বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: মাগো কে তুই, কার নন্দিনী ভ্রমর ল’য়ে
মা করিস্ খেলা
মাগো কে তুই, কার নন্দিনী ভ্রমর ল’য়ে
মা করিস্ খেলা।
তনুতে মা তোর সপ্তবর্ণ ইন্দ্রধনুর রঙের মেলা॥
একি অপরূপ চিত্র-কান্তি
স্নিগ্ধ নয়নে একি প্রশান্তি,
চিত্র-ভ্রমর মুঠো নিয়ে আকাশে ছড়াস্ সারাটি বেলা॥
ভূষিতা চিত্র-আভরণে তুই তেজোমণ্ডল-বিমণ্ডিতা।
কে তুই ত্রিলোক-হিতার্থিনী ভ্রমরীরূপা আনন্দিতা।
কোন সে অসুর বধিবার আশে
ভ্রমর ছাড়িস আকাশে বাতাসে
সব উৎপাতবিনাশিনী শিবে, সে মা আমারে চরণে-ভেলা॥
- ভাবসন্ধান: দেবী ভ্রমরীরূপে একদিকে অপরূপ সৌন্দর্য, শান্তি ও আনন্দের আধার; অন্যদিকে তিনি অশুভ ও অত্যাচারী শক্তির সংহারিণী এবং বিশ্বকল্যাণকারিণী মহাশক্তি।
এই গানটিতে দেবীর ভ্রমরীরূপা মহাশক্তির রহস্যময়, সৌন্দর্যময় ও সংহারিণী রূপের বন্দনা করা হয়েছে। কবি বিস্ময়ভরে মাকে প্রশ্ন করছেন—তিনি কে, কার কন্যা, যিনি ভ্রমর নিয়ে এই বিচিত্র বিশ্বলীলায় মেতে আছেন? দেবীর রূপ এখানে একদিকে অপরূপ সৌন্দর্য ও প্রশান্তির আধার, অন্যদিকে অশুভ ও উৎপাতবিনাশিনী মহাশক্তি। তাঁর রূপে যেমন রামধনুর সপ্তবর্ণের সৌন্দর্য, তেমনি রয়েছে তেজ ও অসীম শক্তি। তাঁর ভ্রমরবাহিনী অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক। কিন্তু তাঁর সমস্ত সংহারকর্মের অন্তরে রয়েছে ত্রিলোকের মঙ্গল। তাই ভক্তের কাছে এই ভ্রমরীরূপা দেবীই শেষ পর্যন্ত বিপদসাগর পার হওয়ার চরণ-ভেলা এবং পরম আশ্রয়।
এই ভাবাদর্শে গানটির সূচনা হয়েছে ভক্তের বিস্ময় ও মুগ্ধতা ভরা প্রশ্ন- 'মাগো কে তুই, কার নন্দিনী ভ্রমর ল’য়ে মা করিস্ খেলা'। ‘কার নন্দিনী’ কথাটি আক্ষরিক পরিচয় জানার জন্য নয়; বরং দেবীর অপরিমেয় ও রহস্যময় স্বরূপের সামনে ভক্তের বিস্মিত আত্মসমর্পণ।
দেবীকে এখানে ভ্রমরীরূপা বলা হয়েছে। ‘ভ্রমরী’ দেবীর এমন এক শক্তিরূপ, যেখানে তিনি অসংখ্য ভ্রমর বা মৌমাছির মাধ্যমে অশুভ শক্তিকে দমন করেন। তাই ভ্রমর এখানে শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের উপাদান নয়; এটি দেবীর শক্তিরও প্রতীক।
'তনুতে মা তোর সপ্তবর্ণ ইন্দ্রধনুর রঙের মেলা'— এই অর্থে- যেন দেবীর দেহে রামধনুর সাতটি রঙের সমাবেশ ঘটেছে। এর দ্বারা তাঁর রূপের বহুবর্ণ বৈচিত্র্য ও বিশ্বব্যাপী সৌন্দর্য প্রকাশিত হয়েছে।
সপ্তবর্ণ এখানে প্রতীকী অর্থেও গুরুত্বপূর্ণ। সৃষ্টিজগতের অসংখ্য রূপ, রঙ ও বৈচিত্র্য যেন সেই এক দেবীসত্তার মধ্যেই মিলিত হয়েছে। তিনি একই সঙ্গে বহুরূপিণী এবং একক পরমশক্তি।
কবি বিস্ময়ে বলেন—
'একি অপরূপ চিত্র-কান্তি,
স্নিগ্ধ নয়নে একি প্রশান্তি।' এর দ্বারা দেবীর বাহ্যিক সৌন্দর্যের সঙ্গে তাঁর অন্তর্নিহিত শান্তি ও মমতা একত্রে
উপস্থাপিত হয়েছে। তাঁর চোখ স্নিগ্ধ ও প্রশান্ত; ফলে তাঁর শক্তিময় রূপও ভক্তের কাছে ভয়ের নয়, বরং আশ্রয় ও আনন্দের উৎস।
“চিত্র-ভ্রমর মুঠো নিয়ে আকাশে ছড়াস্ সারাটি বেলা”—এই চিত্রকল্পে দেবীকে এক খেলুড়ে শিশুর মতো কল্পনা করা হয়েছে, যিনি মুঠোভর্তি রঙিন ভ্রমর আকাশে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। এতে তাঁর বিশ্বলীলার আনন্দময় রূপ ফুটে উঠেছে।
'ভূষিতা চিত্র-আভরণে তুই তেজোমণ্ডল-বিমণ্ডিতা'। অর্থাৎ দেবী শুধু অলংকারে সজ্জিতা নন; তিনি তেজ ও জ্যোতির দ্বারা পরিবেষ্টিতা। তাঁর রূপের সৌন্দর্য কেবল বাহ্যিক নয়, তা দিব্যজ্যোতিতে উদ্ভাসিত।
তাঁকে বলা হয়েছে 'ত্রিলোক-হিতার্থিনী'—অর্থাৎ তিন জগতের কল্যাণসাধনই তাঁর উদ্দেশ্য। তাঁর শক্তি কখনো ভয়ংকর রূপ ধারণ করলেও তার অন্তিম লক্ষ্য সর্বদাই বিশ্বকল্যাণ।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি প্রশ্ন করেছেন—
“কোন সে অসুর বধিবার আশে
ভ্রমর ছাড়িস আকাশে বাতাসে?”
