![]() |
|
মিয়ানমারের পতাকা |
মিয়ানমার
Myanmar
ভৌগোলিক অবস্থান:১. বামার: প্রায় ৬৮-৭০% (সংখ্যাগুরু)।
২. শান: প্রায় ৯%।
৩. কারেন: প্রায় ৭%।
৪. রাখাইন: ৪%।
৫. এছাড়া মন, চিন, কাচিন এবং কায়াহ জাতিগোষ্ঠী রয়েছে।
৬. রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মিয়ানমার সরকার নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ায় তাদের সরকারি আদমশুমারিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না।
ধর্মীয় বিশ্বাস
১. উত্তরের উচ্চভূমি ও পশ্চিমের পর্বতমালামিয়ানমারের আবহাওয়া২. কেন্দ্রীয় সমভূমি (ইরাবতী উপত্যকা): এটি মিয়ানমারের হৃদপিণ্ড হিসেবে পরিচিত।
- হিমালয়ের পাদদেশ: মিয়ানমারের একেবারে উত্তরে হিমালয়ের অংশবিশেষ প্রবেশ করেছে। এখানেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ হাকাকাবো রাজি (৫,৮৮১ মিটার) অবস্থিত।
- আরাকান ইয়োমা: দেশটির পশ্চিম সীমান্ত বরাবর আরাকান বা রাখাইন পর্বতমালা অবস্থিত, যা মিয়ানমারকে ভারত ও বাংলাদেশ থেকে আলাদা করেছে। এই অঞ্চলটি অত্যন্ত দুর্গম এবং ঘন জঙ্গলে ঘেরা।
৩. শান মালভূম: দেশের পূর্ব দিকে থাইল্যান্ড ও চীন সীমান্তের কাছে এই মালভূমিটি অবস্থিত।
- ইরাবতী অববাহিকা: উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত ইরাবতী এবং সিতাং নদীর মধ্যবর্তী পলিমাটি সমৃদ্ধ সমতল ভূমি এটি। ইরাবতী ও সিত্তাং নদীর ব-দ্বীপ অঞ্চলের অংশ। উত্তর দিক থেকে আসা ইরাবতী নদী সাগরে পড়ার আগে অনেকগুলো শাখায় বিভক্ত হয়ে এই বিশাল ব-দ্বীপ তৈরি করেছে। এর পূর্ব দিকে সিত্তাং নদী আরেকটি ছোট ব-দ্বীপ তৈরি করে ইরাবতীর সাথে মিলিত হয়েছে।
এটি মূলত নদী বাহিত পলি মাটি দিয়ে গঠিত একটি অত্যন্ত উর্বর সমতল ভূমি এবং মিয়ানমারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক এবং অর্থনৈতিক এলাকা। এটি প্রায় ৫০,০০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এই অঞ্চলটি মূলত দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে অবস্থিত এবং আন্দামান সাগরের মোহনায় শেষ হয়েছে।
- কৃষি ও জনবসতি: দেশটির অধিকাংশ মানুষ এই অঞ্চলে বাস করে এবং এখানেই সবচেয়ে বেশি ধান উৎপাদন হয়। ইয়াঙ্গুন এবং মান্দালয়ের মতো বড় শহরগুলো এই সমতল ভূমিতেই অবস্থিত।
৪. উপকূলীয় অঞ্চল মিয়ানমারের দীর্ঘ ২,৮৩২ কিলোমিটার উপকূলরেখা রয়েছে।
- উচ্চতা: এর গড় উচ্চতা প্রায় ১,০০০ মিটার।
- বৈশিষ্ট্য: এটি খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ এবং এখানে অত্যন্ত খরস্রোতা সালউইন নদী প্রবাহিত হয়েছে। এখানকার জলবায়ু কিছুটা শীতল এবং এই অঞ্চলটি চুনাপাথরের পাহাড় ও গুহার জন্য বিখ্যাত।
- আরাকান উপকূল: পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর ঘেঁষে সংকীর্ণ উপকূল।
- তেনাসেরিম উপকূল: দক্ষিণে আন্দামান সাগর বরাবর দীর্ঘ ও সংকীর্ণ উপকূলীয় এলাকা। এখানে শত শত ছোট-বড় দ্বীপ রয়েছে, যা মেরগুই দ্বীপপুঞ্জ নামে পরিচিত।
১. গ্রীষ্মকাল (মার্চ থেকে মে) বৈশিষ্ট্য: এটি বছরের সবচেয়ে উত্তপ্ত সময়। তাপমাত্রা: গড় তাপমাত্রা ৩০° সেলসিয়াস থেকে ৩৫°সেলসিয়াস এর মধ্যে থাকে। তবে কেন্দ্রীয় মিয়ানমারের (যেমন: মান্দালয় বা বাগান) শুষ্ক অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০°সেলসিয়াস থেকে ৪৫°সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে যেতে পারে। এ সময় আবহাওয়া অত্যন্ত শুষ্ক ও ধুলোময় থাকে।
২. বর্ষাকাল (জুন থেকে অক্টোবর) বৈশিষ্ট্য: দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এ সময় প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। বৃষ্টিপাত: উপকূলীয় অঞ্চল (রাখাইন ও তেনাসেরিম) এবং ব-দ্বীপ অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয় (বছরে প্রায় ৫,০০০ মিমি)। তবে কেন্দ্রীয় 'শুষ্ক অঞ্চল' এ তুলনামূলক অনেক কম বৃষ্টি হয়। বর্ষাকালে আর্দ্রতা খুব বেশি থাকে এবং প্রায়ই বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের কারণে উপকূলে জলোচ্ছ্বাস ও ঝড় দেখা দেয়।
৩. শীতকাল (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি) বৈশিষ্ট্য: এটি ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক এবং শীতল সময়। তাপমাত্রা: দিনের বেলা মনোরম রোদ থাকে এবং রাতে তাপমাত্রা বেশ কমে যায়। সমতল ভূমিতে তাপমাত্রা ২০°সেলসিয়াস -এর আশেপাশে থাকে। উত্তরাঞ্চলে শান মালভূমি বা উত্তরের পাহাড়ি এলাকায় তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে (০° সেলসিয়াস) নেমে যেতে পারে এবং সেখানে তুষারপাতও দেখা যায়।
মিয়ানমারের উদ্ভিদ: মিয়ানমারের বৈচিত্র্যময় ভূ-প্রকৃতি এবং মৌসুমি
জলবায়ুর কারণে এখানে উদ্ভিজ্জের এক বিশাল সমারোহ দেখা যায়। অর্থনৈতিক গুরুত্ব
