ইরাবতী নদী
Irrawaddy
১.
মিয়ানমারের প্রধান এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদী। এটিকে
মিয়ানমারের 'জীবনরেখা' বলা হয়, কারণ দেশটির অর্থনীতি, কৃষি এবং পরিবহন ব্যবস্থা এই নদীর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
ইরাবতী নামের কয়েকটি সূত্র উল্লেখ করা হয়। যেমন-
- সংস্কৃত শব্দ 'ঐরাবতী' থেকে এসেছে। এর অর্থ হলো "জলপূর্ণ" বা "যিনি জল ধারণ করেন"।
- পালি ভাষায় একে বলা হয় 'এরাবতী'।
- হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, ইন্দ্রের বাহন সাদা হাতিটির নাম 'ঐরাবত'। ধারণা করা হয়, হাতির মতো শক্তিশালী এবং বিশাল এই নদীর নামকরণ সেই পবিত্র হাতির নামানুসারেই করা হয়েছে। হিন্দু ও বৌদ্ধ পুরাণের ইন্দ্রের বাহন 'ঐরাবত'
নামক সাদা হাতিকে নিয়ে। বলা হয়, এই হাতিটি যখন স্বর্গ থেকে মর্ত্যে নেমে এসেছিল, তার বিশাল শুঁড় দিয়ে সে মাটিতে যে গভীর রেখা টেনেছিল, সেখান থেকেই এই বিশাল নদীর সৃষ্টি। একারণেই এর নাম 'ঐরাবতী' বা 'ইরাবতী'।
- ইতিহাসবিদদের মতে, ভারত থেকে যখন ব্রাহ্মণ ও বৌদ্ধ ভিক্ষুরা মিয়ানমারে যান, তাঁরা তাদের পরিচিত নদী ও স্থানের নামগুলো এই নতুন ভূমিতে ব্যবহার শুরু করেন। এভাবেই মিয়ানমারের প্রধান নদীটি 'ইরাবতী' নাম পায়।
- প্রাচীন গ্রিক ভূগোলবিদ টলেমি তাঁর মানচিত্রে এই নদীটিকে 'টেম্বালা'
(Temala) বা 'এয়ারাবাস'
(Airabas) হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন, যা মূলত ইরাবতী নামেরই বিকৃত রূপ।
মিয়ানমারের প্রাচীন পুঁথিগুলোতে একে প্রায়ই 'মহানন্দা' বা 'ধন্যবতী নদী' হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে, তবে সব ছাপিয়ে 'ইরাবতী' নামটিই বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি পায়।
মিয়ানমারের স্থানীয় ভাষায় একে বলা হয় 'আইয়ারওয়াদি'
(Ayeyarwady)।
১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে মিয়ানমার সরকার ঔপনিবেশিক ইংরেজি বানান
'Irrawaddy'
পরিবর্তন করে স্থানীয় উচ্চারণের সাথে মিল রেখে 'Ayeyarwady' নামকরণ করে।
স্থানীয় লোকজ বিশ্বাসে 'আইয়ার' মানে ঠান্ডা বা শান্ত এবং 'ওয়াদি' মানে নদী বা জলধারা।
প্রতীকী গুরুত্ব
মিয়ানমারের সংস্কৃতিতে ইরাবতী কেবল একটি নদী নয়, এটি একটি দৈব সত্তা।
মিয়ানমারের মানুষ বিশ্বাস করে যে, এই নদী তাদের দেশের সমৃদ্ধি ও পবিত্রতার প্রতীক। ধান্যবতী বা বৈশালী (উজালী) নগরীর মতো প্রাচীন সভ্যতাগুলো এই নদীর অববাহিকার উর্বরতা থেকেই পুষ্টি লাভ করেছিল।
- ড্রাগন বা নাগা মিথ: মিয়ানমারের শান এবং কাচিন
ক্ষুদ্রনৃগোষ্ঠীদের মতে, ইরাবতী নদীটি আসলে একটি বিশাল ড্রাগন বা নাগা। এই ড্রাগনটি উত্তর থেকে দক্ষিণে যাওয়ার সময় তার লেজের ঝাপটায় পাহাড়-পর্বত কেটে পথ তৈরি করেছে। নদীর বাঁকগুলোকে ড্রাগনের শরীরের মোচড় হিসেবে কল্পনা করা হয়।
- ইরাবতী ডলফিনের আধ্যাত্মিক সংযোগ: নদীর তীরবর্তী জেলেরা বিশ্বাস করেন, ইরাবতী ডলফিনগুলো নদীর আত্মা বা রক্ষক। কোনো জেলে বিপদে পড়লে ডলফিনরা তাকে পথ দেখায়। এমনকি ডলফিনরা চাইলে মানুষের রূপ ধরে ডাঙায় উঠে আসতে পারে।
উত্তর
মিয়ানমারের কাচিন রাজ্যে এন'মাই এবং মালি নামক দুটি নদীর মিলনে ইরাবতী নদীর সৃষ্টি। এই নদী দুটির উৎস হিমালয় পর্বতমালার দক্ষিণ হিমবাহে।
এটি প্রায় ২,১৭০ কিলোমিটার (১,৩৫০ মাইল) দীর্ঘ। উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে এটি মিয়ানমারকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে এবং শেষ পর্যন্ত আন্দামান সাগরে পতিত হয়েছে।
ইরাবতী নদী মোহনার কাছে এসে অসংখ্য শাখায় বিভক্ত হয়ে একটি বিশাল বদ্বীপ সৃষ্টি করেছে। এই বদ্বীপ অঞ্চলটি বিশ্বের অন্যতম প্রধান ধান উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। একে মিয়ানমারের 'ভাতের ঝুড়ি' বলা হয়।
ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
- মিয়ানমারের প্রাচীন রাজধানীগুলো (যেমন:
প্যাগান, আভা, অমরপুরা এবং মান্দালয়) এই নদীর তীরেই গড়ে উঠেছিল।
- প্রাচীনকাল থেকে এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং চীনের সাথে বাণিজ্যের প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
- বিখ্যাত এ্যানিয়াথিয়ান সভ্যতা এবং ধান্যবতী-বৈশালীর মতো রাজ্যগুলোর বিকাশে এই নদীর ভূমিকা ছিল অপরিসীম।
নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ইতিহাস:
ভূতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গবেষণায় দেখা গেছে, ইরাবতী নদী সবসময় আজকের মতো এক পথে চলেনি। এর গতিপথ পরিবর্তনের ইতিহাস বেশ নাটকীয়।
যেমন-
- সিততাং নদীর সাথে সংযোগ (প্রাচীনকাল): ভূতত্ত্ববিদদের মতে, লক্ষ লক্ষ বছর
আগে ইরাবতী নদী বর্তমানের মতো সরাসরি দক্ষিণে আন্দামান সাগরে পড়ত না। এর একটি
বিশাল অংশ বর্তমানের সিততাং নদীর উপত্যকা দিয়ে প্রবাহিত হতো। ভূ-তাত্ত্বিক পরিবর্তনের কারণে এবং হিমালয় থেকে আসা অতিরিক্ত পলির চাপে নদীটি তার গতিপথ পশ্চিমে সরিয়ে নেয়।
- চিন্ডউইন নদীর মিলন: ইরাবতীর সবচেয়ে বড় উপনদী হলো চিন্ডউইন। ধারণা করা হয়, এক সময় চিন্ডউইন নিজেই একটি স্বতন্ত্র নদী ছিল যা সাগরে পড়ত। কিন্তু প্লেট টেকটোনিক্সের কারণে ভূমি উঁচু-নিচু হওয়ায় এটি ইরাবতীর সাথে মিলে গিয়ে একটি বিশাল জলধারা তৈরি করে।
- বদ্বীপ বা ডেল্টার বিস্তার: গত ২,০০০ বছরে ইরাবতী নদীর মোহনা সমুদ্রের দিকে কয়েকশ কিলোমিটার এগিয়ে গেছে। নদীর বয়ে আনা পলির কারণে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৫০ মিটার করে নতুন ভূমি তৈরি হচ্ছে। একারণেই এক
