দেবতা কোথায় স্বর্গের পানে চাহি’ অসহায় কাঁদি বৃথাই।
নাই অমরায়, বিগ্রহে নাই, মন্দিরে নাই তীর্থে নাই॥
কংস-কারার পাষাণ-পুরীতে
বন্দীর সাথে দেখেছি ঝুরিতে
(ওরে) চল্ সবে সেই তীর্থ-ভূমিতে
সেথা গিয়ে মোরা কেঁদে লুটাই॥
ক্ষুধিত, পীড়িত উপবাসীদের মাঝে
তাঁহার বেদনা-রক্ত চরণ-রাজে
কাঁদে দুর্বল যথায় দৈন্য লাজে সেথা তাঁর গীতা শুনিতে পাই॥
ঘুমায় সে সিন্ধুতে নারায়ণ
(সেথা) সুরাসুর মিলে তোল্ আলোড়ন
দেবতা জাগাতে আরো মন্থন আরো সহন পীড়ন চাই॥
গানের সূচনায় কবি আক্ষেপভরে বলেছেন, স্বর্গের দিকে চেয়ে কিংবা মন্দির, বিগ্রহ ও তীর্থস্থানে খুঁজেও দেবতার সত্যিকারের সন্ধান মেলে না। তাঁর উপলব্ধি—পরমকরুণাময় মানুষের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের মাঝে নন, বরং তাঁদের দুঃখ, বেদনা ও বঞ্চনার মধ্যেই অধিকতর জীবন্ত হয়ে বিরাজ করেন। তাই তিনি সকলকে সেই তীর্থভূমিতে যাওয়ার আহ্বান জানান, যেখানে অত্যাচারিত ও বন্দী মানুষের দীর্ঘশ্বাস ও কান্না ধ্বনিত হয়। কৃষ্ণ যেমন কংসের কারাগারে জন্মগ্রহণ করে বন্দী ও নিপীড়িত মানুষের দুঃখের অংশীদার হয়েছিলেন, তেমনি পরমপ্রভুও সর্বদা শোষিত ও অসহায় মানুষের পাশে অবস্থান করেন।
কবি অনুভব করেন, ক্ষুধার্ত, পীড়িত ও উপবাসী মানুষের মাঝেই দেবতার বেদনাবিধুর চরণচিহ্ন অঙ্কিত রয়েছে। যেখানে দুর্বল ও অসহায় মানুষ দারিদ্র্য, বঞ্চনা ও লাঞ্ছনার ভারে নীরবে অশ্রু বিসর্জন দেয়, সেখানেই যেন তাঁর গীতার চিরন্তন বাণী ধ্বনিত হয়। অর্থাৎ মানবদুঃখ লাঘব, মানবকল্যাণ সাধন এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়েই ধর্মের প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করা যায়।
গানের শেষ স্তবকে কবি সমুদ্র মন্থনের
পৌরাণিক উপাখ্যানের ইঙ্গিত ব্যবহার করেছেন। তাঁর মতে, মানবসমাজে সুপ্ত দেবত্বকে
জাগ্রত করতে হলে সংগ্রাম, ত্যাগ, সহিষ্ণুতা ও দুঃখবরণের পথ অতিক্রম করতেই হবে।
যেমন মন্থনের ফলে সমুদ্র থেকে অমৃত লাভ হয়েছিল, তেমনি জীবনের কঠোর পরীক্ষা,
কষ্ট ও সাধনার মধ্য দিয়েই মানুষের অন্তর্নিহিত মহত্ত্ব ও দেবত্ব বিকশিত হয়।
গ্রন্থ: