এই শাখায় ভাষার আঞ্চলিক রূপ, উপভাষা, সামাজিক ভাষাভেদ, কথ্য ও লিখিত ভাষার পার্থক্য, ভাষার পরিবর্তন এবং ভাষার ব্যবহারগত বৈচিত্র্য বিশেষ গুরুত্ব পায়। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একই অর্থ প্রকাশের জন্য "যাব", "যামু", "যাইমু", "যাইবো" ইত্যাদি ভিন্ন ভিন্ন রূপ ব্যবহৃত হয়। বর্ণনামূলক ভাষাতত্ত্ব এসব রূপের কোনোটিকে ভুল বলে না; বরং কোথায়, কোন সমাজে এবং কোন প্রেক্ষাপটে এগুলো ব্যবহৃত হয়, তা বিশ্লেষণ করে।
আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের অধিকাংশ গবেষণা বর্ণনামূলক পদ্ধতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব, বাক্যতত্ত্ব, অর্থতত্ত্ব, সমাজভাষাবিজ্ঞান, উপভাষাতত্ত্ব, মনোভাষাবিজ্ঞান এবং করপাসভিত্তিক ভাষা-গবেষণায় এই পদ্ধতি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এর ফলে ভাষার প্রকৃত কাঠামো ও পরিবর্তনের ধারা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়।
বর্ণনামূলক ভাষাতত্ত্বের শাখাসমূহ: প্রকৃতপক্ষে বর্ণনামূলক ভাষাতত্ত্বের আলাদা কোনো
সুনির্দিষ্ট 'শাখা' নেই। মূলত ভাষাতত্ত্বের অন্তর্গত বিশেষ কিছু বিষয় সাধারণত বর্ণনামূলক পদ্ধতিতে অধ্যয়ন করা হয়। তাই অনেক গ্রন্থে এগুলোকেই বর্ণনামূলক ভাষাতত্ত্বের প্রধান শাখা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
এই বিচারে এর শাখা হিসেবে যে বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করা হয়, তা হলো
১. ধ্বনিতত্ত্ব ভাষার ধ্বনির উৎপত্তি, উচ্চারণ, শ্রবণ এবং ধ্বনির ভৌত বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করে।
২. ধ্বনিবিজ্ঞান / ধ্বনিমতত্ত্ব: কোনো ভাষায় ধ্বনিগুলোর কার্যকারিতা, ধ্বনিম (phoneme), ধ্বনিবিন্যাস এবং ধ্বনিগত নিয়ম বিশ্লেষণ করে।
৩.রূপতত্ত্ব: শব্দের গঠন, রূপিম, উপসর্গ, প্রত্যয়, বিভক্তি এবং শব্দগঠনের নিয়ম নিয়ে আলোচনা করে। ৪. শব্দতত্ত্ব: শব্দের অর্থ, উৎপত্তি, ব্যবহার, শব্দভাণ্ডার, সমার্থক, বিপরীতার্থক এবং শব্দসমূহের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করে।
৫. বাক্যতত্ত্ব শব্দ কীভাবে বাক্যে বিন্যস্ত হয়, বাক্যের গঠন, পদক্রম এবং বাক্যের নিয়ম বিশ্লেষণ করে। ৬. অর্থতত্ত্ব (শব্দ, পদ, বাক্য ও উক্তির অর্থ এবং অর্থের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করে।
৭. ব্যবহারতত্ত্ব বা প্রয়োগতত্ত্ব: বক্তা, শ্রোতা, সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী ভাষার অর্থ ও ব্যবহার বিশ্লেষণ করে।
৮. সমাজভাষাবিজ্ঞান: সমাজ, শ্রেণি, পেশা, লিঙ্গ, বয়স ও সংস্কৃতির সঙ্গে ভাষার সম্পর্ক এবং ভাষার সামাজিক বৈচিত্র্য নিয়ে আলোচনা করে।
৯. উপভাষাতত্ত্ব: একই ভাষার বিভিন্ন আঞ্চলিক রূপ বা উপভাষার বৈশিষ্ট্য, বিস্তার ও পার্থক্য বিশ্লেষণ করে।
১০. ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্ব: সময়ের সঙ্গে ভাষার পরিবর্তন, বিকাশ, শব্দের রূপান্তর এবং ভাষার ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করে।
১১. মনোভাষাবিজ্ঞান: মানুষ কীভাবে ভাষা অর্জন করে, ভাষা বোঝে, মনে সংরক্ষণ করে এবং ব্যবহার করে—তা নিয়ে আলোচনা করে।
১২. গণনামূলক ভাষাতত্ত্ব কম্পিউটারের মাধ্যমে ভাষা বিশ্লেষণ, যন্ত্র-অনুবাদ, স্বয়ংক্রিয় ভাষা প্রক্রিয়াকরণ, ভাষা-প্রযুক্তি ইত্যাদি নিয়ে কাজ করে।