মিয়ানমারের উদ্ভিদরাজি দেশটির অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ। সেগুন কাঠের বিশ্ববাজারে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
বাঁশ ও বেত: গ্রামীণ ঘরবাড়ি নির্মাণ এবং কুটির শিল্পে ব্যবহৃত হয়। মিয়ানমারে প্রায় ৮০ প্রজাতির বাঁশ পাওয়া যায়।
ঐতিহ্যবাহী বর্মি ওষুধ তৈরিতে নানা ধরণের বন্য লতাগুল্ম ব্যবহৃত হয়।
মিয়ানমারের জাতীয় ফুল হলো পাদাউক। এটি সাধারণত এপ্রিল মাসে (বর্মি নববর্ষের সময়) ফোটে এবং এর সুগন্ধ খুব জনপ্রিয়।
দেশটির প্রায়
৪০-৪৫% এলাকা এখনো বনভূমিতে আবৃত। জলবায়ু এবং উচ্চতা অনুযায়ী মিয়ানমারের
উদ্ভিদরাজিকে প্রধানত নিচের কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়।
১. ক্রান্তীয় চিরহরিৎ বন: যেসব এলাকায় বছরে ২,০০০ মিমি-এর বেশি বৃষ্টিপাত হয় (যেমন: রাখাইন উপকূল, তেনাসেরিম এবং উত্তরের পার্বত্য পাদদেশ), সেখানে এই বন দেখা যায়।
- প্রধান গাছ: গর্জন, চম্পা, এবং বিভিন্ন ধরণের ফার্ন ও অর্কিড। এই বন সারা বছর সবুজ থাকে এবং গাছগুলো অনেক লম্বা ও ঘন হয়।
২. পর্ণমোচী বা পাতাঝরা বন: এটি মিয়ানমারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বনভূমি। এই বনেই মিয়ানমারের বিখ্যাত সেগুন গাছ জন্মে।
- প্রধান গাছ: সেগুন, শাল, পিনকাডো। শীতের শেষে এবং গ্রীষ্মের শুরুতে এই বনের গাছের পাতা ঝরে যায়। মিয়ানমার বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম সেগুন কাঠ রপ্তানিকারক দেশ।
৩. শুষ্ক অঞ্চলের উদ্ভিদ: কেন্দ্রীয় মিয়ানমারের কম বৃষ্টিপাত এলাকায় (যেমন: বাগান বা মান্দালয় অঞ্চল) এই ধরণের উদ্ভিদ দেখা যায়।
- প্রধান গাছ: বাবলা, ক্যাকটাস, জোজোবা এবং বিভিন্ন ধরণের কাঁটাঝোপ। এই গাছগুলো খরা সহনশীল এবং পানির অভাব কাটিয়ে উঠতে পারে।
৪. পার্বত্য অঞ্চলের উদ্ভিদ: উত্তরের হিমালয় সংলগ্ন এলাকা এবং শান মালভূমির উঁচু অংশে এই উদ্ভিদ দেখা যায়। এখানে রয়েছে ওক, চেস্টনাট এবং পাইন বন। উচ্চ হিমালয় তুষারবৈরত অঞ্চলে আলপাইন তৃণভূমি এবং রডোডেনড্রন ফুল দেখা যায়।
৫. উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বন: ইরাবতী ও সিত্তাং নদীর ব-দ্বীপ এবং উপকূলীয় নিচু এলাকায় এই বন অবস্থিত। প্রধান গাছ: সুন্দরী, গড়ান, গোলপাতা এবং কেওড়া। এই গাছগুলো লোনা পানিতে বেঁচে থাকতে পারে এবং উপকূলকে জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করে।
মিয়ানমারের প্রাণিজগৎ
বৈচিত্র্যময় বনভূমি এবং দুর্গম পার্বত্য অঞ্চল একে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে। তবে বর্তমানে বন উজাড় এবং চোরাচালানের কারণে অনেক প্রাণী হুমকির মুখে।
মিয়ানমারের প্রাণীজগতকে প্রধানত কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়।
১. স্তন্যপায়ী প্রাণী মিয়ানমারের বনে এখনো অনেক রাজকীয় প্রাণী টিকে আছে। যেমন
- হাতি: মিয়ানমার বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বন্য এশীয় হাতির আবাসস্থল। এছাড়াও দেশটিতে বিরল সাদা হাতি পাওয়া যায়, যা ঐতিহাসিকভাবে রাজকীয় ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
- বাঘ ও চিতা: উত্তরের কাচিন রাজ্যের পাহাড়ি বনে এখনো বেঙ্গল টাইগার এবং ক্লাউডেড লেপার্ড দেখা যায়।
- বিপন্ন প্রজাতির বাঁদর: মিয়ানমারের একটি বিশেষ আকর্ষণ হলো মিয়ানমার স্নাব-নোজড মাঙ্কি, যা কেবল এই অঞ্চলেই দেখা যায়।
- অন্যান্য: খুব অল্প গণ্ডার রয়েছে। এছাড়া রয়েছে- বুনো মহিষ, গয়াল, এবং বিভিন্ন প্রজাতির হরিণ।
২. পাখি: মিয়ানমারে ১,০০০-এর বেশি প্রজাতির পাখি রয়েছেL
- জাতীয় পাখি: সবুজ ময়ূর মিয়ানমারের জাতীয় প্রতীক এবং দেশটির ঐতিহ্যের সাথে মিশে আছে।
- জলচর পাখি: শীতকালে তিব্বত এবং সাইবেরিয়া থেকে অসংখ্য পরিযায়ী পাখি মিয়ানমারের 'ইন্ডলে লেক' এবং ব-দ্বীপ অঞ্চলে আসে।
৩. সরীসৃপ ও জলজ প্রাণী:
- মহাসাগরীয় কচ্ছপ: মিয়ানমারের উপকূলীয় দ্বীপগুলোতে বিরল প্রজাতির সামুদ্রিক কচ্ছপ ডিম পাড়তে আসে।
- ইরাবতী ডলফিন: ইরাবতী নদীতে দেখা যায় এই বিশেষ প্রজাতির ডলফিন। এরা স্থানীয় জেলেদের সাথে মিলে মাছ ধরতে সাহায্য করার জন্য বিখ্যাত।
- কুমির: লোনা পানির কুমির মূলত ইরাবতী ব-দ্বীপের ম্যানগ্রোভ বনে পাওয়া যায়।
৪. মেরগুই দ্বীপপুঞ্জের সামুদ্রিক জীবন: দক্ষিণের মেরগুই দ্বীপপুঞ্জের চারপাশে প্রবাল প্রাচীর এবং প্রচুর সামুদ্রিক মাছ, হাঙ্গর ও রশ্মি মাছ দেখা যায়। এটি স্কুবা ডাইভিংয়ের জন্য একটি বিশ্বখ্যাত স্থান।
মিয়ামমারের মনুষ্য বসতি
