বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ
বাংলাদেশে সব ধরনের সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোটার ভিত্তিতে নিয়োগের প্রচলিত ব্যবস্থার সংস্কারের দাবির প্রেক্ষিতে গঠিত একটি সংগঠন।

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে প্রচলিত কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ ছিল। কোটা ব্যবস্থা অনুযায়ী, মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিদের জন্য ৩০%, নারীদের জন্য ১০%, উপজাতিদের জন্য ৫% এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য ১% কোটা সংরক্ষিত ছিল। এতে ৫৬% কোটা বরাদ্দ থাকায় মেধার ভিত্তিতে চাকরির প্রার্থীরা নিয়োগে বঞ্চিত হচ্ছিলেন বলে শিক্ষার্থীরা দাবি করছিলেন। এই পরিস্থিতিতে ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দে থেকে কোটা সংস্কারের জন্য বিষয়টি প্রবল হয়ে উঠতে থাকে।

২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি থেকে ধারাবাহিকভাবে বিক্ষোভ এবং মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। এই সূত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে 'বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ' আত্মপ্রকাশ করে।
২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় জাদুঘরের সামনে প্রায় ২০০০ শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে এই পর্ষদ প্রথম কর্মসূচি উপস্থাপন করে। কর্মসূচির সভাপতিত্ব করেন প্রথম আহবায়ক রাজু আহমেদ। পরবর্তী সময়ে প্রশাসনের চাপে তিনি দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলাভবনের সামনে ২০ ফেব্রুয়ারি হাসান আল মামুন আহ্বায়ক হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই সময় নুরুল হক নুর ও হাসান আল মামুনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার পরিষদ।

এই আন্দোলন দ্রুত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে শিক্ষার্থীরা ব্যাপকভাবে রাস্তায় নেমে আসে এবং দেশব্যাপী বিক্ষোভ, রাস্তা অবরোধ এবং ধর্মঘটের ডাক দেয়।

 এই আন্দোলনের পাঁচটি মূল দাবি উত্থাপন করা হয়েছিল। এগুলো হলো-

১. কোটার পরিমাণ হ্রাস: সরকারি চাকরিতে কোটার পরিমাণ ৫৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে নিয়ে আসা।
২. মেধায় নিয়োগ: কোটায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে শূন্য পদগুলোতে মেধা তালিকা থেকে নিয়োগ দেওয়া।
৩. বিশেষ নিয়োগ পরীক্ষা নয়: সরকারি চাকরিতে কোনো ধরনের বিশেষ নিয়োগ পরীক্ষা বন্ধ করা (অর্থাৎ সবার জন্য অভিন্ন প্রশ্ন ও পরীক্ষা নিশ্চিত করা)।
৪. অভিন্ন বয়সসীমা: সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোটাধারী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য বয়সসীমা একই (৩০ বছর) করা।
৫. কোটা ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা: নিয়োগ পরীক্ষায় কোটা সুবিধা একাধিকবার ব্যবহার না করা (অর্থাৎ কেবল একবারই এই সুবিধা গ্রহণ করা যাবে)।

বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের হামলা হয় এবং অনেক শিক্ষার্থী আহত হয়। এসব ঘটনার ফলে আন্দোলন আরও জোরদার হয়। 

২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের  ১১ই এপ্রিল তৎকালীন  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে ঘোষণা দেন যে, সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করা হবে।
তাঁর এই ঘোষণা আন্দোলনকারীদের মধ্যে স্বস্তি আনে। কিন্তু এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক গেজেট প্রকাশ না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা আবারও আন্দোলনে নামে। কারণ গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত রাখার কোনো সিদ্ধান্ত সে সময়ে গ্রহণ করা হয়নি। পরবর্তী সময় সরকার একটি কমিটি গঠন করে কোটার সংস্কার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য কাজ শুরু করে, তবে এতে সময়ক্ষেপণ হওয়ায় শিক্ষার্থীরা ফের অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠে।

দীর্ঘ ও তীব্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী ছাত্র সংগঠনে পরিণত হয়। আন্দোলনের সাফল্যের পর, এই সংগঠনটি শিক্ষার্থীদের অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং গণতন্ত্রের সুরক্ষার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে থাকে।

২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে এটি বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ নামে পূর্ণাঙ্গ ছাত্র সংগঠনে রূপান্তরিত হয়, যার লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভূমিকা রাখা।

২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের জন্য সংগঠনটি ২৫ ফেব্রুয়ারি নিজেদের প্যানেল ঘোষণা করে। প্যানেলের সহ-সভাপতি প্রার্থী নুরুল হক নুর, সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী রাশেদ খাঁন এবং সহকারী সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী মোঃ ফারুক হোসেন মনোনীত হন। এই নির্বাচনে   নুরুল হক নুর জয়লাভ করলেও বাকি পদগুলো ছাত্রলীগের অধিকারের চলে যায়।

২০২১ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ই আগষ্ট বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের প্রথম কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিন ইয়ামিন মোল্লা সভাপতি ও আরিফুল ইসলাম আদীব সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হযন। সাংগঠনিক সম্পাদক হয়েছিলেন মোল্লা রহমতুল্লাহ।

২০২৩ খ্রিষ্টাব্দের ২রা অক্টোবর বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ থেকে বেরিয়ে এসে ৪ঠা অক্টোবর 'গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি নামক একটি ছাত্রসংগঠন গড়ে ওঠে।

২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ই সেপ্টেম্ব ্রিঃবাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের দ্বিতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়  । এতে বিন ইয়ামিন মোল্লা সভাপতি ও নাজমুল হাসান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন।