বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: মোরে পূজারী কর তোমার ঠাকুর ঘরে হে ত্রিজগতের
মোরে পূজারী কর তোমার ঠাকুর ঘরে হে ত্রিজগতের
নাথ।
মোর সকল দেহ লুটাক তোমার পায়ে
(হয়ে) একটি প্রণিপাত॥
নিত্য যেন তোমারি মন্দিরে
চিত্ত আমার ব্যাকুল হয়ে ফিরে
গ্রহ যেমন সুযলোক ঘিরে ঘুরে
দিবস রাত॥
মোর নয়ন যেন তোমারি রূপ হেরে
সকল দেখার মাঝে
যেন এ রসনা জপে তোমারি নাম হে
নাথ সকল কাজে।
তোমার চরণ রয় যে শতদলে
তারি পানে মোর মন যেন চলে
নিত্য তোমায় নমস্কারের ছলে (যেন)
যুক্ত থাকে হাত॥
- ভাবসন্ধান: জীবনের সর্বাঙ্গকে পরমসত্তার সেবায় উৎসর্গ করা এবং তাঁকে জীবনের কেন্দ্র করে নিরন্তর স্মরণ, দর্শন ও প্রণামের মধ্যে অবস্থান করা। ভক্তের কাছে প্রকৃত পূজা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের অনুষ্ঠান নয়; তাঁর দেখা, বলা, চিন্তা ও কর্ম—সমস্ত জীবনই যেন
তাঁর উদ্দেশে নিবেদিত এক অবিরাম পূজা। এই ভাবাদর্শে রচিত এই গানে- পরমসত্তার প্রতি ভক্তের গভীর আত্মনিবেদন এবং আজীবন তাঁর সেবায় নিয়োজিত থাকার আকাঙ্ক্ষার
উপস্থাপিত হয়েছে। ভক্ত এখানে পরমসত্তা অর্থাৎ ত্রিজগতের নাথের কাছে প্রার্থনা করেছেন- তিনি যেন তাঁকে নিজের
ঠাকুর ঘরের (পরমসত্তার আরাধনালয়) একজন পূজারী হিসেবে গ্রহণ করেন। তাঁর জীবনের একমাত্র কামনা, নিজের সমস্ত দেহ-মন-প্রাণকে
তাঁরই কাছে সম্পূর্ণভাবে সমর্পণ করা। তাই তাঁর সমগ্র অস্তিত্ব যেন একটিমাত্র অবিরাম প্রণিপাতে পরিণত হয়।
ভক্ত চান, তাঁর চিত্ত যেন সর্বদা পরমেশ্বরের উপাসনালয় কেন্দ্র করে নিবেদিত
থাকে। তাঁর এই ব্যাকুল নিবেদন তুলনা করা হয়েছে সূর্যকে কেন্দ্র করে গ্রহগুলোর নিরন্তর পরিক্রমার সঙ্গে। যেমন গ্রহ সূর্যকে কেন্দ্র করে দিনরাত ঘুরে চলে, তেমনি ভক্তের মনও যেন
পরমসত্তাকে কেন্দ্র করেই সর্বদা আবর্তিত হয়। অর্থাৎ পরমসত্তাই যেন তাঁর চিন্তা, অনুভব ও জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকেন।
গানটির পরবর্তী অংশে ভক্তের সর্বাঙ্গীণ পরমসত্তা-মুখিতা উপস্থাপিত হয়েছে। তাঁর
কামনা নয়ন যেন পৃথিবীর সকল দৃশ্যের মধ্যেও পরমসত্তার রূপ দর্শন করে। তাঁর রসনা যেন জীবনের প্রতিটি কাজে ও প্রতিটি মুহূর্তে ঈশ্বরের
তাঁর উচ্চারণ করে। অর্থাৎ ভক্ত কেবল মন্দিরের নির্দিষ্ট পূজার মধ্যেই পরমসত্তাকে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না; জীবনের সর্বত্র, সকল দেখা ও সকল কর্মের মধ্যেই তিনি
তাঁকে অনুভব করতে চান।
গানটির শেষাংশে পরমসত্তার চরণকে শতদলের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। ভক্তের মন যেন সর্বদা সেই পবিত্র চরণপদ্মের দিকেই ধাবিত হয়। তাঁর দুই হাত যেন নিত্য নমস্কারের ভঙ্গিতে যুক্ত থাকে- এমনই তাঁর কামনা।
এখানে চরণ হলো- পরমসত্তার কাছে আত্মনিবেদনের সর্বনিম্ন ধাপ। এখানে যুক্ত হাত কেবল বাহ্যিক প্রণামের প্রতীক নয়; এটি ভক্তের অন্তরের চিরস্থায়ী বিনয়, শ্রদ্ধা ও আত্মসমর্পণের প্রতীক।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল
(চৈত্র ১৩৪৪-বৈশাখ ১৩৪৫) মাসে, টুইন রেকর্ড কোম্পানি গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশ করে। এই
সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৩৮ বৎসর ১০ মাস রচিত হয়েছিল।
- গ্রন্থ:
নজরুল-সংগীত সংগ্রহ [রশিদুন্ নবী সম্পাদিত। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট। তৃতীয় সংস্করণ দ্বিতীয় মুদ্রণ, আষাঢ় ১৪২৫। জুন ২০১৮। গান
২০৯৬। পৃষ্ঠা ৬৩১]
- রেকর্ড: টুইন [এপ্রিল ১৯৩৮ (চৈত্র ১৩৪৪-বৈশাখ ১৩৪৫)]। এফটি ১২৩৭৩। শিল্পী:
কার্তিকচন্দ্র দাস।
- স্বরলিপিকার: নজরুল ইসলাম
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
আহসান মুর্শেদ
[নজরুল
সঙ্গীত স্বরলিপি সাতচল্লিশতম খণ্ড। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট । ফাল্গুন ১৪২৫/ফেব্রুয়ারি
২০১৯] পৃষ্ঠা: ৭০-৭২। [নমুনা]
- পর্যায়