বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: হাসিয়া মরি রাই কৃষ্ণ শ্যাম নাই যাবি হেন কোন দেশে।
হাসিয়া মরি রাই কৃষ্ণ শ্যাম নাই যাবি হেন কোন দেশে।
সে যে সকল পন্থ দিগ্ দিগন্ত আগলি আছে শ্যাম বেশে॥
শুভ্র জ্যোতিরে ঘিরিয়া আছে দেখ্ আকাশ হয়ে শ্যাম লাবনি;
অভিমানে ফিরে আসিলে হেরিবি নিম্নে শ্যামময় অবনী।
সবই শ্যামময় শ্যামময় সবই কৃষ্ণময় কৃষ্ণময়
আলোর তৃষ্ণা শেষে হেরিবি সব দেশে – কৃষ্ণময় কৃষ্ণময়
ঊর্ধ্বে কৃষ্ণ নিম্নে কৃষ্ণ – কৃষ্ণময় কৃষ্ণময়।
(ওলো) গৌরী চাঁপার কলি, আর একটি কথা বলি
কৃষ্ণ ছেড়ে যাবি তুই কোথা।
ভাস্বর জ্যোতি যিনি ভাসুর যে হন তিনি
বলরাম আলোর দেবতা।
তুই ফিরে যে আসবি শুভ্র জ্যোতিরূপে
ভাসুরকে দেখে তুই ঘোমটা দিয়ে হাসবি, ফিরে যে আসবি।
সেই ঘোমটার আবরণে আসিবে স্মরণে ঘন শ্যাম বরণে সজনী
আসিবে ফিরে তোর মাধবী কুঞ্জে
সচন্দ্রা রজঃ নয়, সচন্দ্রা রজনী
রজঃগুণের ত্যজিয়া নির্মল সুনীল চাঁদ
আবার আসিবে ফিরে রাধা নাম ভাজিয়া।
রাধা প্রেমে মজিয়া।
বলবে রাধা রাধা
তোমার প্রেমে আমি চির-রাঁধা – রাধা! রাধা! জয় রাধা! রাধা!
- ভাবসন্ধান: এই গানে রাধা-কৃষ্ণের প্রেম, বিরহ, কৃষ্ণের সর্বব্যাপী সত্তা এবং রাধার পুনরায় কৃষ্ণপ্রেমে ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা এক গভীর বৈষ্ণবীয় ভাবের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। গানের বক্তব্যে প্রেম কেবল ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়; ক্রমে তা সমগ্র বিশ্বজগতের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়।
প্রথমে রাধাকে বলা হচ্ছে—“হাসিয়া মরি রাই, কৃষ্ণ শ্যাম নাই যাবি হেন কোন দেশে”। কৃষ্ণকে ছেড়ে রাধা কোথায় যাবে? কারণ কৃষ্ণ কোনো নির্দিষ্ট স্থান বা ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নন। তিনি যেন পৃথিবীর সব পথ, সব দিগন্ত এবং সমস্ত অস্তিত্বকে তাঁর শ্যামবর্ণ সত্তায় আবৃত করে আছেন।
এরপর প্রকৃতির মধ্যেও কৃষ্ণের সর্বব্যাপী উপস্থিতি দেখানো হয়েছে। শুভ্র জ্যোতির চারদিকে যে নীল আকাশ বিস্তৃত, তার মধ্যেও শ্যামের সৌন্দর্য। রাধা যদি অভিমান করে কৃষ্ণকে ছেড়ে চলে যায়, ফিরে এসে দেখবে—আকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত সবই কৃষ্ণময়। তাই গানের পুনরাবৃত্ত উচ্চারণ—
'সবই শ্যামময়, শ্যামময়,
সবই কৃষ্ণময়, কৃষ্ণময়।”
এখানে কৃষ্ণ কেবল বৃন্দাবনের একজন প্রিয়তম নন; তিনি সর্বত্র বিরাজমান প্রেম ও সৌন্দর্যের প্রতীক। “ঊর্ধ্বে কৃষ্ণ, নিম্নে কৃষ্ণ”—এই উক্তির মাধ্যমে তাঁর সর্বব্যাপী উপস্থিতি বোঝানো হয়েছে।
এরপর গানের ভাব কিছুটা তাত্ত্বিক ও প্রতীকী হয়ে ওঠে। 'গৌরী চাঁপার কলি' সম্বোধনে রাধাকে বলা হচ্ছে—কৃষ্ণকে ছেড়ে কোথায় যাবে? এখানে গৌরী ও শুভ্র জ্যোতির বিপরীতে ঘনশ্যাম রঙের উপস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। বলরামকে
'আলোর দেবতা' বলা হয়েছে। তাঁর শুভ্র, ভাস্বর রূপ যেন কৃষ্ণের ঘনশ্যাম রূপের বিপরীত মেরু।
