বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: মোহাম্মদ মোর নয়ন-মণি মোহাম্মদ নাম জপমালা
মোহাম্মদ মোর নয়ন-মণি মোহাম্মদ নাম জপমালা।
ঐ নামে মিটাই পিয়াসা ও নাম কওসারের পিয়ালা॥
মোহাম্মদ নাম শিরে ধরি,
মোহাম্মদ নাম গলায় পরি,
ঐ নামেরি রওশনীতে আঁধার এ মন রয় উজালা॥
আমার হৃদয়-মদিনাতে
শুনি ও নাম দিনে-রাতে,
ও নাম আমার তস্বি হাতে, মন-মরুতে গুলে-লালা॥
মোহাম্মদ মোর অশ্রু-চোখের
ব্যথার সাথি শান্তি শোকের,
চাইনে বেহেশ্ত্ যদি ও নাম জপ্তে সদা পাই নিরালা॥
-
ভাবসন্ধান: গানটির মূলভাব হলো- মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি গভীর প্রেম, শ্রদ্ধা ও আত্মসমর্পণের অনুভূতি প্রকাশ করা। কবি দেখিয়েছেন, মহানবীর নাম মানুষের হৃদয়কে আলোকিত করে, দুঃখে সান্ত্বনা দেয়, আত্মাকে তৃপ্ত করে এবং আধ্যাত্মিক জীবনের পরিপূর্ণতা দান করে। তাই তাঁর কাছে পার্থিব সুখ কিংবা জান্নাতের আকাঙ্ক্ষার চেয়েও মহানবীর স্মরণ ও প্রেম অধিক মূল্যবান।
এই আদর্শে এই গানে কবি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি গভীর প্রেম, ভক্তি এবং আত্মনিবেদনের অনুভূতি
উপস্থাপন করেছেন। তাঁর কাছে মহানবীর নাম কেবল একটি নাম নয়; বরং তা জীবনের আলো, আত্মার প্রশান্তি, ঈমানের শক্তি এবং আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের এক মহামূল্যবান মাধ্যম। সমগ্র গানটি সুফি-ভাবধারার প্রেমময় ভক্তিরসে পরিপূর্ণ।
গানের শুরুতেই নবীকে 'মোর নয়ন-মণি' রূপকতায় উপস্থাপন করেছেন। এখানে নয়ন-মণি বলতে সবচেয়ে প্রিয়, অমূল্য ও হৃদয়ের ধনকে বোঝানো হয়েছে। আবার তিনি বলেছেন, মহানবীর নামই তাঁর জপমালা। অর্থাৎ তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস মহানবীর স্মরণে নিবেদিত। তিনি বিশ্বাস করেন, এই নামই তাঁর অন্তরের তৃষ্ণা নিবারণ করে।
'কওসারের পেয়ালা'-র উপমা দ্বারা কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, মহানবীর স্মরণ আত্মাকে সেইরূপ পরিতৃপ্তি দেয়, যেমন কাওসারের সুধা জান্নাতবাসীদের তৃপ্ত করবে।
এরপর কবি বলেন, তিনি মহানবীর নামকে মাথার মুকুটের মতো সম্মান করেন এবং গলার অলংকারের মতো ধারণ করেন। এটি বাহ্যিক ধারণ নয়; বরং হৃদয়ের গভীরে নবীর আদর্শ, ভালোবাসা ও অনুসরণের প্রতীক। সেই নামের রওশনী বা আলো তাঁর অন্তরের অজ্ঞতা, হতাশা ও অন্ধকার দূর করে তাকে আলোকিত করে।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি তাঁর হৃদয়কে মদিনা হিসেবে কল্পনা করেছেন। অর্থাৎ তাঁর অন্তরই নবীপ্রেমের পবিত্র আবাস। সেখানে দিন-রাত মহানবীর নাম ধ্বনিত হয়। তাঁর হাতে তাসবিহ, আর তাঁর মন, যা আগে মরুভূমির মতো শুষ্ক ছিল, নবীপ্রেমে তা গুলে-লালা (রক্তিম টিউলিপ ফুল)-এর মতো প্রস্ফুটিত হয়েছে। এখানে মরুভূমি থেকে ফুলে ভরে ওঠার চিত্র আধ্যাত্মিক রূপান্তরের প্রতীক।
গানের শেষাংশে কবি বলেন, মহানবীর নামই তাঁর দুঃখের সান্ত্বনা, ব্যথার সঙ্গী এবং শোকের প্রশান্তি। তিনি এমনকি জান্নাতের আকাঙ্ক্ষাকেও গৌণ করে দেন। তাঁর একমাত্র কামনা—নির্জনে, একাগ্রচিত্তে, সারাজীবন যেন মহানবীর নাম জপ করতে পারেন। অর্থাৎ তাঁর কাছে নবীপ্রেমই সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক আনন্দ এবং পরম প্রাপ্তি।
-
রচনাকাল ও স্থান: গানটির
রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।
১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪২), টুইন রেকর্ড
কোম্পানি থেকে গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল
৩৬ বৎসর ৩ মাস।
- গ্রন্থ:
নজরুল-সংগীত সংগ্রহ [রশিদুন্ নবী সম্পাদিত। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট। তৃতীয় সংস্করণ দ্বিতীয় মুদ্রণ, আষাঢ় ১৪২৫। জুন ২০১৮। গান
৫৫৪]
- রেকর্ড: টুইন [সেপ্টেম্বর ১৯৩৫ (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪২)। এফটি ৪০৭৫। শিল্পী:
আব্বাসউদ্দীন আহমদ]
- পত্রিকা: মোয়াজ্জিন শ্রাবণ ১৩৪৩ (জুলাই-আগষ্ট ১৯৩৬)।
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
নীলিমা দাস।
[নজরুল
সঙ্গীত স্বরলিপি, ঊনত্রিশতম খণ্ড, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা। শ্রাবণ ১৪১৩/আগষ্ট
২০০৬] ২৩ সংখ্যক গান।
আব্বাসউদ্দীন আহমদ-এর রেকর্ডে গাওয়া গান অনুসারে স্বরলিপি করা হয়েছে।
[নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। নাত-এ রসুল
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য