বিষয়:
নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম
:
ফোরাতের পানিতে নেমে
ফোরাতের পানিতে নেমে
ফাতেমা দুলাল কাঁদে অঝোর নয়নে রে॥
দু' হাতে তুলিয়া পানি
ফেলিয়া দিলেন অমনি
— পড়িল কি মনে রে॥
দুধের ছাওয়াল আসগর এই পানি চাহিয়ে রে,
দুশ্মনের তীর খেয়ে বুকে ঘুমাল খুন্ পিয়ে রে;
শাদির নওশা কাশেম শহীদ এই পানি বিহনে রে॥
এই পানিতে মুছিল রে হাতের মেহেদী সকিনার,
এই পানিরই ঢেউয়ে ওঠে, তারি মাতম্ হাহাকার;
শহীদানের খুন মিশে আছে, এই
পানিরই সনে রে॥
বীর আব্বাসের বাজু শহীদ হ'ল এরি তরে রে,
এই পানির বিহনে জয়নাল খিয়াম তৃষ্ণায় মরে রে;
শোকে শহীদ হ'লেন হোসেন জয়ী হয়েও রণে রে॥
-
ভাবসন্ধান: এই গানে কবি কারবালার মর্মান্তিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইমাম হোসেন ও তাঁর পরিবারবর্গের আত্মত্যাগ, তৃষ্ণা, শোক এবং সত্য ও ন্যায়ের জন্য আত্মোৎসর্গের মহিমা তুলে ধরেছেন। গানের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফোরাত (ইউফ্রেটিস) নদীর পানি, যা এখানে শুধু একটি নদীর জল নয়; বরং অপূর্ণ তৃষ্ণা, সীমাহীন বেদনা এবং শাহাদতের এক শক্তিশালী প্রতীক।
গানের শুরুতে দেখা যায়, মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর কন্যা ফাতিমা (রা.)-র দুলাল হুসাইন ইবনে আলী
(রা.)- ফোরাতের পানিতে নেমে অঝোরে কাঁদছেন। তিনি দুই হাতে পানি তুলেও পান করতে পারেন না; কারণ এই পানি তাঁকে কারবালার সেই হৃদয়বিদারক ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
এরপর কবি স্মরণ করেছেন শিশু আলী আল-আসগর ইবনে হুসাইন (রা.)-কে। তৃষ্ণায় কাতর এই শিশুর জন্য এক ফোঁটা পানিও জোটেনি; বরং শত্রুর নিক্ষিপ্ত তীরে তিনি শহীদ হন। একই সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে কাসিম ইবনে হাসান
(রা.)-এর কথা, যিনি নববিবাহিত অবস্থায় যুদ্ধক্ষেত্রে শহীদ হন এবং তৃষ্ণার্ত অবস্থাতেই জীবন উৎসর্গ করেন।
গানটির পরবর্তী অংশে সাকিনা বিনতে হুসাইন (রা.)-এর করুণ স্মৃতি উঠে এসেছে। তাঁর হাতের মেহেদি ধুয়ে যায় অশ্রু ও শোকের জলে; ফোরাতের প্রতিটি ঢেউ যেন আজও সেই বিলাপ বহন করে চলেছে। কবি কাব্যিক ভাষায় বলেছেন, এই নদীর পানির সঙ্গে শহীদদের রক্ত যেন চিরদিনের জন্য মিশে আছে। এর মাধ্যমে ফোরাত নদী ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষীতে পরিণত হয়েছে।
এরপর স্মরণ করা হয়েছে আব্বাস ইবনে আলী (রা.)-কে, যিনি শিবিরে পানি পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ফোরাতের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন। পানির মশক নিয়ে ফিরে আসার আগেই তাঁর উভয় বাহু বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং তিনি শাহাদত বরণ করেন। তাঁর আত্মত্যাগ ইসলামী ঐতিহ্যে সাহস, বিশ্বস্ততা ও আত্মোৎসর্গের অনন্য দৃষ্টান্ত। একই সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে আলী ইবনে হুসাইন জয়নুল আবেদীন
(রা.)-এর কথা, যিনি অসুস্থ অবস্থায় কারবালার শিবিরে তৃষ্ণা ও দুঃখের মধ্যে দিন কাটিয়েছিলেন।
গানের শেষাংশে কবি বলেন, ইমাম হোসেন (রা.) যুদ্ধক্ষেত্রে নৈতিক ও আদর্শিক অর্থে বিজয়ী হয়েও শোকের ভারে শাহাদত বরণ করেন। এখানে
'জয়ী হয়েও রণে' কথাটির অর্থ সামরিক বিজয় নয়; বরং সত্য, ন্যায়, মানবমর্যাদা ও ধর্মীয় আদর্শ রক্ষায় তাঁর চূড়ান্ত সাফল্য। তিনি জীবন হারালেও তাঁর আদর্শ পরাজিত হয়নি; বরং অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক চিরন্তন প্রতীক হয়ে ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।
-
রচনাকাল ও স্থান: গানটির
রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।
১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে (চৈত্র ১৩৪২-বৈশাখ ১৩৪৪), টুইন রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল
৩৬ বৎসর ১০ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
৬৫৬।
- রেকর্ড:
- টুইন। এপ্রিল ১৯৩৬ (চৈত্র ১৩৪২- বৈশাখ ১৩৪৩)। এফটি ৪৩২৮। শিল্পী: আব্বাসউদ্দীন আহমদ
- ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ জুলাই (সোমবার ১১ শ্রাবণ ১৩৪৩) নজরুলের সাথে রেকর্ড
কোম্পানির চুক্তি হয়। এই তালিকায় গানটি ছিল।
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম ধর্ম। মর্সিয়া
- সুরাঙ্গ: মর্সিয়া