এখানে দেবীর ভ্রমরবাহিনী অশুভ শক্তি দমনের প্রতীক। পুরাণকথায় দেবীর ভ্রমরীরূপ অসুরবিনাশের সঙ্গে যুক্ত। তাই আকাশ-বাতাসে ভ্রমর ছেড়ে দেওয়ার অর্থ হলো—অশুভ, অত্যাচার ও ধ্বংসাত্মক শক্তির বিরুদ্ধে দেবীশক্তির অভিযান।
গানের শেষাংশে দেবীকে বলা হয়েছে—
'সব উৎপাতবিনাশিনী শিবে'। অর্থাৎ তিনি সকল অশান্তি, অমঙ্গল ও উৎপাতের বিনাশকারিণী। তাঁর সংহাররূপ ধ্বংসের জন্য ধ্বংস নয়; তা শান্তি ও মঙ্গলের প্রতিষ্ঠার জন্য।
'সে মা আমারে চরণে-ভেলা'—এখানে ভক্তের চূড়ান্ত আত্মসমর্পণের ভাব প্রকাশিত হয়েছে। জীবনের অশান্তি ও বিপদের সাগরে ভক্ত মায়ের চরণকেই ভেলা বা নৌকার মতো আশ্রয় হিসেবে গ্রহণ করতে চান। মায়ের চরণ তাঁকে সমস্ত বিপদ অতিক্রম করে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দেবে।
- রচনাকাল ও স্থান:
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে
সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।
১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের
২৭ জানুয়ারি (বৃহস্পতিবার
১৩ মাঘ ১৩৪৪), কলকাতা বেতার থেকে প্রচারিত 'দেবস্তুতি' আলেখ্যের সাথে এই গানটি
প্রচারিত হয়েছিল। এই
সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৮ বৎসর ৮ মাস।
- গ্রন্থ:
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
২০৭১।
-
দেবীস্তুতি। [নজরুল রচনাবলী জন্মশধবর্ষ সংস্করণ। বাংলা
একাডেমী ঢাকা। অষ্টম খণ্ড (১২ ভাদ্র ১৩১৫, ২৭শে আগষ্ট ২০০৮)। ভ্রামরী। পৃষ্ঠা: ২৫৩]
- পত্রিকা: বেতার জগৎ
[১৬ জানুয়ারি ১৯৩৮
খ্রিষ্টাব্দ (রবিবার, ২ মাঘ ১৩৪৪)]। 'আমাদের কথা' বিভাগে।
[সূত্র:
বেতার জগৎ। ৯ম বর্ষ ২য় সংখ্যা। প্রচ্ছদ ও
পৃষ্ঠা:৪৫।
- বেতার:
- দেবীস্তুতি
- প্রথম প্রচার। কলকাতা বেতার কেন্দ্র। ২৭ জানুয়ারি ১৯৩৮ (বৃহস্পতিবার
১৩ মাঘ ১৩৪৪)। শিল্পী: গীতা মিত্র
[সূত্র:
- বেতার জগৎ। ৯ম বর্ষ ২য় সংখ্যা। প্রচ্ছদ ও পৃষ্ঠা:৪৫।
-
The Indian listener. Vol III. No II, (7th January, 1938) Page 121
- দ্বিতীয় প্রচার। কলকাতা বেতার কেন্দ্র। ২৫ জুলাই ১৯৩৯ (মঙ্গলবার, ৯ শ্রাবণ ১৩৪৬)।
[সূত্র: বেতার জগৎ-পত্রিকার ৯ম বর্ষ ১২শ সংখ্যা। পৃষ্ঠা ৫৩৩]
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। শাক্ত। দুর্গা। বন্দনা
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য