বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম : মাগো আমি তান্ত্রিক নই
মাগো আমি তান্ত্রিক নই তন্ত্র মন্ত্র
জানি না মা।
আমার মন্ত্র যোগ-সাধনা ডাকি শুধু শ্যামা শ্যামা॥
যাই না আমি শ্মশান মশান
দিই না পায়ে জীব বলিদান,
খুঁজতে তোকে খুজি না মা অমাবস্যা ঘোর ত্রিযামা॥
ঝিল্লী যেমন নিশীথ রাতে একটানা সুর গায় অবিরাম
তেমনি করে নিত্য আমি জপি শ্যামা তোমারি নাম।
শিশু যেমন অনায়াসে
জননীরে ভালোবাসে,
তেমনি সহজ সাধনা মোর তাতেই পাব তোর দেখা মা॥
- ভাবসন্ধান: এই গানটির মূল ভাব হলো সরল, সহজ ও অকৃত্রিম মাতৃভক্তির মাহাত্ম্য। ভক্ত এখানে ঘোষণা করেছেন যে, তিনি জটিল তন্ত্রসাধনা, মন্ত্রজপ, কঠোর যোগসাধনা বা বিশেষ আচার-বিধির পথ জানেন না এবং সে পথে চলতেও চান না। তাঁর একমাত্র সাধনা হলো ভালোবাসা দিয়ে মাকে ডাকা-
'শ্যামা, শ্যামা'। এক কথায় গানটি- শ্যামাপূজার সহজিয়া দর্শনের
অভিব্যক্তি।
গানের শুরুতে ভক্ত বিনীতভাবে নিজেকে উপস্থাপন করে বলেছেন- 'মাগো আমি তান্ত্রিক নই, তন্ত্র-মন্ত্র জানি না মা।
আমার মন্ত্র যোগ-সাধনা—ডাকি শুধু শ্যামা শ্যামা।' এখানে ভক্ত প্রচলিত জটিল সাধনপদ্ধতির পরিবর্তে নামস্মরণকে নিজের সাধনার পথ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাঁর কাছে বিশেষ মন্ত্র জানা, গূঢ় তন্ত্রসাধনা করা বা কঠিন যোগক্রিয়ায় সিদ্ধিলাভ করা জরুরি নয়। তিনি বিশ্বাস করেন, হৃদয়ের গভীর থেকে মায়ের নাম ডাকাই সর্বশ্রেষ্ঠ সাধনা।
অর্থাৎ ভক্তির সত্যতা আচার-অনুষ্ঠানের জটিলতায় নয়, হৃদয়ের আন্তরিকতায়। কালীসাধনার সঙ্গে সাধারণভাবে শ্মশান, অমাবস্যার রাত্রি এবং নানা তান্ত্রিক আচার যুক্ত থাকলেও ভক্ত সেই পথ অবলম্বন করেন না। তিনি কোনো বিশেষ স্থান, সময় বা ভয়ংকর সাধনক্রিয়ার মধ্যে মাকে খুঁজতে চান না। এর গভীর তাৎপর্য হলো- মা কোনো বিশেষ স্থান বা বিশেষ মুহূর্তের মধ্যে আবদ্ধ নন। তাঁকে পাওয়ার জন্য শ্মশানে যাওয়া বা অমাবস্যার গভীর রাতে বিশেষ সাধনা করাই একমাত্র পথ নয়; সত্যিকারের প্রেম থাকলে সাধারণ জীবনেও তাঁকে অনুভব করা যায়।
এখানে নিশীথরাত্রির ঝিল্লির অবিরাম ধ্বনিকে ভক্তের নিরবচ্ছিন্ন নামস্মরণের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। যেমন ঝিল্লি আপন স্বভাবেই অবিরাম ডাকতে থাকে, তেমনি ভক্তের হৃদয়ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে মায়ের নাম জপ করে।
গানের শেষাংশে কবি বলেছেন- শিশু তার মাকে ভালোবাসার জন্য কোনো শাস্ত্র শেখে না, কোনো সাধনা করে না, কোনো নিয়ম পালন করে না। তার ভালোবাসা স্বাভাবিক, সহজ ও নিঃস্বার্থ। ভক্তও তেমনি সন্তানের মতো মাকে ভালোবাসতে চান।
এখানে 'সহজ সাধনা' বলতে বোঝানো হয়েছে- ভক্তি যেন কৃত্রিম না হয়; তা যেন হৃদয়ের স্বাভাবিক ভালোবাসা থেকে উৎসারিত হয়। এই সহজ মাতৃপ্রেমের মধ্য দিয়েই ভক্ত মায়ের দর্শন লাভের আশা করেন।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে
সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর (অগ্রহায়ণ-পৌষ ১৩৪২) মাসে, টুইন
রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। এই
সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৬ বৎসর ৬ মাস।
- গ্রন্থ:
নজরুল-সংগীত সংগ্রহ [রশিদুন্ নবী সম্পাদিত। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট। তৃতীয় সংস্করণ দ্বিতীয় মুদ্রণ, আষাঢ় ১৪২৫। জুন ২০১৮। গান
২০৬৯। পৃষ্ঠা ৬২৩-৬২৪
- রেকর্ড: টুইন [ডিসেম্বর ১৯৩৫ (অগ্রহায়ণ-পৌষ ১৩৪২)]। এফটি ৪১৭২। শিল্পী:
দেবেন বিশ্বাস
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
আহসান মুর্শেদ।
[নজরুল
সঙ্গীত স্বরলিপি ছেচল্লিশতম খণ্ড। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট । ফাল্গুন
১৪২৫/ফেব্রুয়ারি ২০১৯] পৃষ্ঠা: ৭০-৭১। [নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। শাক্ত। শ্যামা। মাতৃরূপা
-
সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের সুর
- তাল:
একতাল
- গ্রহস্বর: স