বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: হে পার্থসারথি! বাজাও বাজাও পাঞ্চজন্য শঙ্খ
হে পার্থসারথি! বাজাও বাজাও পাঞ্চজন্য শঙ্খ
চিত্তের অবসাদ দূর কর কর দূর
ভয়-ভীত জনে কর হে নিঃশঙ্ক॥
ধনুকে টঙ্কার হানো হানো,
গীতার মন্ত্রে জীবন দানো;
ভোলাও ভোলাও মৃত্যু-আতঙ্ক॥
মৃত্যু জীবনের শেষ নহে নহে
-
শোনাও শোনাও
-
অনন্ত কাল ধরি'
অনন্ত জীবন প্রবাহ বহে।
দুর্মদ দুরন্ত যৌবন-চঞ্চল
ছাড়িয়া আসুক মা'র স্নেহ-অঞ্চল;
বীর সন্তানদল করুক সুশোভিত মাতৃ-অঙ্ক॥
- ভাবসন্ধান: ভয় ও অবসাদ অতিক্রম করে জ্ঞান, সাহস, কর্তব্য ও আত্মত্যাগের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান
পাওয়া যায় এই গানে। এই গানে শ্রীকৃষ্ণ জাগরণ ও আত্মশক্তির প্রতীক। তাই গানের
শুরুতেই কবি পার্থসারথি তথা শ্রীকৃষ্ণের কাছে শক্তি, সাহস ও কর্মপ্রেরণার আহ্বান জানিয়েছেন। মহাভারতের কুরুক্ষেত্রের প্রেক্ষাপটে কৃষ্ণ যেমন অর্জুনের বিষাদ ও সংশয় দূর করে তাঁকে কর্তব্যপথে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, তেমনি কবিও চান—মানুষের হৃদয় থেকে ভয়, অবসাদ ও মৃত্যুভীতি দূর হয়ে নতুন সাহস ও জীবনশক্তির সঞ্চার হোক।
এখানে কৃষ্ণ শুধু অর্জুনের যুদ্ধরথের সারথি নন, তিনি তাঁর মনের রথেরও সারথি। যুদ্ধের
আহবানে তাঁর পাঞ্চজন্য শাঁখে ধ্বনিতি হয়। এখানে এই ধ্বনি শুধু যুদ্ধের আহ্বান নয়; এটি জাগরণ, সাহস ও কর্তব্যের আহ্বানের প্রতীক। মানুষের চিত্তে যে দুর্বলতা, হতাশা ও অবসাদ জমে আছে, সেই শঙ্খধ্বনিতে তা দূর হয়ে যাক।
ভয় মানুষের কর্মশক্তিকে স্তব্ধ করে। তাই কবি চান, কৃষ্ণের বাণী ও শক্তিতে ভীত মানুষের মনে নির্ভয়তা জাগুক; তারা দুর্বলতা অতিক্রম করে দৃঢ়চিত্ত হয়ে উঠুক। ধনুর টঙ্কার সক্রিয় কর্ম ও সংগ্রামের প্রতীক, আর গীতার মন্ত্র জ্ঞান, কর্তব্যবোধ ও আত্মশক্তির প্রতীক। শুধু অস্ত্রের শক্তি নয়, জীবনের প্রকৃত শক্তি আসে সঠিক জ্ঞান ও কর্তব্যবোধ থেকে। তাই কবি চান, গীতার আদর্শ মানুষের নিষ্প্রাণ জীবনে নতুন প্রাণ সঞ্চার করুক।
মৃত্যুর ভয় মানুষকে পিছিয়ে দেয়। কিন্তু গীতার দর্শন অনুযায়ী আত্মা অবিনশ্বর; দেহের মৃত্যু জীবনের পরম সমাপ্তি নয়। তাই কৃষ্ণের বাণীতে মানুষ যেন মৃত্যুভয় অতিক্রম করে কর্তব্যপথে অগ্রসর হতে পারে।
তাই কবি মনে করেন- মৃত্যুতে জীবনের সবকিছু শরষ হয়ে যায় না। দেহের মৃত্যু থাকলেও জীবনধারা অনন্ত। কবি শুনতে চান সেই চিরন্তন সত্যের বাণী-
'অনন্ত জীবন প্রবাহ বহে'। এখানে জীবনকে একটি অবচ্ছিন্ন প্রবাহ হিসেবে দেখা হয়েছে; একটি জীবনের সমাপ্তিই অস্তিত্বের চূড়ান্ত অবসান নয়।
গানের শেষাংশে গানটি ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিকতার সীমা ছাড়িয়ে জাতীয় জাগরণের আহ্বানে পরিণত হয়েছে।
কবির প্রত্যাশা মায়ের স্নেহময় আশ্রয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে থাকা তরুণরা যেন সেই আরাম ও নিরাপত্তার সীমা অতিক্রম করে বৃহত্তর কর্তব্যের আহ্বানে সাড়া দেয়। তাদের যৌবনের শক্তি, সাহস ও উদ্যম যেন দেশের কাজে নিয়োজিত হয়।
এখানে 'মাতৃ-অঙ্ক' মূলত মাতৃভূমির প্রতীক। দেশের বীর সন্তানরা আত্মত্যাগ, সাহস ও কর্মের মাধ্যমে মাতৃভূমিকে গৌরবান্বিত করুক- এই দেশাত্মবোধক আকাঙ্ক্ষাই
এই গানের মূল লক্ষ্য হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু
জানা যায় না।
১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪১) মাসে, এইচএমভি এই গানের একটি
রেকর্র্ড প্রথম প্রকাশ করেছিল।এই
সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৫ বৎসর ৪ মাস।
- গ্রন্থ:
-
শেষ সওগাত
- প্রথম সংস্করণ [২৫শে বৈশাখ ১৩৬৫ (বৃহস্পতিবার, ৪ মে
১৯৫৮)। শিরোনাম: পার্থ-সারথি]
- নজরুল রচনাবলী ষষ্ঠ খণ্ড [জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯, জুন ২০১২। শেষ
সওগাত শিরোনাম: পার্থ-সারথি। পৃষ্ঠা ১২৩]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহহ (নজরুল ইন্সটিটিউট, মাঘ, ১৪১৭/ফেব্রুয়ারি, ২০১৪)। গান সংখ্যা ৬৫০। পৃষ্ঠা: ১৯৭।
- পত্রিকা:
নবারুণ [১৩৪৩। জগৎঘটক-কৃত স্বরলিপি-সহ মুদ্রিত হয়েছিল]
- রেকর্ড: এইচএমভি [অক্টোবর ১৯৩৪ (আশ্বিন-কার্তিক
১৩৪১)]। এন ৭২৯৫। শিল্পী: মৃণালকান্তি ঘোষ।
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ। জাগরণ
-
সুরাঙ্গ:
ভজন