কালের উপকূলীয় শহরগুলো (যেমন প্রাচীন প্রম বা পিঁয়াই) এখন সাগর থেকে অনেক দূরে অবস্থিত।
- বাগান সাম্রাজ্যের প্রভাব: ১০ম থেকে ১৩শ শতাব্দীতে বাগান সাম্রাজ্যের সময় বনের গাছ উজাড় করার ফলে নদীতে পলি জমার পরিমাণ বেড়ে যায়। এর ফলে নদীর বুক চওড়া হতে থাকে এবং ছোট ছোট দ্বীপ তৈরি হয়, যা নদীর মূল স্রোতকে বারবার অন্যদিকে সরিয়ে দিয়েছে।
ইরাবতীর কারণে ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাবসমূহ
- আভা সাম্রাজ্য:
আভা ছিল প্রায় ৪০০ বছর ধরে মিয়ানমারের রাজধানী। এটি ইরাবতী ও মাইতঙ্গে নদীর মিলনস্থলে একটি কৃত্রিম দ্বীপে অবস্থিত ছিল।
গতিপথের প্রভাব: ১৯শ শতাব্দীর শুরুর দিকে ইরাবতী নদী তার মূল স্রোতধারা পরিবর্তন করতে শুরু করে। নদীটি আভা শহর থেকে দূরে সরে যেতে থাকে, যার ফলে শহরের চারপাশের রক্ষামূলক পরিখাগুলো শুকিয়ে যায়।
তাছাড়া নদীর নাব্য হারিয়ে যাওয়ায় বড় জাহাজগুলো আর আভা বন্দরে ভিড়তে পারছিল না। এর ফলে শহরের অর্থনৈতিক গুরুত্ব কমে যায়।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ: ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দের এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে নদী অববাহিকার আমূল পরিবর্তন ঘটে এবং শহরের অধিকাংশ স্থাপনা ধসে পড়ে। নদী সরে যাওয়ায় শহরটি তার প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্যিক সুবিধা হারিয়ে ফেলে, যা রাজাকে বাধ্য করে রাজধানী অমরপুরাতে সরিয়ে নিতে।
- বাগান সাম্রাজ্য: পরিবেশগত বিপর্যয় ও নদীর ভূমিকা
বাগান ছিল মিয়ানমারের ইতিহাসে বৌদ্ধ সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র। এর পতনে নদীর ভূমিকা ছিল পরোক্ষ কিন্তু সুদূরপ্রসারী:
বন উজাড় ও পলি: বাগান সাম্রাজ্যের হাজার হাজার প্যাগোডা তৈরির জন্য ইট পোড়াতে বিপুল পরিমাণ বনের কাঠ ব্যবহার করা হয়েছিল। বন উজাড় হওয়ার ফলে বৃষ্টির জল সরাসরি মাটিতে পড়ে ইরাবতী নদীতে প্রচুর পলি জমিয়ে দেয়।
অতিরিক্ত পলির কারণে নদীর বুক ভরাট হয়ে যায় এবং মূল স্রোত শহর থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। এটি কৃষি সেচ ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
১২৮৭ খ্রিষ্টাব্দে মঙ্গোলরা যখন আক্রমণ করে, তখন নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া এবং খাদ্য সংকট বাগানকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দিয়েছিল। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় শত্রুপক্ষ সহজেই বিভিন্ন দিক থেকে শহরটিকে ঘিরে ফেলতে পেরেছিল।