প্রাগৈতিহাসিক যুগ (৭৫০,০০০- ১১০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শণ অনুযায়ী, মিয়ানমারে প্রায় ৭ লক্ষ ৫০ হাজার বছর আগে হোমো ইরেক্টাস মিয়ানমার অঞ্চলে বসতি গড়ে তুলেছিল। মিয়ানমারের এই প্রাচীন সভ্যতাটিকে 'এ্যানিয়াথিয়ান সভ্যতা' নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। এদের দ্বারাই মিয়ানমারে প্রাচীন প্রস্তর সভ্যতার পত্তন ঘটিয়েছিল। ১৯৩৭-৩৮ খ্রিষ্টাব্দে ভূতাত্ত্বিক ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের একটি দল (বিশেষ করে হেলমুট ডি টেরা এবং হলিয়াস মোভিয়াস) ইরাবতী নদীর অববাহিকায় গবেষণার সময় এই সভ্যতার নিদর্শন খুঁজে পান। 'এ্যানিয়াথা' শব্দটি উচ্চ মিয়ানমারের মানুষের স্থানীয় নাম থেকে এসেছে। প্রায় ২০,০০০ বছর আগে পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
১১ হাজার খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে হোমো স্যাপিয়েন্সরা
মিয়ানমারের পূর্বাঞ্চলে ইরাবতী নদীর তীরে। এই সভ্যতার নিদর্শশনগুলো মূলত মধ্য মিয়ানমারের শুষ্ক অঞ্চলে পাওয়া গেছে। বিশেষ করে ইরাবতী নদীর তীরের চত্বর বা সোপানগুলোতে এই আদিম মানুষের হাতিয়ার পাওয়া গেছে। মাগওয়ে, মান্দালয় এবং সাগাইং অঞ্চলে এর বিস্তৃতি ছিল সবচেয়ে বেশি।প্রস্তর যুগ ১০০০০-৫০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ:
নব্য প্রস্তর যুগ (খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০০-২০০০ অব্দ)
১. শাক্য বংশের সাথে সম্পর্ক: আরাকানি ইতিহাস গ্রন্থগুলোতে রাজা মারায়ুকে ভারতের কপিলাবস্তুর বিখ্যাত শাক্য বংশের (গৌতম বুদ্ধের বংশ) একজন রাজপুত্রের উত্তরসূরি হিসেবে দেখানো হয়েছে। দাবি করা হয় যে, উত্তর ভারত থেকে এক রাজপুত্র রাজনৈতিক কারণে নির্বাসিত হয়ে আরাকানে আসেন এবং সেখানকার আদিবাসী নেগ্রিটো বা স্থানীয় গোত্রপ্রধানের কন্যাকে বিয়ে করে এই রাজবংশের সূচনা করেন।
২. সৌর বংশ অনেক ঐতিহাসিক বর্ণনায় মারায়ুর বংশকে সূর্য বংশ বা সৌর বংশের একটি শাখা হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাচীন দক্ষিণ এশীয় রাজাদের মধ্যে নিজেদের সূর্য বা চন্দ্র বংশের সাথে সম্পর্কিত করার যে প্রবণতা ছিল, মারায়ুর ক্ষেত্রেও তার প্রতিফলন দেখা যায়।
এই রাজবংশের রাজধানী ছিল ধান্যবতী। প্রচলিত বিশ্বাস মতে, খ্রিষ্টপূর্ব ২৬৬৬ থেকে ২৬১৬ অব্দ পর্যন্ত (৫০ বছর)। মারায়ু রাজবংশের অধীনে মোট ৩২ জন রাজা আরাকান শাসন করেছিলেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র 'মারাজিন' সিংহাসনে আরোহণ করেন। আরাকানি প্রাচীন ইতিহাস গ্রন্থ 'ধন্যবতী আয়াদা' এবং অন্যান্য রাজকীয় পুঁথি অনুসারে রাজা মারায়ু থেকে শুরু করে প্রথম ধান্যবতী রাজবংশের ৩২ জন রাজার তালিকা পাওয়া যায়। এই রাজার হলেন-
১ মারায়ু (২৬৬৬- ২৬১৬)
২ মারাজিন (২৬১৬ ২৬০৬)
৩ মারাসং (২৬০৬-২৫৭১)
৪ মারাকন (২৫৭১-২৫৪০)
৫ মারাকিং (২৫৪০-২৫০৮) ৬ মারামেন (Mara-men) ২৫০৮ – ২৪৭৮ ৭ মরাপ্রিয়ু (Mara-pyu) ২৪৭৮ – ২৪৪৬ ৮ মারামেনফিয়ু (Mara-men-pyu) ২৪৪৬ – ২৪০৬ ৯ মারানি (Mara-ni) ২৪০৬ – ২৩৭০ ১০ মারাকো (Mara-ko) ২৩৭০ – ২৩৩০ ১১ মিনলাং (Min-lang) ২৩৩০ – ২২৯০ ১২ মিনবা (Min-ba) ২২৯০ – ২২৫০ ১৩ মিনলুন (Min-lun) ২২৫০ – ২২১০ ১৪ মিনহতি (Min-hti) ২২১০ – ২১৭০ ১৫ মিনজাউ (Min-zau) ২১৭০ – ২১৩০ ১৬ মিনসাও (Min-saw) ২১৩০ – ২০৯০ ১৭ মিনবউ (Min-bou) ২০৯০ – ২০৫০ ১৮ মিনপার (Min-par) ২০৫০ – ২০১০ ১৯ মিননেও (Min-neo) ২০১০ – ১৯৭০ ২০ মিনগায়ে (Min-gaye) ১৯৭০ – ১৯৩০ ২১ মিন থউং (Min Thaung) ১৯৩০ – ১৮৯০ ২২ মিন সি (Min Si) ১৮৯০ – ১৮৫০ ২৩ মিন উ (Min U) ১৮৫০ – ১৮১০ ২৪ মিন খাউং (Min Khaung) ১৮১০ – ১৭৭০ ২৫ মিন ন্যাগ (Min Nyag) ১৭৭০ – ১৭৩০ ২৬ মিন পু (Min Pu) ১৭৩০ – ১৬৯০ ২৭ মিন তেই (Min Tei) ১৬৯০ – ১৬৫০ ২৮ মিন হ্লা (Min Hla) ১৬৫০ – ১৬১০ ২৯ মিন থউং (Min Thaung - II) ১৬১০ – ১৫৭০ ৩০ মিন অং (Min Aung) ১৫৭০ – ১৫৩০ ৩১ মিন কিউ (Min Kyu) ১৫৩০ – ১৪৯০ ৩২ এনগাসাপু (Ngasapu) ১৪৯০ – ১৪৬১
ব্রোঞ্চ যুগ খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০-১০০০ অব্দ
এই সময়ের ভিতরে এই অঞ্চলের মানুষ তামা এবং টিনের সংমিশ্রণে
ব্রোঞ্জ তৈরি করা শিখেছিল। এই সূত্রে মিয়ানমারে ব্রোঞ্জ সভ্যতার সৃষ্টি হয়েছিল।
ন্যুয়াংগানের খননকার্যে দেখা গেছে যে, সেই সময়ের মানুষের মধ্যে পরকাল নিয়ে বিশ্বাস ছিল।
কবর দেওয়ার সময় এরা মৃতদেহের সাথে ব্রোঞ্জের হাতিয়ার, অলঙ্কার এবং খাবারভর্তি মাটির পাত্র দিত।
কিছু সমাধিতে অনেক দামী জিনিস পাওয়া গেছে এবং কিছুতে খুব সামান্য। এটি প্রমাণ করে যে সেই সমাজেই ধনী-দরিদ্র বা নেতা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ তৈরি হয়েছিল।
এই সময় এরা তামা ও টিনের মিশ্রণে ব্রোঞ্জ তৈরি করতে শিখেছিল। তারা ব্রোঞ্জের তৈরি বর্শা, তীরের ফলা, কুঠার এবং মাছ ধরার বড়শি ব্যবহার করত।
ব্রোঞ্জ এবং দামী পাথরের (যেমন: কার্নেলিয়ান ও জ্যাড) তৈরি মালা, চুড়ি এবং কানের দুল পাওয়া গেছে।
