বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: হে মদিনাবাসী প্রেমিক ধর হাত মম
হে মদিনাবাসী প্রেমিক ধর হাত মম॥
জ্বলওয়া দেখালে দিল হরিলে বন্ধু হলো বেগানা
হেসে হেসে সংসার কহে দীওয়ানা এ দীওয়ানা॥
বিরহের এ রাত একেলা কেঁদে হলো ভোর
হৃদয়ে মোর শান্তি নাহি কাঁদে পরান মোর॥
দুখের দোসর কেউ নাহি মোর নাই ব্যথী ব্যথার
তোমায় ভুলে ভাসি অকূলে পার করো সরকার॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি এক ভক্তের গভীর প্রেম, বিরহ, আত্মসমর্পণ এবং তাঁর অনুগ্রহে আধ্যাত্মিক মুক্তি লাভের আকুল প্রার্থনা প্রকাশিত হয়েছে। নবীর আদর্শ ও সান্নিধ্যই মানুষের হৃদয়ে প্রকৃত শান্তি এনে দেয় এবং জীবনের বিভ্রান্তি থেকে মুক্তির পথ দেখায়—এই ভাবই গানের মূল প্রতিপাদ্য।
এই ভাবাদর্শে রচিত এই গানে কবি মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি এক ভক্তের গভীর প্রেম, বিরহ, আত্মসমর্পণ এবং আধ্যাত্মিক আশ্রয় লাভের আকুল আকাঙ্ক্ষাকে সুফি ভাবধারার আলোকে প্রকাশ করেছেন। এখানে নবীপ্রেম এমন এক প্রেম, যা মানুষকে পার্থিব আসক্তি থেকে মুক্ত করে পরম সত্যের দিকে নিয়ে যায়।
গানের শুরুতে কবি মদিনার অধিবাসী মহানবী (সা.)-কে সম্বোধন করে তাঁর হাত ধরার আকুল আবেদন জানান। এখানে ‘হাত ধরা’ বলতে শারীরিক স্পর্শ নয়; বরং তাঁর আদর্শ, দয়া ও পথনির্দেশের আশ্রয় গ্রহণকে বোঝানো হয়েছে। কবি বিশ্বাস করেন, নবীর সান্নিধ্যই তাঁকে সঠিক পথে পরিচালিত করবে।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি বলেন, মহানবী (সা.)-এর ঐশী সৌন্দর্য ও মহিমার (জলওয়া) এক ঝলক দেখেই তাঁর হৃদয় সম্পূর্ণভাবে নবীপ্রেমে মুগ্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে তিনি সংসারের মোহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। চারপাশের মানুষ তাঁর এই গভীর প্রেমকে বুঝতে না পেরে তাঁকে ‘দেওয়ানা’ বা পাগল বলে উপহাস করে। কিন্তু এই ‘দেওয়ানাপনা’ আসলে ঈশ্বরপ্রেম ও নবীপ্রেমে আত্মবিসর্জনের প্রতীক, যা সুফি সাহিত্যে এক উচ্চতর আধ্যাত্মিক অবস্থার পরিচায়ক।
এরপর কবি নিজের অন্তরের বিরহবেদনার কথা প্রকাশ করেন। নবীর সান্নিধ্য ও অনুগ্রহ থেকে দূরে থাকার অনুভূতিতে তাঁর রাত কেঁদে কেঁদে ভোর হয়ে যায়। তাঁর হৃদয়ে কোনো শান্তি নেই; অন্তর সর্বদা অশান্ত ও ব্যাকুল। এই বিরহ কেবল শারীরিক দূরত্বের নয়, বরং আধ্যাত্মিক নৈকট্যের জন্য এক গভীর আকাঙ্ক্ষা।
গাননটির শেষাংশে কবি বলেন, তাঁর দুঃখের ভাগ নেওয়ার মতো কেউ নেই। তিনি স্বীকার করেন, কখনো কখনো তিনি নবীর আদর্শ ও স্মরণ থেকে বিচ্যুত হয়ে জীবনের উত্তাল স্রোতে পথ হারিয়ে ফেলেন। তাই তিনি মহানবী (সা.)-কে ‘সরকার’ বলে সম্বোধন করে প্রার্থনা করেন, যেন তিনি তাঁকে এই ভ্রান্তি ও দুঃখের সাগর থেকে উদ্ধার করে মুক্তির তীরে পৌঁছে দেন। এখানে ‘অকূলে ভাসা’ জীবনের বিভ্রান্তি ও আধ্যাত্মিক পথভ্রষ্টতার প্রতীক, আর ‘পার করা’ মানে সত্য, শান্তি ও মুক্তির পথে পরিচালিত করা।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু
জানা যায় না। ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ (ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৪২) মাসে, এইচএমভি
রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৬ বৎসর ৯ মাস।
- গ্রন্থ:
নজরুল-সঙ্গীত
সংগ্রহ, [নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২। সংখ্যা ৭১৯]
- রেকর্ড:
এইচএমভি।
মার্চ ১৯৩৬ (ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৪২)। এফটি ৭৪৯৯। শিল্পী: পিয়ারু কাওয়াল
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
আহসান মুর্শেদ।
নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি (ঊনবিংশ খণ্ড)।
২৪ সংখ্যক গান]
[নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। সুফিবাদ। নাত-এ-রসুল
- সুরাঙ্গ: কাওয়ালি