- রাজধানী স্থানান্তর: ইরাবতীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণেই মিয়ানমারের শাসকরা বারবার রাজধানী বদলাতে বাধ্য হয়েছেন।
- পিয়াই থেকে বাগান: যখন ইরাবতীর বদ্বীপ সমুদ্রের দিকে আরও অগ্রসর হলো, তখন পিঁয়াই শহরটি সমুদ্র থেকে অনেক দূরে চলে যায়। ফলে বাণিজ্যের সুবিধার্থে রাজধানী উত্তরে বাগানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
- অমরপরা থেকে মান্দালয়: নদীর ধারের জমি বারবার প্লাবিত হওয়া এবং ইরাবতী নদীর ভাঙন এবং পলি জমার কারণে গতিপথ পরিবর্তনের কারণেই অমরপুরার গুরুত্ব কমে
গিয়েছিল। তাই ১৮৫৭
খ্রিষ্টাব্দে রাজা মিনডন রাজধানী অমরপুরা থেকে সরিয়ে মান্দালয় পাহাড়ের পাদদেশে নিয়ে
যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তিনি পুরো অমরপুরা শহরটি আক্ষরিক অর্থেই ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন। হাজার হাজার হাতি ব্যবহার করে পুরনো প্রাসাদের সেগুন কাঠ এবং ইটগুলো ১২ কিলোমিটার দূরে বর্তমান মান্দালয় পাহাড়ের পাদদেশে নিয়ে আসা হয়।
- ড্যাগন থেকে ইয়াঙ্গুন: প্রাচীনকালে এখানে 'ড্যাগন' নামে একটি ছোট মাছ ধরার গ্রাম ছিল, যা বিখ্যাত 'শাওয়েদাগন প্যাগোডা'র জন্য পরিচিত ছিল। ১৭৫৫
খ্রিষ্টাব্দে রাজা আলংপায়া এলাকাটি জয় করেন এবং এর নাম দেন 'ইয়াঙ্গুন', যার অর্থ "শত্রু বা যুদ্ধের অবসান"।
১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দে দ্বিতীয় অ্যাংলো-বর্মি যুদ্ধের পর ব্রিটিশরা নিম্ন মিয়ানমার দখল করে। তারা বুঝতে পেরেছিল যে ইরাবতী নদীর মোহনায় এবং সমুদ্রের কাছাকাছি হওয়ায় ইয়াঙ্গুন হতে পারে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বন্দর।
এছাড়া ইরাবতী নদীর পলি জমার কারণে ওপরের দিকের শহরগুলো (যেমন পিঁয়াই বা বাগান) সমুদ্রগামী বড় জাহাজের জন্য অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু ইয়াঙ্গুন ছিল গভীর জলের বন্দর। ব্রিটিশরা আধুনিক গ্রিড পদ্ধতিতে পুরো শহরটি সাজায় এবং ১৯৪৮
খ্রিষ্টাব্দে স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত এটিকে মিয়ানমারের প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করে।
অর্থনীতি ও জীববৈচিত্র্য
পরিবহন: <
- মিয়ানমারের পণ্য পরিবহনের সবচেয়ে সাশ্রয়ী মাধ্যম হলো এই নদী। বড় বড় জাহাজ মান্দালয় পর্যন্ত সহজেই চলাচল করতে পারে।
- ইরাবতী ডলফিন: এই নদীর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো বিরল প্রজাতির ইরাবতী ডলফিন। এরা স্থানীয় জেলেদের সাথে এক অদ্ভুত সহযোগিতার মাধ্যমে মাছ শিকারে সাহায্য করার জন্য পরিচিত।
২. প্রাচীন ভারতে 'ইরাবতী' নামে একটি নদী ছিল। বর্তমান পাঞ্জাব অঞ্চলের রাভি নদী প্রাচীনকালে বৈদিক যুগে 'ইরাবতী' বা 'পুরুষ্ণী' নামে পরিচিত ছিল।