লাল ও কালো রঙের মাটির পাত্র তৈরি করা হতো, যেগুলোর গায়ে জ্যামিতিক নকশা থাকত।
লৌহ যুগ খ্রিষ্টপূর্ব ১০০০--২০০ অব্দ
খ্রিষ্টপূর্ব ৮০০ অব্দের
দিকে চীন থেকে আগত
তিব্বত-বর্মীয়
ভাষা-উপ-পরিবারের
২. পিউ ও মন সভ্যতা খ্রিষ্টপূর্ব ২য় শতক - ৯ম শতক)
৩. প্যাগ্যান সাম্রাজ্য (১০৪৪-১২৮৭ খ্রিষ্টাব্দ): নানঝাও আক্রমণের ফলে যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, সেই সুযোগে হিমালয়ের পাদদেশ থেকে তিব্বতি-বর্মি বংশোদ্ভূত বর্মিরা মায়ানমারে প্রবেশ করতে শুরু করে।
অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন নানঝাওদের মিত্র বা তাদের অগ্রবর্তী দল হিসেবে
এখানে এসেছিল। এরা মায়ানমারের উর্বর কিয়াউতসে অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে এবং কৃষিকাজে
বিশেষ দক্ষতা প্রদর্শন করে।
বর্মিরা ধীরে ধীরে তাদের শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে এবং ৮৪৯ খ্রিষ্টাব্দে ইরাবতী নদীর তীরে পাগান
১. রাজা আনোয়ারাত (১০৪৪-১০৭৭): রাজা আনোয়ারাতকে পাগান সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা এবং মায়ানমারের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ বীরদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি ছোট ছোট রাজ্যগুলোকে একত্রিত করে প্রথম বর্মি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি দক্ষিণের মন রাজা মনুহাকে পরাজিত করে সেখান থেকে বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ 'ত্রিপিটক' নিয়ে আসেন এবং থেরবাদ বৌদ্ধধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি বিখ্যাত শোয়েজিগন প্যাগোডা নির্মাণ শুরু করেন।৪.মঙ্গোল শাসন (১২৮৭-১৩৬৪ খ্রিষ্টাব্দ): মায়ানমারের ইতিহাসে "রাজনৈতিক বিভাজনের যুগ" বলা হয়। মঙ্গোলদের অধিকারে যাওয়ার পর, মিয়ানমার মঙ্গোল করদরাজ্য পরিণত হয়। মঙ্গোলরা (ইউয়ান রাজবংশ) মায়ানমারে স্থায়ী কোনো প্রশাসন বসায় নি। তারা মূলত পাগান সাম্রাজ্যকে ধ্বংস করে এবং বর্মি রাজাদের তাদের বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করে।
২. রাজা কানসিথা (১০৮৪-১১১২) রাজা কানসিথা ছিলেন একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় ও ন্যায়পরায়ণ শাসক। তাঁর সময়ে বর্মি ও মন সংস্কৃতির অপূর্ব সমন্বয় ঘটে। তিনি নিজেকে বৌদ্ধধর্মের রক্ষক হিসেবে প্রচার করেন। তাঁর সবচেয়ে বড় কীর্তি হলো ইয়াঙ্গুনের কাছে বা প্যাগানে অবস্থিত বিশ্বখ্যাত আনন্দ মন্দির, যা স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন।
৩. রাজা আলাউংসিতু (১১১২-১১৬৭): ইনি ছিলেন কানসিথার নাতি। তিনি জলপথে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত ভ্রমণ করতেন এবং প্রজাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতেন। তিনি প্যাগানের সবচেয়ে উঁচু মন্দিরগুলোর একটি থাটবিন্যু নির্মাণ করেন। তবে তার জীবনের শেষ পরিণতি ছিল করুণ, নিজের ছেলের হাতেই তাকে মৃত্যুবরণ করতে হয়।
৪. রাজা নারাথু (১১৬৭-১১৭১): তিনি ইতিহাসে একজন নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী রাজা হিসেবে পরিচিত হলেও তার একটি বিশাল স্থাপত্য কীর্তি রয়েছে। নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে তিনি প্যাগানের সবচেয়ে বিশালকার মন্দির ধামায়ানগি নির্মাণ শুরু করেন। তবে এটি অসমাপ্ত থেকে যায় কারণ তিনি আততায়ীর হাতে নিহত হন।
৫. রাজা হ্তিলুমিনলো (১২১১-১২৩৫): তাকে প্যাগানের শেষ শক্তিশালী রাজাদের একজন ধরা হয়। স্থাপত্য: তিনি তাঁর নিজের নামেই বিখ্যাত হ্তিলুমিনলো মন্দির নির্মাণ করেন। তাঁর সময় থেকেই প্যাগানের বিশাল মন্দির নির্মাণের যুগে ধীরে ধীরে ভাঁটা পড়তে থাকে কারণ রাজকোষ খালি হতে শুরু করেছিল।
৬. রাজা নারাথহিপাতে (১২৫৪-১২৮৭): তিনি প্যাগান সাম্রাজ্যের শেষ গুরুত্বপূর্ণ রাজা। ১২৭৭ এবং ১২৮৩ খ্রিষ্টাব্দে বিখ্যাত মঙ্গোল নেতা কুবলাই খান মায়ানমার আক্রমণ করেন। তারা পাগান সাম্রাজ্যের বাহিনীকে পরাজিত করে রাজধানী দখল করে নেয়, যার ফলে পাগান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং রাজা নারাথহিপাতে পালিয়ে যান। তাকে "তারুক-পিয়ে-মিন" বা "যে রাজা মঙ্গোলদের ভয়ে পালিয়েছিলেন" বলা হয়। তাঁর সময়েই মঙ্গোলদের কাছে পরাজয়ের মাধ্যমে প্যাগান সাম্রাজ্যের সূর্য অস্তমিত হয়।
১. রাজা থাদোমিনব্য (১৩৬৪-১৩৬৭): ইনাওয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। তাকে মায়ানমারের ইতিহাসে এক বীর এবং দূরদর্শী রাজা হিসেবে গণ্য করা হয়। ১৩৬৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইরাবতী ও মিটগে নদীর সঙ্গমস্থলে ইনাওয়া শহর গড়ে তোলেন এবং এটিকে রাজধানী করেন। তিনি উত্তর ও মধ্য মায়ানমারের ছোট ছোট স্বাধীন শান ও বর্মি সর্দারতন্ত্রগুলোকে নিজের অধীনে এনে একটি সংহত রাষ্ট্র গঠন করেন।
