বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: হে মদিনার বুলবুলি গো গাইলে তুমি কোন গজল
হে মদিনার বুলবুলি গো গাইলে তুমি কোন গজল।
মরুর বুকে উঠল ফুটে প্রেমের রঙিন গোলাপ দল॥
দুনিয়ার দেশ-বিদেশ থেকে, গানের পাখি উঠল ডেকে
মুয়াজ্জিনের আজান ধ্বনি উঠল ভেদি গগন তল॥
সাহারার দগ্ধ বুকে রচ তুমি গুলিস্তান
সেথা আস্হাব সব ভ্রমর হয়ে শাহাদতের গাইল গান।
দোয়েল কোকিল দলে দলে আল্লা রসুল উঠল ব'লে
আল্ কোরানের পাতার কোলে খোদার নামের বইল ঢল॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আবির্ভাবকে মরুভূমিতে গোলাপ ও গুলিস্তান ফুটে ওঠার রূপকে প্রকাশ করা হয়েছে। তাঁর তাওহিদ, প্রেম, মানবতা ও কোরআনের বাণী অজ্ঞতার মরুভূমিকে ঈমান ও নৈতিকতার বাগানে পরিণত করেছে। আজান, কোরআন, সাহাবিদের আত্মত্যাগ এবং সর্বত্র আল্লাহ-রাসুলের নামের ধ্বনির মাধ্যমে সেই আধ্যাত্মিক নবজাগরণের চিত্রই ফুটে উঠেছে।
এই ভাবাদর্শে কবি মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আবির্ভাবকে মরুভূমির বুকে ফুটে ওঠা এক অপূর্ব গোলাপ ও গুলিস্তানের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
'মদিনার বুলবুলি' বলতে এখানে মহানবী (সা.)-কে রূপকভাবে বোঝানো হয়েছে; তাঁর কণ্ঠের বাণী ও ইসলামের আহ্বানকে কবি বুলবুলের মধুর গানের সঙ্গে তুলনা করেছেন। গানের প্রধান ভাব হলো—অজ্ঞতা ও নৈতিক অন্ধকারের মধ্যে নবীজীর আগমনে প্রেম, ঈমান ও সত্যের নবজাগরণ।
গানের শুরুতে কবি মদিনার বুলবুলকে প্রশ্ন করছেন- তুমি এমন কোন গজল গেয়েছিলে, যার সুরে মরুভূমির বুকেও প্রেমের রঙিন গোলাপ ফুটে উঠল? এখানে মরু হলো ইসলাম-পূর্ব আরবের অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও নৈতিক শূন্যতার প্রতীক; আর রঙিন গোলাপ হলো নবীপ্রেম, ঈমান, মানবতা ও ইসলামের সৌন্দর্যের প্রতীক।
এরপর সেই গানের প্রভাব সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ার চিত্র আঁকা হয়েছে। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে যেন অসংখ্য গানের পাখি সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে জেগে উঠেছে। মসজিদের মুয়াজ্জিনের আজান আকাশ-বাতাস ভেদ করে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। অর্থাৎ মহানবী (সা.)-এর তাওহিদের আহ্বান আরবের সীমানা অতিক্রম করে বিশ্বমানবতার কাছে পৌঁছে গেছে।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি বলেন, মহানবী (সা.) সাহারার দগ্ধ বুকে গুলিস্তান রচনা করেছেন। অর্থাৎ যে সমাজ ছিল হিংসা, গোত্রদ্বন্দ্ব, অজ্ঞতা ও নৈতিক অবক্ষয়ে জর্জরিত, তাঁর শিক্ষা সেই সমাজে শান্তি, ভ্রাতৃত্ব, প্রেম ও ন্যায়ের বাগান সৃষ্টি করেছে। তাঁর সাহাবিরা সেই গুলিস্তানের ভ্রমরের মতো নবীপ্রেমে মগ্ন হয়ে সত্য ও ঈমানের জন্য আত্মত্যাগের গান গেয়েছেন। এখানে শাহাদত আত্মত্যাগ ও সত্যের পথে জীবন উৎসর্গের প্রতীক।
গানটির শেষাংশে দোয়েল, কোকিল ও অন্যান্য পাখি-র কাব্যিক চিত্রের মাধ্যমে সমগ্র সৃষ্টিজগতের নবীপ্রেম ও আল্লাহর স্মরণে মুখর হয়ে ওঠার কথা বলা হয়েছে। চারদিকে যেন শুধু ‘আল্লাহ-রাসুল’ ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে এবং কোরআনের পাতায় আল্লাহর নামের বাণী প্রবাহিত হচ্ছে। অর্থাৎ মহানবী (সা.)-এর মাধ্যমে তাওহিদ ও কোরআনের বাণী মানুষের হৃদয়ে এমনভাবে প্রবেশ করেছে যে, সমগ্র জীবন ও প্রকৃতি যেন সেই ঈমানের সুরে সুরেলা হয়ে উঠেছে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু
জানা যায় না। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের আগষ্ট (শ্রাবণ-ভাদ্র ১৩৪৪) মাসে,
টুইনি রেকর্ড কোম্পানি
এই গানের একটি রেকর্ড প্রকাশ করেছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৮
বৎসর ২
মাস।
- গ্রন্থ:
-
বনগীতিকা
- দ্বিতীয় সংস্করণ [১৩৫৯ বঙ্গাব্দের
১১ই জ্যৈষ্ঠ (২৫ মে, ১৯৫২)]
- নজরুল রচনাবলী সপ্তম খণ্ড [কার্তিক
১৪১৯, নভেম্বর ২০১২।
বনগীতি দ্বিতীয় খণ্ড। ৩।
শিরোনাম তিরোধান।
পৃষ্ঠা ১১৫]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি
২০১২)। ৫৭৭ সংখ্যক গান। তাল:
কাহারবা।
পৃষ্ঠা: ১৭৮।
- রেকর্ড:
- টুইন [আগষ্ট ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দ (শ্রাবণ-ভাদ্র ১৩৪৪)]। এফটি. ১২০৪৬। শিল্পী: আব্দুল লতিফ।
- সুরকার: সুবল দাশগুপ্ত
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। নাত-এ-রসুল। বন্দনা।
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের গান