বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: শূন্য বাতায়নে একা জাগি
শূন্য বাতায়নে একা জাগি।
সুদূর অতিথি তোমার লাগি॥
মম জাগার সাথী
একা নিশুতি রাতি,
জ্বলে শিয়রে বাতি (মম) ব্যথার ভাগী।
(মোর) বিফল মালার কুসুমগুলি,
ঝরিল ধূলায় (হায়) পড়িল খুলি’।
কাঁদি হে প্রিয়তম,
তব দরশ মাগি’॥
- ভাবসন্ধান: এই গানটি বিরহী আত্মার পরম প্রিয়তমের
তথা পরমসত্তার প্রতীক্ষার গান। এর ভাষা ও চিত্রকল্পে মানবপ্রেমের বিরহ থাকলেও গভীরতর স্তরে এটি আধ্যাত্মিক মিলনাকাঙ্ক্ষার সংগীত হিসেবেও অনুভব করা যায়। একাকী জাগরণ, নিশুতি রাত, জ্বালানো প্রদীপ, বিফল মালার ঝরে-পড়া ফুল এবং ‘দরশ’-এর আকুল প্রার্থনা—সব মিলিয়ে এখানে অপেক্ষমাণ হৃদয়ের গভীর ব্যথা প্রকাশ পেয়েছে।
‘শূন্য বাতায়ন’ শুধু একটি খোলা জানালা নয়; এটি অপেক্ষমাণ হৃদয়ের প্রতীক। প্রিয়তম নেই, অথচ তাঁর আসার সম্ভাবনায় হৃদয়ের জানালা খোলা। তিনি ‘সুদূর অতিথি’—অর্থাৎ তিনি যেন নিকটের হয়েও দূরে, হৃদয়ের আপন হয়েও অধরা। তাঁর আগমনের আশায় কবি একাকী রাত্রি জেগে থাকেন।
সমস্ত পৃথিবী যখন নিদ্রিত, তখন বিরহী হৃদয় জেগে থাকে। তার একমাত্র সঙ্গী গভীর নিশীথরাত্রি এবং শিয়রের প্রদীপ। প্রদীপটি যেন বাহ্যিক আলো নয়—অন্তরের আশার আলো। প্রিয়তম আসবেন কি না জানা নেই, তবু আলো নিভতে দেওয়া যায় না।
এর মূল ভাব- নির্জন অন্ধকার রাত্রিতে সাধক পরমসত্তার সাথে
মিলত হওয়ার অপেক্ষায় থাকে। সাধকের সাথে মিলন হবে কিনা তা নিশ্চিত নয়। তবু সে
অন্তরের আশার আলো জ্বেলে প্রতীক্ষায় থাকে। তাই এই প্রদীপ বিরহীর ব্যথারও সঙ্গী। সে যেমন জ্বলতে জ্বলতে ক্ষয় হয়, তেমনি অপেক্ষমাণ হৃদয়ও ব্যথার আগুনে জ্বলতে থাকে।
মালা সাধারণত বরণ ও মিলনের প্রতীক। প্রিয়তমকে বরণ করার জন্য যে মালা গাঁথা হয়েছিল, তাঁর না-আসায় সেই মালা বিফল হয়েছে। ফুলগুলি ঝরে ধূলায় পড়েছে।
এই ঝরে-পড়া ফুলের মধ্যে রয়েছে ব্যর্থ প্রতীক্ষার বেদনা। সময় চলে যায়, আশা ক্ষয় হয়, যৌবন ও জীবনের ফুল ঝরে পড়ে—কিন্তু প্রতীক্ষার অবসান ঘটে না। তাই ‘বিফল মালা’ কেবল একটি মালা নয়; এটি অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা ও ব্যর্থ মিলন-প্রতীক্ষার প্রতীক।
সাধক তাঁর দরশনের অপেক্ষায় থাকে। এখানে বিরহের উদ্দেশ্য শুধু প্রিয়জনকে পাওয়া নয়—তাঁর দর্শন লাভ করা। ‘দরশ’ শব্দটির মধ্যে বিশেষ এক আধ্যাত্মিক আবেদন আছে। প্রিয়তমকে দেখা মানে শুধু চোখে দেখা নয়; তাঁর সান্নিধ্য ও উপস্থিতির অনুভব লাভ করা। এই গানটির গভীরে রয়েছে অপেক্ষার মধ্য দিয়ে প্রেমের সাধনা। প্রিয়তম দূরে বলেই তাঁর জন্য হৃদয়ের আকুলতা গভীর হয়েছে। একাকী রাত, জ্বলন্ত প্রদীপ, ঝরে-পড়া ফুল—সবই সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার সাক্ষী।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু
জানা যায় না। ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ সেপ্টেম্বর (বুধবার, ১ আশ্বিন ১৩৪২) এইচএম রেকর্ড কোম্পানি'র সাথে নজরুলের চুক্তি হয়েছিল। এই চুক্তিপত্রে গানটি ছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৬ বৎসর
৪ মাস।
- গ্রন্থ:
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি
২০১২)। ২৫৬৭সংখ্যক গান।
তাল: আদ্ধা-কাওয়ালি। পৃষ্ঠা:
৭৮৮।
- নজরুলের হারানো গানের খাতা
[নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা। আষাঢ় ১৪০৪/জুন ১৯৯৭। গান সংখ্যা ৯১।
for Miss Lila (HMV)
।
ঠুমরী-আদ্ধা-কাওয়ালি।
পৃষ্ঠা ১১৮]
- রেকর্ড: এইচএমভির সাথে চুক্তিপত্র। [১৮ সেপ্টেম্বর
১৯৩৫ (বুধবার,১ আশ্বিন ১৩৪২)
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সাধারণ। পর্মসত্তা। প্রত্যাশা