বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: হে প্রিয় নবী রসুল আমার
হে প্রিয় নবী রসুল আমার
প'রেছি আভরণ নামেরি তোমার॥
নয়নের কাজলে তব নাম
ললাটের টীপে জ্বলে তব নাম
গাঁথা মম কুন্তলে আহ্মদ
বাঁধা মোর অঞ্চলে তব নাম
দুলিছে গলে মোর তব নাম মণিহার॥
তাবিজ অঙ্গুরী তব নাম
বাজু ও পৈঁচী চুড়ি তব নাম
ভয়ে ভয়ে পথে পথে ঘুরি যে
পাছে কেউ করে চুরি তব নাম
ঐ নাম রূপ মোর ঐ নাম আঁখি ধার॥
বুকের বেদনা ঢাকা তব নাম
প্রাণের পরতে আঁকা তব নাম
ধ্যানে মোর জ্ঞানে মোর তুমি যে
প্রেম-ভক্তি মাখা তব নাম
প্রিয় নাম আহ্মদ জপি আমি অনিবার॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে কবি প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নামকে ভক্তের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অলংকার ও আশ্রয় হিসেবে কল্পনা করেছেন। এখানে নবীর নাম কেবল উচ্চারণযোগ্য একটি নাম নয়; এটি ভক্তের সৌন্দর্য, বিশ্বাস, প্রেম, স্মরণ, আত্মপরিচয় এবং আধ্যাত্মিক আশ্রয়ের প্রতীক।
তাই ভক্তের কাছে নবীর নামই সবচেয়ে মূল্যবান অলংকার। স্বর্ণ-রত্নের গয়নার পরিবর্তে সে নবীর নামকে নিজের দেহ-মন সাজানোর অলংকার হিসেবে ধারণ করেছে।
এরপর কবি নারীর সাজসজ্জার বিভিন্ন উপকরণের সঙ্গে নবীর নামকে যুক্ত করেছেন। চোখের কাজল ও কপালের টিপের মতোই নবীর নাম ভক্তের দৃষ্টির সৌন্দর্য ও ললাটের মর্যাদা বৃদ্ধি করছে। চুলের অলংকার, আঁচল এবং গলার হার- সবকিছুর মধ্যেই নবীর নাম কল্পিত হয়েছে। অর্থাৎ ভক্তের বাহ্যিক সাজসজ্জার প্রতিটি অংশই তাঁর স্মরণে পবিত্র হয়ে উঠেছে।
'নাম-মণিহার' দিয়ে বিশেষভাবে বুঝানো হয়েছে- নবীর নামই তাঁর সবচেয়ে মূল্যবান রত্ন।
এছাড়া তাবিজ, আংটি, বাজু, পৈঁচী ও চুড়ির মতো অলংকারেও নবীর নাম কল্পিত হয়েছে। অর্থাৎ নামটি শুধু সৌন্দর্যের উপকরণ নয়, আধ্যাত্মিক নিরাপত্তার প্রতীক।
তাই ভক্তের ভয়, কেউ যেন তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ 'নবীর নাম' কেড়ে নিতে না পারে। এখানে
'চুরি' বাস্তব চুরি নয়; বরং বিশ্বাস, প্রেম ও স্মৃতি হারিয়ে ফেলার আশঙ্কার কাব্যিক রূপ।
কবি মনে করেছেন- নবীর নামই তার সৌন্দর্য, তার দৃষ্টির আলো এবং তার আত্মপরিচয়। সে যেন নবীর নামের মধ্যেই নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছে।
গানের শেষে এসে কবি নবীর বাহ্যিক রূপসজ্জা থেকে বেরিড়ে অন্তর্লোকে তাঁর সন্ধান
করেছেন। তিনি অনুভব করেছেন- জীবনের দুঃখ-বেদনা নবীর নামের স্মরণে ঢাকা পড়ে; তাঁর নাম হৃদয়ের গভীরে স্থায়ীভাবে অঙ্কিত হয়ে আছে। ভক্তের ধ্যান, জ্ঞান ও চেতনার কেন্দ্রেই নবীর নাম। তাঁর স্মরণ শুধু আবেগ নয়; তা ভক্তের চিন্তা ও আত্মিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তাই ভক্ত প্রতিনিয়ত, নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রিয় নবী আহমদের নাম জপ করতে চায়। এই
নিরন্তর নামস্মরণই তার প্রেম, ভক্তি ও আত্মিক শান্তির প্রধান অবলম্বন।
সামগ্রিক বিচারে- এই গানে নবীপ্রেম ও নামস্মরণের সর্বাঙ্গীণ ভক্তি উপস্থাপিত
হয়েছে। ভক্তের কাছে নবীর নাম বাহ্যিক অলংকারের চেয়েও মূল্যবান; চোখের কাজল, কপালের টিপ, চুলের সাজ, গলার হার, তাবিজ- সবকিছুর প্রতীকী রূপ হয়ে সেই নাম তার সমগ্র সত্তাকে আবৃত করেছে। আবার অন্তরের দুঃখ, ভয় ও অস্থিরতার মধ্যেও সেই নামই তার আশ্রয় ও সান্ত্বনা।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।
১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪৩) মাসে, এইচএমভি
রেকর্ড কোম্পানি গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশ করেছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল
৩৭ বৎসর ৪ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ (নজরুল ইন্সটিটিউট, মাঘ, ১৪১৭/ফেব্রুয়ারি, ২০১৪) নামক গ্রন্থের
৪৮৫ সংখ্যক গান।
- রেকর্ড: এইচএমভি [অক্টোবর ১৯৩৬ (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪৩)। এন ৯৭৯৩। শিল্পী:
রৌশন আরা বেগম। সুর: কমল গুপ্ত]
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি: রশিদুন্ নবী
[নজরুল-সঙ্গীত
স্বরলিপি, ষোড়শ খণ্ড। প্রথম সংস্করণ। নজরুল ইন্সটিটিউট আশ্বিন
১৪০৪/অক্টোবর ১৯৯৩। ২৪
সংখ্যক গান] [নমুনা]
- সুরকার: কাজী নজরুল ইসলাম
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। নাত-এ-রসুল
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য
- তাল:
কাহারবা
- গ্রহস্বর: সা