হে নটনাথ এ নট দেউলে
কর হে কর তব শুভ চরণপাত
হে নটনাথ॥
তোমার সঙ্গীতে নৃত্য ভঙ্গীতে
হউক হেথা নব জীবন সঞ্জাত হে নটনাথ।
তব প্রসাদ দেব- দেব হে আদি কবি
বাক মুখর হল মূক এ ছায়াছবি
আজি এ ছবি পটে তব মহিমা রটে
আলো ছায়ায় দুলে স্বপন রাঙা রাত
হে নটনাট।
ভাবসন্ধান: চলচ্চিত্র ও শিল্পও পরম স্রষ্টার মহিমা প্রকাশের একটি মাধ্যম হতে পারে। পৃথিবী যেমন ঈশ্বরের নটদেউল, তেমনি চলচ্চিত্রের পর্দাও তাঁর সৃষ্টির সৌন্দর্য, জীবন ও লীলাকে প্রকাশ করার এক মঞ্চ।
এই ভাবাদর্শে রচিত
এই গানে কবি নটনাথ—অর্থাৎ বিশ্বনাট্যের অধিপতি পরম স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করেছেন। তাঁর কাছে পৃথিবী একটি নটদেউল, অর্থাৎ এমন এক মন্দির যেখানে জীবন ও বিশ্বজগৎ যেন এক মহামঞ্চে অভিনীত অনন্ত নাট্যলীলা। কবি সেই নটনাথের শুভ চরণস্পর্শ কামনা করেছেন, যাতে এই মঞ্চ পবিত্র ও কল্যাণময় হয়ে ওঠে।
‘হে নটনাথ এ নট দেউলে / কর হে কর তব শুভ চরণপাত’—এই পংক্তিতে পৃথিবী বা অভিনয়ের মঞ্চকে মন্দিরের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। নটনাথের চরণস্পর্শের মাধ্যমে এই নটদেউল পবিত্রতা ও ঐশ্বরিক আশীর্বাদ লাভ করুক—এটাই কবির আকাঙ্ক্ষা।
‘তোমার সঙ্গীতে নৃত্য ভঙ্গীতে / হউক হেথা নব জীবন সঞ্জাত’ অর্থাৎ তাঁরই সঙ্গীত ও নৃত্যের ছন্দে মঞ্চে যেন নতুন জীবনের সৃষ্টি হয়। এখানে সঙ্গীত ও নৃত্য কেবল শিল্পের উপাদান নয়; এগুলো সৃষ্টিশক্তি, আনন্দ ও প্রাণের প্রতীক। পরম সত্তার সৃষ্টির ছন্দে মৃত ও নিস্তেজ জীবনে যেন নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটে।
এরপর কবি পর্মসত্তাকে এবং ‘আদি কবি’ বলে সম্বোধন করেছেন।
তাঁর কৃপায় যে ‘মূক ছায়াছবি’ বাক্শক্তি লাভ করেছে, অর্থাৎ যে নির্বাক চলচ্চিত্র এতদিন কেবল দৃশ্যের মাধ্যমে কথা বলত, তাঁর প্রসাদে সেটিই যেন ভাষা ও বাণী লাভ করেছে। এই অংশে চলচ্চিত্রশিল্পের প্রতি কবির গভীর শ্রদ্ধাও প্রকাশ পেয়েছে।
‘আজি এ ছবি পটে তব মহিমা রটে’ অর্থাৎ আজ এই চলচ্চিত্রের দৃশ্যপটে তোমারই মহিমা প্রকাশিত হোক। আলো ও ছায়ার মিশ্রণে নির্মিত চলচ্চিত্রের পর্দায় যে স্বপ্নময় জগৎ সৃষ্টি হয়, তার মধ্য দিয়েও যেন পরম স্রষ্টার মহিমা প্রকাশ পায়।
‘আলো ছায়ায় দুলে স্বপন রাঙা রাত’ এটা চলচ্চিত্রের প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য। এখানে আলো ও ছায়ার খেলা
করে। পর্দার আলো-ছায়ায় যেন স্বপ্নে রাঙা এক রাত্রির আবির্ভাব ঘটে এবং সেই স্বপ্নময় দৃশ্যের মধ্য দিয়ে নটনাথের মহিমা দর্শকের হৃদয়ে প্রতিফলিত হয়।
রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।
গানটি প্রথম ব্যবহৃত হয়েছিল ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে 'শ্রীশ্রীতারেকশ্বর' নাম ছায়ছবিতে।