২০২০ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ই মে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল, ভারতের উড়িষ্যা এবং পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন সংলগ্ন দক্ষিণ উপকূলীয়
অঞ্চলের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মহা-ঘূর্ণিঝড়।
আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী রাষ্ট্রগুলো নিয়ে গঠিত ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল
কাউন্সিল ফর এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক (এসক্যাপ) এর ৮ সদস্যের প্যানেল সকলের
সম্মতির ভিত্তিতে নতুন ঘূর্ণিঝড়ের নামের তালিকা নির্ধারণ করে থাকে। এই রীতিতে ২০০৪
খ্রিষ্টাব্দে ঘূর্ণিঝড়ের যে ৬৪টি নাম তালিকাভূক্ত করা হয়েছিল, আম্ফান ছিল এই তার
সর্বশেষ নাম। নামকরণটি করেছিল থাইল্যান্ড। থাই ভাষায় আম্ফান শব্দের অর্থ হলো আকাশ।
ঘূর্ণি ঝড়ের সময় বাতাসের গতিবেগ যদি প্রতি ঘণ্টায় ২২২ কিলোমিটার বা তার চেয় বেশি
হয়, তখন তাকে মহা-ঘূর্ণিঝড় নামে অভিহিত করা হয়। যেহেতু এই
ঘূর্ণিঝড়ের সময় বাতাসের গতিবেগ ছিল ২৬০-২৭০ কিলোমিটার/ঘণ্টা। তাই আম্ফানকে
মহা-ঘূর্ণিঝড় বলা হয়েছে।
২০২০ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ই মে আম্ফানের শুরু হয়েছিল শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোর পূর্বদিকের প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে সৃষ্ট
মহাসাগরীয় নিম্নচাপের মাধ্যমে। এ সময়ে ভারতের বিশাখাপত্তম থেকে দক্ষিণপূর্ব দেকে এর দূরত্ব ছিল ১০২০ কিলোমিটার।
১৫ই মে এই নিম্নচাপটি সাগরের উপরে ঘূর্ণাবর্ত সৃষ্টি করে উত্তর-পশ্চিম দিকে এগিয়ে যেতে থাকে।
১৬ই মে এই নিম্নচাপটি ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়। এবং প্রবল শক্তি সঞ্চয় করে, উড়িষ্য ও বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
এই সময় ঘূর্ণিঝড়টি উড়িষ্যার পাড়দ্বীপের দক্ষিণ থেকে ১১০০ কিলোমিটার দূরে ছিল।
এই সময় কেন্দ্রে ৫৪ কিলোমিটারের ভিতরে বাতাসের গতিবেগ ছিল ৬২
কিলোমিটার/ঘণ্টা। যা দমকা হাওয়া আকারে ৮৮ কিলোমিটার/ঘণ্টা
১৭ই মে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়।
রাত নয়টার দিকে ঘূর্ণিঝড়টি চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ১ হাজার ২০ কিলোমিটার দক্ষিণ–পশ্চিমে,
কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৯৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ–পশ্চিমে,
মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৯২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণ পশ্চিমে এবং
পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৯১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থান করছিল।
এই সময় ঘূর্ণিঝড়টির কেন্দ্রের ৯০ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ২২৫ থেকে ২৪৫ কিলোমিটার পর্যন্ত
বৃদ্ধি পাচ্ছিল।
এই সূত্রে ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর (আইএমডি) এবং বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর একে সুপার ঘূর্ণিঝড় হিসেবে অভিহিত করে।
১৮ই মে ৫.৩০টার সময় আম্ফান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বকখালিতে আঘাত
হানে। এই সময় বাতাসের গতিবেগ ছিল ১৫৫ কিলোমিটার/ঘন্টা। দমকা হাওয়ার গতিবেগ ছিল ১৮৫
