বিষয়: নজরুলসঙ্গীত
শিরোনাম: নমো নমো নমঃ হিম-গিরি-সূতা দেবতা-মানস-কন্যা
নমো নমো নমঃ হিম-গিরি-সূতা দেবতা-মানস-কন্যা।
স্বর্গ হইতে নামিয়া ধূলায় মর্ত্যে করিলে ধন্যা॥
আছাড়ি’ পড়িছ ভীষণ রঙ্গে
চূর্ণি’ পাষাণ ভমি-তরঙ্গে,
কাঁপিছে ধরণী ভ্রুকুটি ভঙ্গে –
ভুজগ-কূটিল বন্যা॥
কুলে কলে তব কন্যা-কমলা
শস্যে কুসুমে হাসিছে অচলা,
বন্দিছে পদ শ্যাম-অঞ্চলা –
ধরণী ঘোরা অরণ্যা।
- ভাবসন্ধান: কাজী নজরুল ইসালামের রচিত 'সেতুবন্ধ' নাটিকা গান। এই
গানের গঙ্গার প্রধান শাখা প্রমত্তা পদ্মার রূপ বর্ণনার মাধ্যমে মূলত স্বর্গ থেকে
পতিত নদী ও দেবী 'গঙ্গা'র মহিমা উপস্থাপিত হয়েছে। উল্লেখ্য, হিন্দু পৌরাণিক
কাহিনি মতে- স্বর্গ থেকে মহাদেবের জটা ধরে হিমালায়ে পতিত হয়েছিল। তাই এই গানে
তাঁকে 'হিম-গিরি-সূতা' নামে অভিহিত করা হয়েছে। দেবলোকে নারদের অনুরোধে মহাদেব
সঙ্গীত পরিবেশন করেন। শ্রোতা হিসেবে বিষ্ণু সেই গান কিছুটা অনুধাবন করলে, তাঁর
দেহাংশ বিগলিত হয়ে নদীরূপে প্রবাহিতা হন। পরে মহাদেবের জটা বেয়ে এই নদী গঙ্গা
নামে হিমালয়ে পতিতা হন। এখানে 'দেবতা-মানস-কন্যা' হলো- দেবতার (বিষ্ণুর)
সঙ্গীতমুগ্ধ মনলোকে পবিত্র এই নদীর জন্ম হয়েছিল। এই নদী স্বর্গ স্বরগ্ থেকে নেমে
এসে ধূলার মর্ত্যলোকে ধন্য করেছিলেন। পৌরাণিক কাহিনি মতে- অযোধ্যার সগর রাজার
অশ্বমেধ যজ্ঞের অশ্ব উদ্ধার করতে গিয়ে, তাঁর ষাট হাজার পুত্র কপিল মুনির রোষে
ভষ্মীভূত হয়। ভগীরথ এই এই ভষ্মের উপর দিয়ে গঙ্গার স্রোতধারাকে প্রবাহিত করে-
ভষ্মীভূত পুত্ররা জীবন দান করেন।
এই গানে কবি গঙ্গার প্রচণ্ড প্রবাহ,
ধ্বংস ও সৃষ্টির দ্বৈত রূপ, এবং তাঁর কল্যাণময়ী মাতৃস্বরূপের চিত্র
অঙ্কন করেছেন। স্বর্গ থেকে মর্ত্যে অবতরণের সময় গঙ্গা তাঁর প্রবল বেগে পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়েছেন। তাঁর সেই ভয়ংকর প্রবাহে পাথর চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে, ভূমির তরঙ্গ আন্দোলিত হচ্ছে এবং সমগ্র ধরণী যেন তাঁর প্রচণ্ড শক্তিতে কেঁপে উঠছে। তাঁর স্রোতধারা কখনো সর্পের মতো বক্র ও দুরন্ত গতিতে প্রবাহিত হয়ে প্রকৃতির মধ্যে এক মহাশক্তির প্রকাশ ঘটাচ্ছে।এই
ভয়ংকর রূপের অন্তরালে রয়েছে তাঁর মাতৃস্নেহময়ী ও জীবনদায়িনী রূপ। তাঁর তীরে তীরে,
কূলে কূলে তাঁর কন্যার মতো প্রকৃতি-সন্তানরা বিকশিত হয়। তাঁর জলধারার আশীর্বাদে
ক্ষেত্র শস্যে পূর্ণ হয়, বৃক্ষ ও ফুলে পৃথিবী সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে ওঠে। স্থিরা
ধরিত্রী তাঁর কল্যাণস্পর্শে হাসিমুখে জেগে ওঠে। কবি গঙ্গার পবিত্র জলের
দ্বারা উর্বর ও সৌন্দর্যময় হয়ে ওঠা বাংলার প্রকৃতির চিত্র এঁকেছেন। 'কুলে কলে তব কন্যা-কমলা / শস্যে কুসুমে হাসিছে অচলা'।
এখানে কন্যা-কমলা বলতে- কন্যারূপনী লক্ষ্মী অর্থে অভিহিত করা হয়েছে। অর্থাৎ
লক্ষ্মীর মতো
সৌন্দর্য ও সমৃদ্ধিতে ভরা অচলা (পৃথিবী) হাসছে। তাই কবি মনে করেন- গঙ্গার
পবিত্র ও জীবনদায়িনী প্রবাহে ধন্য হয়ে শ্যামল-সুন্দর পৃথিবী তাঁর চরণে শ্রদ্ধায়
নত হয়েছে। বন-অরণ্যে পরিপূর্ণ এই ধরিত্রী গঙ্গার আশীর্বাদে প্রাণময় ও
সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে উঠেছে। এখানে “শ্যাম-অঞ্চলা” বলতে শ্যামবর্ণ আঁচলবিশিষ্টা ধরণী বা পৃথিবীকে বোঝানো হয়েছে। সবুজ বন, শস্যক্ষেত্র ও নীলাভ প্রকৃতির কারণে পৃথিবীকে কবি শ্যামল আঁচলধারিণী নারীরূপে কল্পনা করেছেন।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট
কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। ১৩৩৭ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ (নভেম্বর
১৯৩০) মাসে প্রকাশিত হয়েছিল নজরুলের
প্রথম নাট্যসংকলন 'ঝিলিমিল' গ্রন্থের প্রথম সংস্করণ। এই সংকলনে
অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল তিনটি নাটিকা। এগুলো হলো- ঝিলিমিলি, সেতুবন্ধ ও শিল্পী।
এর ভিতরে 'সেতুবন্ধ' বন্ধ নাটিকার তৃতীয় দৃশ্যে গানটি ব্যবহৃত হয়েছিল। এই সময়
নজরুলের বয়স ছিল ৩১ বৎসর ৬ মাস।
-
গ্রন্থ
-
সেতুবন্ধ।
ঝিলিমিলি। (নাট্যসংকলন)
- প্রথম সংস্করণ। [অগ্রহায়ণ, ১৩৩৭ (নভেম্বর-১৯৩০)। 'সেতুবন্ধ'। তৃতীয় দৃশ্য। জলদেবীর বন্দনা গান]
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। তৃতীয় খণ্ড [বাংলা একাডেমী, ঢাকা জুন ২০১২। সেতুবন্ধ।
তৃতীয় দৃশ্য। জলদেবীর বন্দনা গান। পৃষ্ঠা: ৩৭৮]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
২৩৩০]
- পর্যায়:
- বিযয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। সাধারণ। গঙ্গা দেবী।
বন্দনা