বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: বয়ে যাই উতরোল অসীম সদূরে
বয়ে যাই উতরোল অসীম সদূরে।
অজানার লাগি’ চলি অচিন সে পুরে॥
না জানি পথের কথা
উদাসী পথিক যথা
হয়েছে উদাস মন বাঁশির ঐ সুরে॥
কবে মোর হবে জয় – মম অভিসার
সফল হইবে সে মুখ, হেরি বঁধুয়ার
জানি না সে কোন্ দেশে
সে কোন্ পথের শেষে
মোর প্রিয় সনে হবে দেখা, আঁখি তাই ঝুরে॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে জীবনের চিরন্তন অভিযাত্রা, পরমপ্রিয়ের সন্ধান এবং অজানার প্রতি এক গভীর আধ্যাত্মিক আকর্ষণ প্রকাশিত হয়েছে। কবি নিজেকে এক উদাস পথিকরূপে কল্পনা করেছেন, যিনি সংসারের পরিচিত সীমা অতিক্রম করে এক অচেনা, অনন্ত গন্তব্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। তাঁর পথের শেষ কোথায়, গন্তব্য কোথায়—তা তিনি জানেন না; কিন্তু অন্তরের গভীর থেকে ভেসে আসা এক অলৌকিক আহ্বান তাঁকে অবিরাম এগিয়ে চলতে উদ্বুদ্ধ করছে।
গানের শুরুতেই কবি বলেন, তিনি এক উচ্ছ্বসিত স্রোতের মতো অসীমের দিকে বয়ে চলেছেন। তাঁর যাত্রার লক্ষ্য সেই অচিনপুর, যা মানুষের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের বাইরে অবস্থিত। এখানে ‘অচিনপুর’ কোনো বাস্তব স্থান নয়; এটি পরমসত্য, পরমসত্তাকে উপলব্ধির প্রতীক। মানুষের আত্মা জন্ম থেকে মৃত্যুর মধ্যে সেই অনন্ত সত্যেরই সন্ধানে পথ চলে।
এরপর কবি স্বীকার করেন যে, তিনি এই পথের কোনো সুনির্দিষ্ট দিশা জানেন না। তবু এক উদাসী পথিক যেমন অন্তরের টানে অজানার পথে যাত্রা করে, তিনিও তেমনি এক রহস্যময় বাঁশির সুরে আকৃষ্ট হয়ে চলেছেন। এই বাঁশির সুর বৈষ্ণব কাব্যে শ্রীকৃষ্ণের আহ্বানের প্রতীক হলেও, আধ্যাত্মিক অর্থে এটি পরমসত্তার সেই অন্তরাত্মাকে জাগ্রত করা আহ্বান, যা মানুষের মনকে সংসারের মায়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে অনন্তের পথে পরিচালিত করে। সেই সুরে কবির মনও উদাস ও বৈরাগ্যময় হয়ে উঠেছে।
গানের শেষাংশে কবি তাঁর অভিসারের সাফল্যের জন্য ব্যাকুল প্রতীক্ষার কথা ব্যক্ত করেছেন। তিনি জানেন না, কবে তাঁর এই সাধনা সফল হবে, কবে তিনি সেই পরমপ্রিয়ের মুখোমুখি হবেন। প্রিয়তম কোন দেশে আছেন, কোন পথের শেষে তাঁর সঙ্গে মিলন ঘটবে—সে বিষয়ে তাঁর কোনো নিশ্চিত জ্ঞান নেই। কিন্তু এই অনিশ্চয়তা তাঁর বিশ্বাসকে দুর্বল করে না; বরং প্রত্যাশাকে আরও গভীর করে তোলে। সেই আকাঙ্ক্ষায় তাঁর চোখ অশ্রুসজল হয়ে থাকে এবং হৃদয় নিরন্তর অপেক্ষা করে সেই শুভ মিলনের ক্ষণের জন্য।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু
যায়
নি। ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ ফেব্রুয়ারি (বৃ্হস্পতিবার ১৪ ফাল্গুন ১৩৪২),
জগৎঘটকের রচিত
জীবনস্রোত গীতি-আলেখ্য,
কলকাতা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়। এই নাটকে এ গানটি প্রথম ব্যবহৃত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল
৩৬ বৎসর ৭ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সংগীত সংগ্রহ [রশিদুন্ নবী সম্পাদিত। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট। তৃতীয় সংস্করণ দ্বিতীয় মুদ্রণ, আষাঢ় ১৪২৫। জুন
২০১৮। গান ২১৯৬]
- বেতার:
জীবনস্রোত [গীতি-আলেখ্য। রচনা জগৎঘটক। কলকাতা বেতার কেন্দ্র। বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৬। ১৪ ফাল্গুন ১৩৪২। সান্ধ্য
অনুষ্ঠান: ৮.৩০-৯.১৪ মিনিট
- সূত্র:
- বেতার জগৎ। সপ্তম বর্ষ, ৪র্থ সংখ্যা। ১৬ ফেব্রুয়ারি. ১৯৩৬ ।পৃষ্ঠা ১৭২
- The Inidian Listener font size.4.Vol I No 4, Page 232
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সাধারণ। পরমসত্তা