
সুরাঙ্গ: কালী-কীর্তন
- তাল:
তালফেরতা [দাদরা-কাহারবা]
- গ্রহস্বর: ণ