লালফৌজ
Red Army
প্রাক্তন রাশিয়া'র সেনাদলের নাম। এর আদর্শিক
নাম হলো- শ্রমিক ও কৃষকদের লালফৌজ।
এই নামের সংক্ষেপিত নাম হলো লালফৌজ।
১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে রাশিয়ার জার শাসনের বিরুদ্ধে অনুষ্ঠিত বিপ্লবকে
রুশ বিপ্লব নামে অভিহিত করা হয়। এই বিপ্লবের মাধ্যমে
রাশিয়ায় জার রাজতন্ত্রের
শাসনের অবসান হয় এবং সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্থান হয়। বলশেভিকরা
রাশিয়ান গৃহযুদ্ধের সময় তাদের বিরোধীদের সামরিক সংস্থার
সেনাবাহিনীকে শ্বেতফৌজ নামে উল্লেখ করতো। এর
বিরোধী বাহিনী হিসেবে গড়ে উঠেছিল লালফৌজ।
১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবরের বিপ্লবের পরপরই জার-বিরোধী সাধারণ
মানুষ এবং সেনাবাহিনীর অংশবিশেষ নিয়ে এই বাহিনী গড়ে উঠেছিল। প্রথম দিকে এই বাহিনী
ছিল বিচ্ছিন্ন এবং ছোট ছোট দলে বিভক্ত। এ সব সৈন্যদের নিয়ে একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী
তৈরির লক্ষ্যে ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৮
জানুয়ারি সেনাবাহিনী এই বাহিনী তৈরি করা হয় এবং তখন তার নাম
রাখা হয় লালফৌজ। প্রথম দিকে এই বাইনীর মূল শক্তি ছিল
পদাতিক বাহিনী। এরা রুশ গৃহযুদ্ধে অংশ নিয়ে
সমাজাতান্ত্রিক রাশিয়া প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করেছিল।
সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার সামরিক শক্তি বৃদ্ধির জন্য এই বাহিনীর
ব্যাপক সংস্কার করা হয়। ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দের ভিতরে এই সময় লালফৌজকে শক্তিশালী বাহিনী
হিসেবে গড়ে তোলা হয়। এর ফলে লাল ফৌজ বিশ্বের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ সেনাবাহিনীতে
পরিণত হয়েছিল।
১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে চীন-সোভিয়েত যুদ্ধের সূচনা ঘটে।
দীর্ঘদিন যুদ্ধ চলার পর, ১৯৩৭
খ্রিষ্টাব্দেতৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন জিনজিয়াং
অঞ্চল দখল করে। এই যুদ্ধের মূল শক্তিই ছিল লালফৌজ।
জিনজিয়াং অঞ্চল দখলের পর এরা মাঞ্চুরিয়ান চীনের
পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের নিয়ন্ত্রণ ভার গ্রহণ করেছিল।
১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে সোভিয়েত নেতা ইওসিফ স্তালিনের
গ্রেট পার্জ নীতি গ্রহণের ফলে রেড আর্মি তাদের নৈতিক মনোবল ও দক্ষতা হারায়।
এই সময় ত্রিশ হাজারেরও অধিক সেনা কর্মকর্তা প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হন কিংবা
কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়। এদের ভিতরে
অধিকাংশই ছিল শীর্ষ পর্যায়ের সামরিক কর্মকর্তা।
১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের দিকেলালফৌজের
শীর্ষ পর্যায়ের অনভিজ্ঞ কর্মকর্তা
অধিষ্ঠিত হয়।
১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ আগষ্ট
পোল্যান্ডের সীমানার নিকটবর্তী গ্লেইভিৎস-এ
জার্মানির একটি সাজানো
ঘটনার সূত্র ধরে, ১লা সেপ্টেম্বর জার্মান বাহিনীকে পরাজিত করে বার্লিন দখল করে
নিতে সক্ষম হয়েছিল।পোল্যান্ড আক্রমণ করে। এরই মধ্য
দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।পোল্যান্ডকে
রক্ষা করার জন্য ৩রা সেপ্টেম্বর ফ্রান্স ও পোল্যান্ড জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ
ঘোষণা করে। এর ফলে পোল্যান্ড ও জার্মানির ভিতরকার যুদ্ধ চারদেশের যুদ্ধে পরিণত হয়।
১৭ই সেপ্টেম্বর সোভিয়েত রাশিয়া তার সীমান্ত দিয়ে পোল্যান্ড আক্রমণ করে। ৬ অক্টোবর
পোল্যাণ্ডের কর্ক দুর্গ পতনের পর, পোল্যান্ড জার্মান ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে
ভাগাভাগী হয়ে যায়।
এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে লালফৌজ অধিকৃত পোল্যান্ডে আধিপত্য বিস্তার করে।
১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের
৩০শে নভেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়ন ফিনল্যান্ড আক্রমণ করার ভিতর
দিয়ে এই বিশ্বযুদ্ধ নতুন মোড় নেয়। ফিন লোকবল খুবই কম হলেও দেশরক্ষার জন্য তাঁরা
প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এদের সহায়ক ছিল ফিনল্যান্ডের প্রচণ্ড শীত। লালফৌজ
যত সহজে ফিনল্যান্ড দখল করবে বলে ধারণা করেছিল, অচিরেই তা ভুল প্রমাণিত হয়। এই যুদ্ধের
কারণে ১৯৩৯
খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই
ডিসেম্বর রাষ্ট্রপুঞ্জ থেকে তাদেরকে সোভিয়েত ইউনিয়নকে বহিষ্কার করা হয়। শীতের তীব্রতা
কিছুটা কমে এলে ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের ২রা ফেব্রুয়ারি থেকে সোভিয়েত বিমান, ট্যাঙ্ক ও
স্লেজবাহিত লালফৌজের
বিশাল একটি অংশ একযোগে
ফিনদের প্রতিরক্ষা রেখায় আঘাত হানা শুরু করে। ৬ই মার্চ শান্তির জন্য আবেদন করে। এর
ফলে তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা পায় বটে, কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের আগের দাবী
অনুযায়ী, ফিনল্যান্ডক লেলিনগ্রাদের কাছাকাছি বেশকিছু এলাকার মালিকানা ছেড়ে দিতে
বাধ্য হয়। এ যুদ্ধে ২ লক্ষ ফিন সৈন্যের মধ্যে ৭০ হাজার সৈন্য মারা যায়।
পুরো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লালফৌজ অসাধারণ ভূমিকা রেখেছিল। এরা জার্মানের মূল আক্রমণকে প্রাণপণে প্রতিহত করেছিল।
এবং পরাজয়ের দ্বারপ্রান্ত থেকে জয়ের পথ তৈরি করেছিল। এবং শেষ পর্যন্ত
১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দের
২৫ ফেব্রুয়ারি, লালফৌজ তিনি বাহিনীর সমন্বিত একটি
বিশাল শক্তিশালী সেনাবাহনীতে পরিণত হয়। সে সময়ে এর নামকরণ করা হয় সোভিয়েত
আর্মি (Советская Армия, Sovetskaya
Armiya)।