বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: দূর আজানের মধুর ধ্বনি বাজে বাজে মসজিদেরই মিনারে
দূর আজানের মধুর ধ্বনি বাজে বাজে মসজিদেরই মিনারে।
এ কী খুশির অধীর তরঙ্গ উঠ্লো জেগে' প্রাণের কিনারে॥
মনে জাগে হাজার বছর আগে
ডাকিত বেলাল এমনি অনুরাগে,
তাঁর খোশ এলেহান, মাতাইত প্রাণ গলাইত পাষাণ ভাসাইত মদিনারে
প্রেমে ভাসাইত মদিনারে॥
তোরা ভোল্ গৃহকাজ ওরে মুসলিম থাম্
চল্ খোদার রাহে শোন্ ডাকিছে ইমাম।
মেখে' দুনিয়ারই থাক, বৃথা রহিলি না-পাক,
চল্ মসজিদে তুই, শোন্ মোয়াজ্জিনের ডাক,
তোর জনম যাবে বিফলে যে ভাই এই ইবাদতে বিনা রে॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে ইসলামের পবিত্র আজানের ধ্বনিকে কেন্দ্র করে
এক মুসলমানের অন্তরে জাগ্রত হওয়া ঈমান, ভক্তি, আধ্যাত্মিক আবেগ এবং আল্লাহর পথে
আত্মনিবেদনের আহ্বান উপস্থাপিত হয়েছে। কবি আজানের সুরকে কেবল নামাজের আহ্বান
হিসেবে দেখেননি; বরং তা মানুষের হৃদয়কে জাগ্রত করার, পার্থিব মোহ থেকে মুক্ত
করে আল্লাহর পথে ফিরিয়ে নেওয়ার এক অমোঘ আহ্বান হিসেবে চিত্রিত করেছেন।
গানের সূচনায় কবি দূর মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসা আজানের মধুর ধ্বনি শুনে
গভীরভাবে আলোড়িত হন। সেই সুর তাঁর হৃদয়ের গভীরে আনন্দ, ভক্তি ও ঈমানের তরঙ্গ
জাগিয়ে তোলে। এখানে আজানের ধ্বনি কেবল শ্রবণের বিষয় নয়; এটি আত্মাকে জাগ্রত
করার এক পবিত্র আহ্বান, যা মানুষের অন্তরকে আল্লাহর স্মরণে উদ্বুদ্ধ করে। তাই
এই ধ্বনি শুনে ভক্তের প্রাণে এক অপূর্ব আধ্যাত্মিক অনুভূতির সৃষ্টি হয়।
অন্তরায় কবি কল্পনার ডানায় ভর করে
ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে ফিরে যান। তাঁর মনে হয়, যেন আজও সেই একই অনুরাগ ও
ঈমানের আবেগ নিয়ে বিলাল (রা.) আজান দিচ্ছেন।
ইসলামী ঐতিহ্যে বিলাল (রা.)-এর আজান ছিল প্রেম, আত্মনিবেদন ও ঈমানের এক উজ্জ্বল
প্রতীক। কবির কল্পনায় তাঁর সুমধুর ও হৃদয়স্পর্শী কণ্ঠস্বর মানুষের অন্তরকে
আন্দোলিত করত, পাষাণ হৃদয়কেও গলিয়ে দিত এবং সমগ্র মদিনাকে ভক্তি ও প্রেমের
স্রোতে ভাসিয়ে তুলত। এই চিত্রকল্পের মাধ্যমে কবি আজানের আধ্যাত্মিক শক্তি ও
ঐতিহাসিক মাহাত্ম্যকে তুলে ধরেছেন।
সঞ্চারীতে কবি সমগ্র মুসলিম সমাজকে
আহ্বান জানিয়েছেন, যেন তারা কিছু সময়ের জন্য সংসারের কাজকর্ম ও জাগতিক
ব্যস্ততা ভুলে আল্লাহর পথে অগ্রসর হয়। এখানে ‘খোদার রাহ’ বলতে আল্লাহর ইবাদত,
আনুগত্য, নৈতিকতা ও আত্মশুদ্ধির পথকে বোঝানো হয়েছে। মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে
উচ্চারিত আজান মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, পার্থিব জীবন ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু
আল্লাহর স্মরণ ও ইবাদতই চিরস্থায়ী কল্যাণ ও মুক্তির পথ।
গানের আভোগে কবি উপদেশমূলক ভঙ্গিতে
মুসলমানদের ইসলামের আদর্শ অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি মনে করিয়ে
দিয়েছেন যে, মানুষ যদি কেবল দুনিয়ার মোহে নিমগ্ন থাকে এবং আত্মাকে পবিত্র
করার চেষ্টা না করে, তবে তার জীবন অর্থহীন হয়ে যেতে পারে। এখানে ‘না-পাক’
শব্দটি বাহ্যিক অপবিত্রতার চেয়ে অধিকতরভাবে অন্তরের কলুষতা, গাফিলতি ও ঈমানের
শৈথিল্যের প্রতীক। তাই কবি মানুষকে মসজিদমুখী হতে এবং মুয়াজ্জিনের ডাকে সাড়া
দিতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তাঁর বিশ্বাস, আল্লাহর ইবাদত, স্মরণ ও আনুগত্য ছাড়া
মানবজীবনের প্রকৃত সার্থকতা অর্জন সম্ভব নয়।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে
কিছু জানা যায় না। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর (ভাদ্র-আশ্বিন
১৩৪৪) মাসে এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির
প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৮ বৎসর ৩ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
৩৬৬
- রেকর্ড:
এইচএমভি। [সেপ্টেম্বর ১৯৩৭ (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪৪)। এন ৯৯৫৬। শিল্পী: কাশেম
মল্লিক]
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি: রশিদুন্ নবী ।
নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি (দশম খণ্ড)। প্রথম প্রকাশ, ৩
ফাল্গুন,
১৩৯৯ বঙ্গাব্দ/ ২৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দ। ১৬ গান] [নমুনা]
- পর্যায়
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। আজান
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য
- তাল:
কাহারবা