কিলোমিটার/ঘণ্টা।
ক্ষয়ক্ষতি
আম্ফানের পর সাতক্ষীরার একটি আবাসিক এলাকা
বাংলাদেশ: বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেরর উপকূলীয় জেলাগুলো এই ঘূর্ণঝড়ের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ হয়। প্রবল জলোচ্ছ্বাসে উপকুলীয়
দুর্বল বাঁধগুলো ভেঙে গ্রামগুলো প্লাবিত করে। প্রবল ঝড়ো-বাতাসের কারণে, গাছপালা ভেঙে যায় বা উপড়ে যায়। বহু কাঁচা
বাড়ি-ঘর বিধ্বস্ত হয়। এর ফলে ব্যাপক ফসলের ক্ষতি হয় এবং বহু মৎস্য খামার
বিধ্বস্ত হয়। রাস্তাঘাট নষ্ট হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি হাজার হাজার ঘরবাড়ি
বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে।
ঝড়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল সুন্দরবন অঞ্চল-সহ সাতক্ষীরার প্রায় সকল জনপদ।
অনেক অঞ্চলের কাচা ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ তছনছ হয়ে গিয়েছিল।
বিভিন্ন অঞ্চলে অন্তত ২০ জন মানুষ মারা যায়। তবে এই ঝড়ের পূর্বাভাষের সূত্রে বহু মানুষ নিরাপদ
আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ফলে ব্যাপক প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটেনি।
প্রাথমিকভাবে এই ঝড়ের জন্য ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছিল ১১০০ কোটি টাকা।
ভারত:
আম্ফানের পর কলকাতার রাজপথ
পশ্চিমবঙ্গ: ঘূর্ণিঝড়টি প্রবল শক্তি নিয়ে আঘাত করেছিল
পশ্চিমবঙ্গের উপকূলে। ঝড়ের প্রকোপে উৎপন্ন আনুমানিক ৫ মিটার (১৬ ফুট) উপর
জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় অঞ্চল প্লাবিত হয়েছিল এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা
তাৎক্ষণিকভাবে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। ঝড়ের শুরুতে উপকূলীয় অঞ্চলগুলিতে বাতাসের বেগ
ছিল ১৫০–১৬০ কিমি/ঘণ্টা। পশ্চিম বঙ্গের রাজধানী কলকাতায় বাতাসের গতি ছিল ১৩৩ কিমি/ঘণ্টা
ফলে গাছপালা ধ্বংস হয়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলায় হাজার হাজার মাটির ঘর ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।
এই সময় পশ্চিমবঙ্গে কমপক্ষে ৭২ জন মারা গিয়েছিল। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার
হাজার হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছিল। কেবল কলকাতায় ঘূর্ণিঝড়ে ৫০০০ গাছ নষ্ট
হয়েছিল। বিভিন্ন অঞ্চলে বাঁধগুলি ভাঙ্গার ফলে গ্রাম ও ফসলি জমিতে বন্যার সৃষ্টি
হয়েছিল। প্রাথমিক হিসাব অনুসারে পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে ৮৮,০০০ হেক্টর (২১৭,০০০ একর) ধান এবং ২,০০,০০০ হেক্টর (৫০০,০০০ একর) শাকসবজি এবং তিলের ফসল নষ্ট হয়ে গেছে।
উড়িষ্যা: উড়িশ্যায় ঝড়টি ১০৬ কিমি/ঘণ্টায় গতিতে আঘাত হেনেছিল। ব্যাপক
বৃষ্টিপাত এবং জলোচ্ছ্বাসে বহু মানুষ জলবন্দী হয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে পারাদিপে
প্রায় ১৯৭.১ মিমি (৭.৭৬ ইঞ্চি) পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছিল। রাজ্যের ৬৫টি বৈদ্যুতিক সাবস্টেশনগুলি
ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল এবং প্রায় ১৯ লাখ মানুষ বিদ্যুতবিহীন হয়ে পড়েছিল। ওডিশায় দু'জনের মৃত্যু হয়েছে, একজন ডুবে যাওয়ার কারণে এবং অন্যজন দেয়াল ধসে পড়ে।