২. রাজা প্রথম মিনগাং (১৪০০-১৪২১): তিনি ছিলেন এই বংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক। তাঁর শাসনকাল ছিল মায়ানমারের ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ যুদ্ধবিগ্রহের সময়। দক্ষিণের মন রাজা রাজাদরিত-এর সাথে তাঁর দীর্ঘ ৪০ বছরের যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধ বর্মি বীরত্বগাথার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর সময়েই ইনাওয়াতে উচ্চমানের সাহিত্য চর্চা শুরু হয় এবং বর্মি ভাষা রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা পায়।
৩. রাজা থাদো (১৪২৬-১৪৩৯): তিনি প্রথম মিনগাং-এর পর ক্ষমতায় আসেন। তাঁর প্রধান কৃতিত্ব ছিল অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন এবং বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিকে শান্ত করা। তিনি ইনাওয়ায় প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন।
৪. রাজা দ্বিতীয় মিনগাং (১৪৮০-১৫০১): এই রাজার শাসনকাল থেকে ইনাওয়া রাজবংশের পতনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। যদিও তিনি শিল্প ও সাহিত্যের প্রতি অনুরাগী ছিলেন, কিন্তু তাঁর সময়ে উত্তরের শান রাজ্যগুলো এবং দক্ষিণের স্বাধীন রাজ্যগুলো ইনাওয়ার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে শুরু করে।
৫. রাজা শোয়েনানকিয়াওশিন (১৫০৯-১৫২৭): তিনি ছিলেন ইনাওয়ার শেষ প্রভাবশালী কিন্তু দুর্ভাগ্যবান রাজা। ১৫২৭ খ্রিষ্টাব্দঢের উত্তরের শান প্রধানদের একটি সংঘবদ্ধ বাহিনী ইনাওয়া আক্রমণ করে। যুদ্ধে রাজা পরাজিত ও নিহত হন। এর ফলে ইনাওয়ায় শান রাজবংশের আধিপত্য শুরু হয়।
৬. তংগু রাজবংশ ১৫১০-১৭৫২): প্যাগ্যানের পতনের পর মিয়ানমার বিভিন্ন ছোট রাজ্যে ভাগ হয়ে যায়। এর ভিতরে সৃষ্টি হয় তংগু রাজবংশের শাসিত রাজ্য। তংগু রাজবংশের ইতিহাসকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়: প্রথম তংগু সাম্রাজ্য (যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম সাম্রাজ্য ছিল) এবং পুনর্গঠিত বা পরবর্তী তংগু রাজবংশ (যাঁরা আভা বা ইনাওয়াকে কেন্দ্র করে শাসন করেছিলেন)।
২. পুনর্গঠিত বা পরবর্তী তংগু রাজবংশ (১৫৯৯-১৭৫২): প্রথম সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ার পর বায়িন্নাউং-এর নাতিরা পুনরায় রাজ্য গুছিয়ে নেন এবং রাজধানী ইনাওয়া বা আভা-তে সরিয়ে নেন। একে অনেক সময় 'নিয়াউংইয়ান রাজবংশ'ও বলা হয়।
৫. আধুনিক মিয়ানমার (১৯৪৮ - বর্তমান) ১৯৪৮
খ্রিষ্টাব্দের ৪ জানুয়ারি মিয়ানমার ব্রিটিশ শাসনমুক্ত হয়।
সামরিক শাসন ও অস্থিরতা: স্বাধীনতার পর থেকেই দেশটি জাতিগত সংঘাত এবং দীর্ঘস্থায়ী সামরিক শাসনের কবলে পড়ে, যা বর্তমান সময় (২০২৬) পর্যন্ত চলমান।
চীনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সেই
সূত্রে সৃষ্ট অরাজকতার কারণে, খ্রিষ্টপূর্ব ২১০ অব্দের এই অঞ্চল থেকে বহু মানুষ
মিয়ানমার ও তিব্বতের দিকে চলে আসে। তিব্বতের দিকে চলে আসা জনস্রোত হিমালয়ের
উচ্চভূমিতে বসতি স্থাপন করে। অন্যদিকে এদের অপর দল
মেকং নদী,
মিয়ানমারের ইরাবতী নদী তীরগুলোতে বসতি স্থাপন করে। <
এদের একটি দল < খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতাব্দীতে চীন-মায়ানমার সীমান্তের শান অঞ্চলে (বর্তমানে শান মিয়ানমারের একটি প্রদেশ) এসে বসতি স্থাপন করেছিল। শান অঞ্চলের আদিবাসীরা এই নবাগতদের খুব ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারে নি। কিন্তু সংখ্যাধিক্যের কারণে এদেরকে উৎখাতও করতে পারে নি। শান অঞ্চলে এরা প্রায় ৩০০ বৎসর বসবাস করে।
খ্রিষ্টপূর্ব ২০০ অব্দের দিকে তিব্বত-বর্মীয়
ভাষাগোষ্ঠীর পিউ জাতি বর্তমান চীনের কিংঘাই হ্রদ তীরবর্তী অঞ্চল থেকে মিয়ানমারের
প্রবেশ করে এবং এরা ইরাবতী থেকে বর্তমান য়ূন্নান পর্ন্ত বসতি গড়ে তোলে। এরা এই
অঞ্চলে পাথুরে দেয়াল ঘেরা নগর সভ্যতার পত্তন ঘটায়। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার সূত্রে
প্রায় ১২টি এরূপ নগরীর সন্ধান পাওয়া গেছে।
চীন ও ভারত থেকে আগত জনগোষ্ঠীর মানুষের বসতি স্থাপনের ভিতর দিয়ে ভিন্নতর সভ্যতা গড়ে
উঠেছিল আরাকান এবং অবশিষ্ট বার্মা অঞ্চলে।
আরাকান অঞ্চলে ৭৮৮ খ্রিষ্টাব্দের দিকে ধান্যবতী থেকে রাজধানী উজালী নগরে
স্থানান্তরিত হয়। এরপর এই রাজ্যের শাসন চলে যায়
হরিকেলের চন্দ্রবংশীয় শাসকদের হাতে। খ্রিষ্টীয় দশম-একাদশ শতাব্দীতে বঙ্গের
চন্দ্রবংশীয় শাসকদের লেখাসমূহ থেকে<,
তাদের আদি বাসভূমি হরিকেল সীমার মধ্যে ছিল বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। সে সময়ে এই
রাজ্যটি সামন্ততান্ত্রিক অবস্থা থেকে রাজ্যের মর্যাদায় উন্নীত হয়েছিল। এ বিষয়ে
শ্রীচন্দ্রের বেশ কিছু ফলক থেকে জানা যায়, চন্দ্রবংশের প্রথম শাসক ত্রৈলোক্যচন্দ্র
কার্যত এবং আইনত উভয় প্রকারেই হরিকেলের রাজা ছিলেন। ত্রৈলোক্যচন্দ্র তাঁর পিতার
কাছ থেকে হরিকেল রাজ্যের একজন সামন্তের মর্যাদা লাভ করেন এবং তিনিই শক্তি সঞ্চয়
করে হরিকেল রাজার প্রধান সহায়ক শক্তিতে পরিণত হন। পরবর্তী সময়ে সে অবস্থা থেকে
তিনি একজন সার্বভৌম রাজা হন। ধারণা করা হয়, আরাকান সীমান্তবর্তী
চট্টগ্রাম অঞ্চলে এ রাজ্য অবস্থিত ছিল।
আরাকান অঞ্চলের মানুষ< ভারতবর্ষের সাথে বাণিজ্যের সূত্রে ভারতীয় সংস্কৃতির
দ্বারা প্রভাবিত হয়। বৌদ্ধ ধর্ম ও রাজনৈতিক বিন্যাস প্রকৃতি পূর্ব-ভারত থেকে
বার্মার সংস্কৃতিকে মিশ্র সংস্কৃতিতে পরিণত করেছিল। এই সময় মিয়ানমারের সমুদ্র
উপকূলীয় অঞ্চলে মন-রাজ্য গড়ে উঠে। আর মায়নমারের পশ্চিমাঞ্চলে আরাকান সাম্রাজ্যের
পত্তন ঘটে।
খ্রিষ্টীয় ৯০০ অব্দের ভিতরে, পিউ (Pyu)
জাতির মানুষ মধ্য বার্মার শুষ্কাঞ্চলে নগর সভ্যতার সূত্রপাত ঘটায়। ৮৫০ থেকে ৭৫০ খ্রিষ্টব্দের মধ্য
নানঝও রাজ্য (Kingdom of Nanzhao)
পিউদের রাজ্য আক্রমণ করে। এরপর নানঝাও-এর মার্মা জাতিগোষ্ঠীর লোকেরা প্যাগান অঞ্চলে
একটি বসতি গড়ে তোলে। কালক্রমে এরা কয়েকটি শক্তিশালী নগর রাষ্ট্রের পত্তন ঘটায়। পরে
এরা সংঘবদ্ধ হয়ে প্যাগান সাম্রাজ্যের সৃষ্টি করে। ১০৫০-৬০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে এরা
ইরাবতী নদীর অববাহিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষকে এই সাম্রাজ্যের অধীনে আনতে সমর্থ
হয়। এই সময় খমের নামক অপর একটি বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে উঠে মিয়ানমারের অপর অংশে। মূলত
দ্বাদশ এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত তৎকালীন মিয়ানমার এবং তৎসংলগ্ন অঞ্চল
জুড়ে এই দুই রাজ্যের আধিপত্য বজায় ছিল। এই সময় বার্মিজ ভাষা এবং সংস্কৃতির বিকাশ
ঘটে ইরাবাতী নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে। ভারতীয়দের সাথে বাণিজ্যের কারণে এদের ভিতর
ভারতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটতে থাকে। বিশেষ করে বৌদ্ধ ধর্ম ব্যাপকভাবে এই অঞ্চলের
মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এই সময়ে প্যাগান রাজা এবং ধনী ব্যক্তিদের সহায়তায় প্রায়
১০,০০০ বৌদ্ধ মন্দির নির্মিত হয়।
দ্বাদশ শতাব্দীর দিকে প্যাগন রাজ্যের ভাঙন শুরু
হয় রাজনৈতিক সঙ্ঘাতের কারণে। চীন থেকে মোঙ্গোলদের আক্রমণে এই ভাঙনকে আরও
ত্বারান্বিত করেছিল। এই শান নামক একটি রাষ্ট্র ইরাবতী নদীর উত্তরপূর্ব এবং
পূর্বাঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম হয়। চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত শানদের এই আধিপত্য
বজায় ছিল। এই সময় শান রাজ্যগুলোর ভিতরে আভা এবং হাথাবতী রাজ্য বৃহত্তর আকার ধারণ
করে। ফলে আরাকান রাজ্য এদের অধীনস্থই ছিল। ১৩৮৫-১৪২৪ খ্রিষ্টাব্দের দিকে ভেঙেপড়া
আভারাজ্য একত্রীভূত হওয়ার প্রচেষ্টা গ্রহণ করে ব্যর্থ হয়। এই সুযোগে ১৪৩৭
খ্রিষ্টাব্দে আরাকান রাজ্য শক্তিশালী হয়ে উঠে। ১৫২৭ খ্রিষ্টাব্দে শান সমন্বিত
রাজশক্তি ঊর্ধ্ব বার্মায় আধিপত্য বিস্তার করে এবং ১৫৫৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এরা এই
আধিপত্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়।
১৫৪১ খ্রিষ্টাব্দের দিকে তাউঙ্গ-এর তরুণ রাজা তাবিন্শবেহতি হান্থবেদী রাজ্য দখল
করে। পরে শান রাজ্যের অনেকাংশই দখল করে নেয়। এরপর এরা একটি বিশাল রাজ্যের অধিপতিতে
পরিণত হয়। ১৫৮১ খ্রিষ্টাব্দে এই রাজ্য ভেঙে পরে যোগ্য শাসকের অভাবে। ১৫৯৯
খ্রিষ্টাব্দের দিকে সিয়াম নাম রাজা রাজ্যের একটি অংশ দখল করে, অপর অংশে পোর্তুগিজ
বণিকরা নিজেদের শাসন কায়েম করে এই রাজ্যের একাংশে। পরে এই বংশের রাজপুরুষরা বিভক্ত
রাজ্যগুলোকে একত্রীত করে শক্তিশালী হয়ে উঠে, ১৬১৩ খ্রিষ্টাব্দে পোর্তুগিজদের পরাজিত
করে এবং ১৬১৪ খ্রিষ্টাব্দে সিয়ামদের পরাজিত করে। এরপর এরা একটি ছোটো কিন্তু
শক্তিশালী রাজ্য গড়ে তোলে। এই সময় উত্তরাধিকার পদ্ধতির রাজা নির্বাচনের পরিবর্তে
যোগ্য রাজা নির্বাচনের ব্যবস্থা হয়। ১৭২০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে এরা মণিপুর রাজ্যে
আক্রমণ চালায়। ১৭৪০ খ্রিষ্টাব্দে হান্থবতী রাজ্য পুনরায় গঠিত হয় নিম্ন বার্মা
অঞ্চলে। ১৭৫২ খ্রিষ্টাব্দে দুর্বল আভা রাজ্য দখল করে। এর পর কোনবাউঙ রাজবংশের
আলাউংপাইয়া হান্থবেদী রাজ্য দখল করে এবং ১৭৫৯ খ্রিষ্টাব্দের এরা বার্মা এবং
মণিপুরসহ বিশাল অঞ্চল দখল করে নিতে সক্ষম হয়। এই সময় বিদেশী শক্তি হিসেবে অবস্থানরত
ফরাসি এবং ব্রিটিশদের বিতারিত করে। এই সময় এরা বার্মা রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম
হয়। ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে এরা লাওস দখল করে। ১৭৬৭ খ্রিষ্টাব্দে সিয়াম রাজ্যকে পরাজিত
করে। এছাড়া ১৭৬৫ থেকে ১৭৬৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত চীনাদের চারটি আক্রমণ প্রতিহত করে।
সিয়াম রাজ্য ১৭৭০ খ্রিষ্টাব্দে তার রাজ্য পুনরুদ্ধার করে। এরপর বার্মা এবং সিয়াম
যুদ্ধ চলে ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। এরপর এরা শান্তিচুক্তি করে। এরপর সিয়ামদেরকে
চীনাদের মুখোমুখী হওয়া থেকে বিরত থেকে, এরা ১৭৮৫ খ্রিষ্টাব্দে আরাকান দখল করে। এরপর
১৮১৪ খ্রিষ্টাব্দে দখল করে মণিপুরী এবং ১৮১৭ খ্রিষ্টাব্দে আসাম দখল করে।
এরপর ১৮২৪ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজদের সাথে বার্মার যুদ্ধ হয়। ১৮২৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত
এই যুদ্ধ চলে। এই সময় এরা আরাকান, মণিপুর, আসাম ব্রিটিশদের হাতে ছেড়ে দেয়। ১৮৫২
খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ বাহিনী নিম্ন বার্মা দখল করে। ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে বার্মার সাথে
ব্রিটিশদের তৃতীয়বারের মতো যুদ্ধ হয়। এই সময় বার্মার
কারেন < গোষ্ঠীকে
সহায়তা করার মাধ্যমে ব্রিটিশরা বার্মার শক্তিকে বিভাজিত করে। ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দের
১লা জানুয়ারি ব্রিটিশরা মান্দালয় দখলের মাধ্যমে, সম্পূর্ণ বার্মাকে তাদের অধীনে
আনে।
১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশদের পৃষ্ঠপোষকতায় এই সব খ্রিষ্টান কারেনরা < Karen National Associations (KNA) নামক একটি সংগঠন গড়ে তোলে। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ বার্মা উপনিবেশে প্রথম কারেন নববর্ষকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান মায়ানমার দখল করে নেয়। এই সময় < কারেনরা ব্রিটিশদের সমর্ধন করেছিল। এই কারণে এরা জাপানিদের < আক্রমণের শিকার হয়। এই সময় কারেন ও বার্মাজদের মধ্যে জাতিগত সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে। ফলে জাপানিদের পাশাপাশি বার্মার স্বাধীনতাকামী দল < Burma Independence Army (BIA) বহু কারেনকে হত্যা করে এবং তাদের বহু গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়। এই সময় প্রাকযুদ্ধ ক্যাবিনেট মন্ত্রী স পে থা (Saw Pe Tha) এবং তাঁর পরিবার এই আক্রমণের শিকার হয়। এরপর জাপনি সমরনায়ক কর্নেল সুজুকি কেইজি এবং কারেন নেতা সাও থা ডিন-এর মধ্যে এই অত্যাচর বন্ধের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
যুদ্ধের শেষে কারেন সংখ্যা গরিষ্ঠ এলাকাগুলো নিয়ে পৃথক রাজ্য গঠনের জন্য, কারেন নেতারা উদ্যোগ গ্রহণ করে। ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে<র আগষ্ট মাসে কারেন নেতা সাও থা ডিন এবং সাও বা উ গাই লণ্ডনে যান। কিন্তু ব্রিটিশরা কারেনদের দাবী অগ্রাহ্য করে। তবে বিশ্বযুদ্ধের শেষে ব্রিটিশরা কারেনদের বিষয়ে বিবেচনা করার আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধের শেষে যখন ব্রিটিশরা বার্মা ছেড়ে চলে যায়, তখন ব্রিটিশরা কারেনদের স্বপক্ষে কিছু করে যায় নি।
১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে জানুয়ারিতে বার্মার স্বাধীনতার বিষয়ে লণ্ডনে সভা হয়। পরবর্তী সময়ে প্যাংলোং-এ যখন বার্মা সরকার প্রধান হিসাবে অং সান এবং শান, কচিন ও চিন প্রদেশের নেতাদের মধ্যে যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তখন কারেনদের অধিকারের দাবীকে প্রায় অগ্রাহ্য করা হয়। এই সময় কারেন নেতারা শুধু পর্যবেক্ষক হিসাবে সেখানে উপস্থিত ছিল। উল্লেখ্য এই সময় মোন এবং আরাকানদের কোন প্রতিনিধিই সেখানে ছিল না।
১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ফ্রেব্রুয়ারি মাসে Karen National Union (KNU) প্রতিষ্ঠত হয়। এই সময় কারেন ব্যাপ্টিষ্ট এবং বৌদ্ধ সংগঠন, কারেন কেন্দ্রীয় সংগঠন (Karen Central Organisation (KCO)), কারেন যুব সংগঠন (Karen Youth Organisation (KYO)) থেকে প্রায় ৭০০ প্রতিনিধি নিয়ে কারেন কংগ্রেসের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল রেঙ্গুনের ভিন্টোন মেমোরিয়াল হলে। এই সভা আহুত হয়েছিল মূলত একটি পৃথক কারেন রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য। এর সাথে অন্যান্য বিষয় ছিল—< বার্মা জাতীয় সংসদে কারেনদের আসন সংখ্যা ২৫% বৃদ্ধ করা, নতুন করে ভাষাগত জাতীয়তা ভিত্তিক লোক গণনা এবং বার্মা সেনাবাহিনীতে নিয়মিত ভাবে কারেন গোষ্ঠী লোক অন্তর্ভুক্ত করা। এই সকল দাবি-দাওয়া ব্রিটিশ সরকারের কাছে আবেদন করলে, ব্রিটিশ সরকার তিন মাস কোনোই উত্তর দেয় নি। এরপর KNU -এর প্রেসিডেন্ট সাও বা য়ু গভর্নর এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল থেকে পদত্যাগ করেন।
১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে
বার্মা আইনসভার
নির্বাচনে Anti-Fascist
People's Freedom League
(AFPL)
নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
এই সময় এই দলের সামরিক নেতা
অং সান মায়ানমারের অস্থায়ী সরকারের প্রধান ছিলেন। এই দলের মাধ্যমেই তিনি
মায়ানমারের পূর্ণ স্বাধীনতার ডাক দেন। ১৯৪৭ সালের ১৯শে জুলাই বার্মার
স্বাধীনতা-চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র ছয় মাস আগে আততায়ীর গুলিতে অং সান ও তাঁর কিছু
গুরুত্বপূর্ণ সহযোগীসহ নিহত হন। এরপর এই দলের নেতৃত্বে আসেন য়ু নু (U
Nu। এই বৎসরের জুলাই
মাসেই তৈরি হয়েছিল
Karen National
Defence Organisation (KNDO)।
১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে বার্মার স্বাধীনতা বিষয়ক একটি চুক্তি হয়। এই
চুক্তিতে য়ু নু-এর সাথে ব্রিটিশ প্রধনমন্ত্রী ক্লিমেন্ট এ্যাটেল স্বাক্ষর করেন। এই
চুক্তিটি
Nu-Attlee Treaty
নামে পরিচিত।
১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ৪ জানুয়ারি মাসে বার্মা ব্রিটিশদের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা লাভ করে এবং য়ু নু বার্মার প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু এই বৎসরের শেষের দিকে বার্মার সেনাবাহিনীর ভিতর বিভাজন শুরু হয়। এই সময় প্রধান দুই সেনা নায়ক নে উইন (Ne Win) এবং বো যেয়া ( Bo Zeya) প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হন। প্রধানমন্ত্রী য়ু নু—< বার্মার সেনাবাহিনীর সেকেন্ড-ইন কমান্ডের দায়িত্ব অর্পণ করেন নে উইন-কে।
এরপর বার্মা সেনাবাহিনীতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ জানুয়ারি তারিখে, নে উইননের নেতৃত্বে Sitwundan (Socialist militia battalions) নামে একটি সেনাদল গঠিত হয়। এরপর সশস্ত্র বাহিনীর (Tatmadaw) চিফ অফ স্টাফ -এর দায়িত্বরত কারেন সেনাপতি জেনারেল স্মিথ ডুন (General Smith Dun)-কে অপসারণ ও বন্দী করা হয়। নতুন চিফ অফ স্টাফ -এর দায়িত্ব গ্রহণ করেন নে উইন। এই সময় কারেন সৈন্য ও সাধারণ মানুষদের উপর বার্মিজ সেনারা বিমাতাসূলভ আচরণ শুরু করে। ফলে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে গঠিত কারেনদের প্রতিরক্ষামূলক সংগঠন KNDO উজ্জীবিত হয়ে উঠে। কারেন রাইফেল, মিলিটারি পুলিশ ইউনিয়ন এবং KNDO সম্মিলিতভাবে বার্মার কেন্দ্রীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এই যুদ্ধে এই সম্মিলিত বাহিনী দ্রুত রেঙ্গুনের নয় মাইলের ভিতরে চলে আসে। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসের শেষ নাগাদ ১১২ দিন তাদের অবস্থানকে সুদৃঢ় করে রাখতে সক্ষম হয়। পরে এই বাহিনী এই অবরোধ তুলে নিতে বাধ্য হয়। এরপর সামরিক রসদ এবং খাদ্য সরবরাহ না থাকায়, তারা দক্ষিণ-পূর্ব বার্মায় সরে আসে।
এরপর রেঙ্গুনের সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ২০টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ একত্রিত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করে। বর্তমানে এদের এই সম্মিলিত বাহিনীটি Karen National Liberation Army (KNLA) নামে পরিচিত। ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে এই বাহিনীর সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল প্রায় ২০,০০০। কিন্তু বার্মা বাহিনীর ধারাবাহিক আক্রমণে এই বাহিনীর সদস্য সংখ্যা এসে দাঁড়ায় ৪,০০০-এ। এই সময়ের ভিতর বার্মা সেনাবাহিনীর সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৪ লক্ষ।
১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে KNLA-এর বৌদ্ধ সৈনিকরা পৃথক হয়ে যায়। এদের এই নতুন দলটির নামকরণ করা হয় Democratic Karen Buddhist Army (DKBA)। এরপর এরা বার্মা সেনা-শাসিত সরকারের সাথে যুদ্ধ-বিরতী চুক্তি করে। ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে, বার্মা সেনাবাহিনী DKBA -এর সহায়তায় KNLA-এর শক্ত ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত ম্যানের্প্লাউ (কারেন রাজ্যের সদর দফতর) দখল করে নেয়। এই শহরে ছিল কারেন জাতীয় সংগঠন KNU-এর কেন্দ্রীয় অফিস। ম্যানের্প্লাউ-এর পতনের পর, KNU-এর সদর দফতর বার্মা-থাইল্যান্ডের সীমান্তে অবস্থিত মু আয়ে পু (Mu Aye Pu) -তে সরিয়ে নেওয়া হয়। ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দের বিবিসি-র পর্তিবেদন থেকে জানা যায়, এই সংঘতের ফলে প্রায় ২ লক্ষ কারেন গৃহচ্যুত হয়েছে। এর ভিতর থাইল্যান্ডের লা টাক প্রদেশে বার্মার কারেন উদ্বাস্তু বসবাস করে।