উভয়ই বিষ্ণুর অবতার। তাই এই দুই রূপ পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়; আলো ও শ্যাম, শুভ্রতা ও নীলিমা—সব মিলিয়েই প্রেমের পূর্ণতা।
রাধা যখন সেই শুভ্র জ্যোতির দিকে তাকাবেন, তখন তাঁর মনে কৃষ্ণের ঘনশ্যাম বর্ণ আরও গভীরভাবে জেগে উঠবে। অর্থাৎ কৃষ্ণকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টাই শেষ পর্যন্ত কৃষ্ণের স্মৃতিকে আরও তীব্র করে তুলবে।
গানের শেষাংশে রাধার প্রত্যাবর্তনের এক অপূর্ব কল্পনাশ্রিত ভাবধারয়
উপস্থাপিত হয়েছে। কবির প্রত্যাশা- তিনি আবার তাঁর মাধবী-কুঞ্জে ফিরে আসবেন। কিন্তু সেই প্রত্যাবর্তন হবে শুধু বাহ্যিকভাবে নয়—অন্তরের পরিশুদ্ধির মধ্য দিয়ে।
'রজঃগুণের ত্যজিয়া নির্মল সুনীল চাঁদ'—এখানে রাধার মন থেকে জাগতিক অস্থিরতা, আসক্তি ও অশান্তি দূর হয়ে নির্মল প্রেমের দিকে ফিরে আসার ইঙ্গিত রয়েছে। তাঁর হৃদয়ে আবার জেগে উঠবে কৃষ্ণের স্মৃতি এবং রাধার প্রেম।
শেষে রাধা কৃষ্ণের প্রেমে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে উচ্চারণ করেন—
'রাধা! রাধা! জয় রাধা!' এখানে রাধার নিজের নামই তাঁর প্রেমের পরিচয় হয়ে ওঠে। তিনি যেন ঘোষণা করছেন—কৃষ্ণপ্রেমই তাঁর প্রকৃত সত্তা; কৃষ্ণকে ভালোবাসার মধ্যেই তাঁর অস্তিত্বের পূর্ণতা।
কৃষ্ণকে ত্যাগ করে কৃষ্ণকে পাওয়া যায় না, কারণ প্রেমিক কৃষ্ণ সর্বত্র বিরাজমান। রাধা যতই অভিমান করে তাঁকে ছেড়ে যেতে চান, আকাশ, পৃথিবী, আলো, প্রকৃতি—সবকিছুর মধ্যেই তিনি কৃষ্ণের অস্তিত্ব দেখতে পান।
এটি শুধু রাধার বিরহের গান নয়; এর গভীরে রয়েছে এক ধরনের বৈষ্ণবীয় প্রেমতত্ত্ব। প্রেমিক যখন সর্বত্র প্রিয়তমের অস্তিত্ব অনুভব করে, তখন প্রিয়তম আর কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা স্থানে সীমাবদ্ধ থাকেন না; সমস্ত বিশ্বই তাঁর প্রেমের প্রকাশ হয়ে ওঠে।
শেষ পর্যন্ত রাধার প্রত্যাবর্তন হলো অভিমান থেকে প্রেমে, বিচ্ছেদ থেকে মিলনে এবং বাহ্যিক জগত থেকে অন্তরের কৃষ্ণসত্তায় প্রত্যাবর্তন।
- রচনাকাল ও স্থান:গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই নভেম্বর (শনিবার, ২৩ কার্তিক ১৩৪৭), কলকাতা বেতারকেন্দ্র থেকে অভিমানিনী প্রথম প্রচারিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪১ বৎসর ৫ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
২১৩৪। গীতিচিত্র: 'অভিমানিনী'। পৃষ্ঠা: ৫৪৩]
- বেতার:
- অভিমানিনী
(গীতিচিত্র)।
- প্রথম প্রচার: কলকাতা বেতারকেন্দ্র-ক, তৃতীয় অধিবেশন।
৯ নভেম্বর ১৯৪০ (শনিবার, ২৩ কার্তিক ১৩৪৭)। রাত্রি: ৮.০০-৮.৪০ মিনিট]
- সূত্র:
- বেতার জগৎ। ১১শ বর্ষ, ২১ সংখ্যা। পৃষ্ঠা: ১১৬২
- The
Indian-listener 1940, Vol V, No 21. page 1665
- দ্বিতীয় প্রচার: কলকাতা বেতারকেন্দ্র-ক, তৃতীয় অধিবেশন। ২৮ জুন ১৯৪১ (শনিবার
১৩ আষাঢ়। ১৩৪৮)। রাত ৮.০০-৮.৩৯ মিনিট
- সূত্র: বেতার জগৎ। ১২শ বর্ষ, ১২ সংখ্যা। পৃষ্ঠা: ৭১৪
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব।